মতামত

তবুও টলছেন না মোদি

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কোনোভাবেই মন গলাতে পারছেন না ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। কাশ্মির সীমান্তের পলওমায় ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ৪০ সৈনিককে হত্যার ঘটনার পর নরেন্দ্র মোদি যেভাবে বেঁকে বসেছেন, তাকে সোজা করা ইমরান খানের জন্য সহজ হওয়ার কথাও নয়। কিন্তু দমে যাননি ইমরান খান। নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয় মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় অভিনন্দন বার্তা পাঠানোর পর কেউ কেউ মনে করেছিলেন, হয়তো মোদির শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন ইমরান খান। প্রতিবেশি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানসহ অনেকেই সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলেও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে দেখা গেলো না।

ইমরান খান বুঝতে পেরেছেন, ভারতকে চটিয়ে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। তাই আবারো চিঠি লিখলেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে। গত ফেব্রুয়ারিতে ভারতীয় সৈনিক নিহত হওয়ার পর থেকেই তিনি ভারতের সঙ্গে আলোচনার অনুরোধ করে আসছেন। এবারও সেই অনুরোধই করলেন। সৌজন্যবশত ইমরান খানকে ধন্যবাদ জানালেন ফোন করার জন্য। কিন্তু মানসিক চাপ সৃষ্টির পথ থেকে সরে এলেন না মোদি। একদম চুপই রয়ে গেলেন আলোচনা প্রসঙ্গে।

কিন্তু চুপ রইলেন না, পাকিস্তানকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করা থেকে। যে মুহূর্তে ইমরান খানের অনুরোধ আসে আলোচনায় বসার জন্য, তখনই জবাব পাওয়া যায়-সন্ত্রাস আর আলোচনা একসঙ্গে হতে পারে না। ভারতের অনমনীয় ভাব বুঝতে পেরে ইমরান খানকে আরো নমনীয় হতে হয়, প্রস্তাব পাঠান পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যত সমস্যা আছে, সব বিষয়ে আলোচনায় প্রস্তুত পাকিস্তান। ভারত শুধু আলোচনায় রাজি হোক। বাস্তবতা হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদি হিমালয়ের মতো পর্বতসম সিদ্ধান্তে অনড়। এই মুহূর্তে গোমট ভাব দেখে আশঙ্কা জাগতেই পারে- আরেকটা ধাক্কা কি আসন্ন?

অবস্থা বেগতিক বুঝতে পেরে-পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আরেকটা উছিলাকে কাজে লাগাতে চাইলেন। আগামী সপ্তাহে দুই প্রধানমন্ত্রী একছাদের নিচে অবস্থান করবেন কিরগিজস্তানে। সাংহাই কোঅপারেশন সামিট অনুষ্ঠিত হবে সেখানে। চলবে ১৩ ও ১৪ জুন। ভাবলেন, এবার যদি মোদিকে বলে কয়ে বৈঠকে রাজি করানো যায়। সেটা যে অতিসহজ বিষয় নয়, সেটা ইমরান খানের না বোঝার কথা নয়। তাই অনানুষ্ঠানিক আলোচনার চেষ্টা চালালো পাকিস্তান। সেই একই বক্তব্য- ভারতের সঙ্গে অমিমাংসিত যত বিষয় আছে সবই আলোচনায় রাজি পাকিস্তান। কিন্তু ভারতের সাফ কথা- সীমান্ত পেরিয়ে আসা জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের ঠেকাও আগে তারপর আলোচনা।

আর ভারতও ভুলবে কিভাবে- ৪০জন সৈনিককে লাশ বানিয়েছে পাকিস্তানি জঙ্গিরা। ভারত যখন বেলাকোটে বিমান হামলা চালায় পাকিস্তানি জঙ্গিদের আস্তানায়, তখনও পাকিস্তান তা প্রতিহত করে। শুধু তাই নয় ভারতীয় বৈমানিক অভিনন্দন বর্তমানকেও বন্দী করে তারা। ( যদিও দ্রুত সময়ের মধ্যেই অভিনন্দনকে তারা ভারতে ফিরিয়ে দিয়েছে।)। ভারত বলছে- এটা জঙ্গিদের পক্ষ নিয়ে পাকিস্তান ভারতীয় বাহিনীকে প্রতিহত করার সামিল। কারণ ভারত পাকিস্তানের অভ্যন্তরে থাকা জঙ্গিদেরই ধ্বংস করতে চেয়েছে।

আসলে অতীতটা কিন্তু সুখকর নয় দুটি দেশের জন্য। দুই দেশ তাদের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে অনেক আলোচনায় বসেছে। আবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষেও লিপ্ত হয়েছে। হিমালয় থেকে বরফ গলে মহাসাগরের উদরপূর্তি করলেও তাদের মন গলেনি কারো। কখনো তাদের উদ্যোগ ছিলো তুলনামূলক গতিসম্পন্ন কখনো ঝিমিয়ে পড়া অবস্থায়।

ফেব্রুয়ারি হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তান তাৎক্ষণিক আলোচনার প্রস্তাব দিলেও ভারতের নির্বাচনের প্রাক্কালে পাকিস্তানের চেষ্টায় কিছুটা ধীরগতি লক্ষ্য করা যায়। তাদের উদ্বেগ ছিলো ভারতে না কংগ্রেস আবার ক্ষমতাসীন হয়ে বসে। কিন্তু একসময় দেখা গেলো, ভারতীয় নির্বাচনে সেই বিজেপিই আবার ক্ষমতাসীন হলো। নির্বাচনী এই ফল মাথায় বাজ পড়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে মুক্তি পেলো তারা। কিন্তু ভারতের নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হলেও পাকিস্তান বিষয়ে বরফ গলছে না তারপরও।

কংগ্রেস শাসনামলে পাকিস্তানিরা সবচেয়ে বেশি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে শান্তি প্রচেষ্টা হিসেবে আলোচনায়। ইন্দিরা গান্ধী একাধিকবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেন তিনি একবারও পাকিস্তান সফর করেননি, মনমোহন সিংহ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর কাশ্মির সমস্যা নিরসনের জন্য প্রস্তাবনা উপস্থাপনের পরও তিনি একবারের জন্যও পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ কবুল করলেন না। পিভি নরসিমা রাওকে দেখা গেলো না পাকিস্তানের মাটিতে পদস্পর্শ করাতে।

পাকিস্তানের আশাবাদের পেছনে কাজ করেছিলো ভারতের দেওয়া কিছু শর্ত। ভারত চাইছিলো পাকিস্তান তাদের সামরিক বাজেট কমিয়ে দিক। এটা পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার পরও সেই শর্তও তাদের মানতে হলো। সামরিক বাজেট কমিয়ে এনে ইমরান খানের গদিতে উঁইপোকার বাসস্থান বানানোর মতো কাজটি করতে দেখেই বোঝা যায় আসলে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী কতটা বেকায়দায় পড়েছেন এক হামলার জেরে। ভারতের আরেকটি শর্ত ছিলো পাকিস্তানে কোনোভাবেই জঙ্গি তোষণ চলবে না। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ তো অনেক আগে থেকেই করা হচ্ছে।

জঙ্গি পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ ভুল প্রমাণ করার জন্য প্রাথমিক পদক্ষেপ নিলেন ইমরান খান। তিনি জামায়াত-উদ দাওয়ার প্রধান হাফিজ সাইদকে লাহোরের গাদ্দাফী স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ঈদের জামায়াতে ইমামতি করা থেকে নিবৃত রেখেছেন এবার। বহুবছর ধরে তিনি সেখানে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নামাজে ইমামতি করে আসছেন। সেই অবস্থায় তাকে ইমামতি করতে না দেওয়াটা ইমরান খানের জন্য সুখকর নয়। তারপরও হাফিজ সাইদকে বলা হলো, তিনি যদি ইমামতি করতে গোঁ ধরে বসেন তাহলে তাকে গ্রেফতার করা হবে। শেষ পর্যন্ত হাফিজ সাইদ তার মহল্লার একটি মসজিদে গিয়ে ঈদের নামাজ পড়েন।

কিন্তু পাকিস্তান কি তাদের দেশের অভ্যন্তরে গজিয়ে ওঠা জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে? এই জঙ্গিরা কি পাকিস্তান সরকারের নির্দেশনা মানবে? ভারত বলছে, এই জঙ্গিদের সরাসরি সহযোগিতা করে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। আর যে কারণে তারা পাকিস্তানের সামরিক বাজেট কমিয়ে আনার শর্ত দিয়েছে। এমতাবস্থায় জঙ্গি দমন করতে হলে সামরিক বাহিনী কি পাকিস্তান সরকারকে এটা করতে দেবে? এমনিতেই সেখানে নির্বাচিত সরকারকেও সামরিক বাহিনীর প্রেসক্রিপসন মেনে চলতে হয়, সেই জায়গায় জঙ্গি দমন করার মতো বড় ভূমিকা কি ইমরান খান পালন করতে পারবেন?

এখন তো অনেকেই মনে করছেন কাশ্মির ইস্যুর তুলনায় জঙ্গিপনাকে কোনোভাবেই কম করে দেখার মতো নয়। কাশ্মির তো ভারত ও পাকিস্তানের একটি কোণায়। কিন্তু জঙ্গিরা তো সারা ভারতের জন্যই আতঙ্কের। ভারত তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে শান্তির জন্য যেসব পূর্বশর্ত আরোপ করেছে, সেগুলোর যৌক্তিকতা থাকলেও পাকিস্তান সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ ছাড়া আদৌ কি চলতে পারবে? আর জঙ্গিপনাকে সঙ্গে রেখে যদি ইমরান খান আলোচনা করতে চান তাহলে কি সেটা কোনো ফল বয়ে আনতে পারে? এমন পরিস্থিতিতে কিরগিজস্তানে দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হওয়া জরুরি বলে মনে করেন তাদের ধারণা ভুল হিসেবেই প্রমাণ হবে।

ইমরান খান যদি প্রকৃতই শান্তি চান তাহলে নিজ দেশে প্রতিষ্ঠিত অশান্তির কারখানাগুলো বন্ধ করতে হবে। জঙ্গি তোষণের পথ পরিহার করতে হলে তাকে বড় ধরনের ঝুঁকি নিতে হবে, যা নওয়াজ শরিফ কিংবা অন্য কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বলে তাদের উর্দিপ্রীতি দেশের কল্যাণের চেয়ে বড় হিসেবে গণ্য। উর্দিকে ক্ষেপিয়ে কি পাকিস্তান সেই কাজটি করবে?

সিদ্ধান্ত নিতে হবে ইমরান খানকেই। তখনই ভারতের কাছ থেকে হয়তো সহযোগিতা পেতেও পারেন। না হলে ফেব্রুয়ারির ঘটনার পাল্টা কিছু পাওয়ার আশঙ্কাটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

লেখক : সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

এইচআর/আরআইপি