মতামত

এ ভার বইতে হবে আমাদেরই?

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন তথা তাদের জন্মস্থান মিয়ানমারে ফেরানোর ইস্যুতে ২০১৯ সালের জুন মাসে যা লিখছি, ২০২১ সালের জুন মাসে এই একই কথাই হয়তো লিখতে হবে। কেননা, আগামী দুই চার পাঁচ বছরেও এই সংকটের যে সমাধান হবে— আপাতদৃষ্টিতে তার কোনো লক্ষ্মণ নেই। গত দুই বছর ধরে এই একই কথা বলতে হচ্ছে। অর্থাৎ জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে নিপীড়িত এই জনগোষ্ঠীর ১০ লাখের বেশি মানুষের বোঝা যে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকেই বইতে হবে, সে বিষয়ে বোধ হয় এখন সন্দেহ না করাই ভালো।

সম্ভবত এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই নোয়াখালীর ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গারা সেখানে যেতে রাজি নয়। খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রীই অভিযোগ করেছেন যে, কিছু এনজিও রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে না যাওয়ার বিষয়ে প্ররোচনা দিচ্ছে। কারণ কক্সবাজারে বিমানবন্দর এবং পর্যটন কেন্দ্র হওয়ায় এখানে আন্তর্জাতিক মানের হোটেলের প্রাচুর্য থাকায় দেশি-বিদেশি এনজিও যারা রোহিঙ্গা ইস্যুতে কাজ করছে, তারা ভাসানচরে যাওয়ার পক্ষে নয়।

তারপরও ভাসানচরে যদি রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে নেয়া সম্ভবও হয়, তাতেও আখেরে কতজনকে সেখানে থাকার সুযোগ দেয়া যাবে? বড় জোর এক লাখ বা তার কিছু বেশি? বাকি ৯ লাখ কোথায় থাকবে? কক্সবাজারেই? এরমধ্যে কিছু হয়তো পালিয়ে যাবে, কিছু লোক বাংলাদেশের মূল স্রোতে মিশে যাবে। কিন্তু আখেরে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর বোঝা বাংলাদেশকেই বইতে হবে।

প্রসঙ্গত, বঙ্গোপসাগরে ১৩ হাজার একরের এই দ্বীপটির তিন হাজার একর জায়গার চারপাশে বাঁধ নির্মাণ করে সেখানে রোহিঙ্গাদের জন্যে অবকাঠানো গড়ে তোলা হয়েছে। লাগানো হয়েছে নারকেল সুপারিসহ বহু গাছপালা। নকশা অনুযায়ী এক হাজার ৪৪০টি ঘর বানানো হয়েছে, যার প্রতিটি ঘরে ১৬টা করে পরিবারের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটা পরিবারে যদি চারজন করে সদস্য হয় তাহলে তাদের আলাদা একটা কক্ষ দেয়া হবে এবং তাদের জন্য আলাদা রান্নাবান্না ও টয়লেটের সুবিধাও রাখা হয়েছে।

বন্যা বা জলোচ্ছ্বাসের পানি ঠেকাতে বাড়িগুলো মাটি থেকে চার ফুট উঁচু করে বানানো হয়েছে। এখানে মানুষের উচ্ছিষ্ট থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন ও ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেই গ্যাস দিয়েই চলবে রান্নাবান্না। এছাড়া বিদ্যুতের জন্য সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে। প্রতিটি স্থানে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহের জন্য তিনটি বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেগুলো হল, ভূমি থেকে ৭২০ ফুট গভীর থেকে পানি উত্তোলন, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা এবং পর্যাপ্ত পুকুর। কিন্তু বাস্তবতা হলো যত সুবিধাই থাকুক, রোহিঙ্গারা ভাসানচরে যেতে চায় না। তারা মনে করে, কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পেই তারা ভালো আছে এবং এখানেই তারা নিরাপদ।

প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠী ও এনজিওরা হয়তো কক্সবাজারে ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করবে; রোহিঙ্গা শিশুদের পড়ালেখার ব্যবস্থাও করবে। কিন্তু সেটা কতদিন? তারা যদি সহায়তার পরিমাণ কমিয়ে দিতে থাকে তখন রোহিঙ্গাদের জীবিকার ব্যবস্থা কে করবে? ধরা যাক, তাদের জীবিকার সংকট তৈরি হবে না। কিন্তু কক্সবাজারে তারা এরইমধ্যে যে ধরনের সংকট তৈরি করেছে, পরিবেশ-প্রতিবেশ এমনকি স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে ফেলেছে, সেই ক্ষতিপূরণ কে দেবে? জাতিসংঘ কি মিয়ানমারের কাছ থেকে এই ক্ষতিপূরণ আদায়ের মুরদ রাখে?

অস্বীকার করার উপায় নেই, যতদিন পর্যন্ত মিয়ানমারের সাথে চীন ও রাশিয়ার বাণিজ্যিক বন্ধুত্ব থাকবে, ততদিন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে রাজি করানো যাবে না। তারা চুক্তি করবে, টালবাহানা করবে, টোকেন হিসেবে হয়তো দুই চারশো লোককে ফেরত নেবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই সংকটের কোনো সুরাহা হবে না। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারে ফিরতে রাজি নয়। কারণ তাদের ভিটেমাটি দখল হয়ে গেছে। সেখানে মিয়ানমার সরকারের বাণিজ্যিক প্রকল্প হচ্ছে। ফলে তারা ফেরত গেলে থাকতে হবে মিয়ানমারের বানানো ক্যাম্পে।

দ্বিতীয়ত তাদের নাগরিকত্বও দেয়া হবে না। ফলে তারা একটি ক্যাম্প থেকে আরেকটি ক্যাম্পে কেন যাবে? তাছাড়া বাংলাদেশের ক্যাম্পে তারা যতটা নিরাপদ, মিয়ানমারে সেই নিরাপত্তা পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আবার রোহিঙ্গাদের যদি বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন মংদু এলাকায় ক্যাম্প করে রাখা হয়, তাহলে সেখানে ইসরায়েলের গাজার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে বলেও অনেকের আশঙ্কা।

রোহিঙ্গারা যখনই নির্যাতনের শিকার হয়, তারা নানা কারণেই বাংলাদেশকেই নিরাপদ মনে করে। প্রথমত তারা বিশ্বাস করে, এখানে কোনোমতে ঢুকতে পারলে তাদের মৃত্যুর আশঙ্কা নেই। দ্বিতীয়ত এখানের সরকার ও জনগণ তাদের আর যাই হোক, মানবিক সহায়তাটুকু দেবে। তৃতীয়ত তারা ভাবে, যেহেতু রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটা আন্তর্জাতিক জনমত আছে, যেহেতু জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের নির্মমতার বিষয়ে ওয়াকিবহাল এবং এখানে বিদেশি সহায়তা আছে, তাই প্রাণ নিয়ে এই ভূখণ্ডে আসতে পারলে কিছু বিদেশি সহায়তাও পাওয়া যাবে। তারা মনে করে, রাখাইনে নিজ ভূমিতে পরবাসী হয়ে থাকার চেয়ে বাংলাদেশের ক্যাম্পও অনেক বেশি সম্মানের এবং নিরাপদ। অতএব দ্বিপক্ষীয় চুক্তি মেনে মিয়ানমার যদি রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে রাজিও হয়, তারপরও তাদের ফেরত পাঠানো কঠিন।

তাহলে সমাধান কোথায়? সহজ উত্তর—এর কোনো সহজ সমাধান নেই। একমাত্র সমাধান রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে মিয়ানমার সরকার এবং সে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মনোভাবের পরিবর্তন। মিয়ানমার যদি ঘোষণা দেয় যে, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার পরে তাদের নাগরিকত্ব এবং ভিটেমাটি ফিরিয়ে দেয়া হবে, কেবল তাহলেই রোহিঙ্গারা ফিরতে রাজি হবে। কিন্তু মিয়ানমার সেই ঘোষণা দেবে— এমনটি ভাবার কী কারণ আছে? যদি তারা এটি করবেই তাহলে আর তাদের ওপর জাতিগত নিধন কেন চালালো?

সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় উপায় মিয়ানমারকে বাধ্য করা। অর্থাৎ অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে যদি তাদের কোণঠাসা করে দেয়া যায়, যদি সারা বিশ্বের জনমত তাদের বিরুদ্ধে নেয়া যায়, তাহলে হয়তো মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিয়ে তাদের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে বাধ্য হবে। কিন্তু সে আশায়ও গুঁড়েবালি, যতক্ষণ না জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও রাশিয়ার ভেটো দেয়ার সুযোগ থাকছে। যতক্ষণ না মিয়ানমার তার পাশে এ দুই শক্তিশালী রাষ্ট্রকে পাচ্ছে।

এমনকি রোহিঙ্গা ইস্যুতে শক্তিশালী ভারত এখন পর্যন্ত সরাসরি বাংলাদেশের পক্ষে এবং মিয়ানমারের বিপক্ষে না থাকলেও, যদি এই মেয়াদে নরেন্দ্র মোদির মনোভাবের পরিবর্তন হয় এবং ভারত সরকার যদি বাংলাদেশে থেকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার বিষয়ে মিয়ানমারকে চাপ দেয়, সেই চাপও মিয়ানমার আমলে নেবে না। কারণ তার পাশে আছে চীন ও রাশিয়া। আর মিয়ানমারের পাশে চীন থাকবেই— কারণ সে দেশে তাদের বাণিজ্য আছে।

আবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে দুই প্রতিবেশী দেশ সমঝোতা স্মারক সই করলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়ের বড় কারণ মিয়ানমারের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে সেনাবাহিনী। দেশটির সাংবিধানিক ব্যবস্থায় সেনাবাহিনীর ওপর অং সান সু চির কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আর রাখাইনে জাতিগত নিধনের মূলে আছে যে সেনাবাহিনী, এই ইস্যুতে তাদের মনোভাব পরিবর্তন করা সে দেশের রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে একটা বড় অংশই যুব-তরুণ। একসময়ের সক্ষম এই মানুষের এখন বেকার। তারা কতদিন বেকার থাকবেন? বাংলাদেশের লাখ লাখ যুব-তরুণই যেখানে বেকার, সেখানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর এই যুব-তরুণদের কী ধরনের কাজে নিয়োজিত করা সম্ভব? যদি সম্ভব না হয় তাহলে তারা কী করবেন? কোনো চরমপন্থি গোষ্ঠী যদি তাদের বাগিয়ে নেয় বা নেয়ার চেষ্টা করে, সেই প্রক্রিয়া থামানোর কোনো অস্ত্র বা মন্ত্র আমাদের জানা আছে?

অতএব রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান দিল্লি বহুদূর। আমরা বরং জনমত তৈরি করতেই পারি এবং এই বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে যে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি, সেই সান্ত্বনা নিয়েই ঘুমাতে পারি। কিন্তু রোহিঙ্গারা যে কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘুম হারাম করে দিয়েছে, তাদের যন্ত্রণাটা খুব কমই উপলব্ধি করতে পারছি।

লেখক : বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর।

এইচআর/এমকেএইচ