মতামত

বিশ্বকাপে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি বিশ্বাসঘাতক!

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের তৃতীয় ম্যাচটি শুধু জেইসন রয় আর বাটলারদের নয়, দিনটি সাকিবেরও ছিল। এবারের বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত সেরা স্কোর গড়ার তালিকার এক নম্বরেই স্থান বাংলাদেশের সাকিব আল হাসানের। তাই বলতেই হবে ইংলিশদের পাশাপাশি সাকিবও জয় পেয়েছেন। ইংল্যান্ডের সাথে কার্ডিফের খেলায় বাংলাদেশ শুধু পয়েন্ট হারিয়েছে মাত্র এর বেশি কিছু নয়।

এমন পাহাড়সম রান তাড়া করে জেতা বিশ্বের যে কোন দেশের জন্যই অসম্ভব। ভক্তরা প্রশ্ন তুলতেই পারেন এমন পাহাড়সম রানই বা টাইগাররা করতে দিলো কেন? টসে জিতে ফিল্ডিং না নিয়ে ব্যাটিং করলেও হয়তো এতো বড়ো স্কোর তাড়া করার চাপ থাকতো না। কিন্তু মাশরাফির বক্তব্যেরও যুক্তি আছে, পিচ দেড়দিন ঢাকা ছিল, তাই কোনকিছু না ভেবে প্রথমে বল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ক্যাপ্টেইন। মাশরাফি হয়তো ভেবেছেন এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাটিং লাইন আপের ইংলিশদের যদি কম রানে আটকে ফেলা যায় তবে জয় সহজ হবে, যদিও শেষ পর্যন্ত এই প্ল্যানটিও কাজ করেনি।

অন্যদিকে প্রথম স্পেলে সাকিবকে টানা ৭ ওভার না দিয়ে নতুন বোলার দিয়ে চেষ্টা করতে পারতেন মাশরাফি, এমন সমালোচনাও করেছেন ধারা ভাষ্যকার আতাহার আলী খান। সমুদ্র তীরবর্তী কার্ডিফের তাপমাত্রাও বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের জন্য সহনীয় ছিল না। ইংলিশ আবহাওয়াটা ঠিক মোকাবেলা করে উঠতে পারেনি টাইগাররা। তবে সব সমালোচনা হয়তো ম্লান হয়ে যেতো যদি কাঙ্খিত জয় পেতো বাংলাদেশ।

গত বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সাথে হার আর চলতি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের সাথে পরাজয়ের ঝালটা ইংলিশরা মনে হয় বাংলাদেশের সাথে মিটিয়েছে শনিবার কার্ডিফের মাঠে। বাংলাদেশ দলের সাথে ইংল্যান্ডের যে কোন গ্রাউন্ডে খেলা হলে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে থাকেন ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা। কোন দলকে সাপোর্ট করবেন তারা? বিশ্বের যে কোন দেশের চেয়ে ইংল্যান্ডেই সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশির বসবাস। আর যারা বছরের পর বছর বা কয়েক জেনারেশন ধরে ইংল্যান্ডে স্থায়ী হয়েছেন, ব্রিটেনের নাগরিকত্ব নিয়েছেন, তাদের পক্ষে বাংলাদেশ-ইংল্যান্ডের খেলার দিন বাংলাদেশকে শতভাগ সমর্থন দেওয়া খুব সহজ সিদ্ধান্ত নয়।

আইসিসিসির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে " আই এ্যাম ব্রিটিশ বাংলাদেশী, হুএভার উইনস টুডে আই ডোন্ট লুজ.....ক্রিকেট উইন্স" ইংরেজিতে এমন প্ল্যাকার্ড লেখা একজন ক্রিকেট ভক্তের ছবি ভাইরাল হয়েছে। এই কলাম লেখার সময় পর্যন্ত ছবিটিতে লাইক দিয়েছেন ২৫ হাজার ফেসবুক ব্যবহারকারী, ছবিটি শেয়ার্ড হয়েছে ৩৫৫ বার! এই ছবিটিকে কেন্দ্র করে ৩৬৬ টি মন্তব্য এসেছে আইসিসি'র পেইজে।

ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া তরুণ প্রজন্মের আরেক ক্রিকেট ফ্যান ইমতিয়াজ চৌধুরী মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশ তার প্রথম পছন্দের টিম, ইংল্যান্ড তার দ্বিতীয় পছন্দের দল। লন্ডনের বিখ্যাত নামাস্তে কিচেনের স্বত্ত্বাধিকারী সাব্বির করিমের ফেসবুক স্ট্যাটাসে করা মন্তব্যে ক্যামডেনের সাবেক কাউন্সিলর লিডার নাসিম আলি লিখেছেন, '৭ বছর বয়স পর্যন্ত বাংলাদেশে থেকেছেন তিনি সেই অর্থে বাংলাদেশ তার মাতৃভূমি, কিন্তু ব্রিটেনে বসবাস করছেন প্রায় ৪৩ বছর, তাই যোগ্য দলটি জিতলেই তিনি খুশি।'

ব্রিটিশ বাংলাদেশী আফজাল আলী মোফাজ্জাল ফেসবুকে নিজেকে রীতিমতো বিশ্বাসঘাতক বলে অভিহিত করে মন্তব্য লিখেছেন। শুধু তাই নয় আফজাল আলী ইংল্যান্ডের জার্সি গায়ে দিয়ে ফেসবুকে ছবিও পোস্ট দিয়েছেন। নিজেকে কেন বিশ্বাসঘাতক বলছেন আফজাল আলীর কাছে জানতে চাইলে আফজাল জানালেন, দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে তিনি ব্রিটেনে বসবাস করছেন। বাংলাদেশে সিলেটের সুনামগঞ্জে জন্ম হলেও এখন ইংল্যান্ডই তার নিজের দেশ, এই দেশই তার রুটি রুজির যোগান দিচ্ছে, এই দেশে থেকেই তিনি তার সন্তানদের অক্সফোর্ড- কেইমব্রিজে পাঠানোর স্বপ্ন দেখেন তাই তিনি ইংল্যান্ডকে সমর্থন দিচ্ছেন। তবে সাউথ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডের সাথে খেলার দিন তিনি অবশ্য বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছেন, কিন্তু পরবর্তী ম্যাচ গুলোতে তিনি ইংল্যান্ডকেই সমর্থন দেবেন।

আফজাল আলী টেলিফোনের অপর প্রান্তে বলে যাচ্ছেন, ১২ বছর আগে তার ৯ বছর বয়সী মেয়ের একটি জটিল রোগ ধরা পড়েছিল। ইংল্যান্ডে এসে তিনি হাসপাতালের ডাক্তার/ নার্সদের যে সেবা পেয়েছেন তাতে তিনি মুগ্ধ হয়ে এই দেশে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ডাক্তাররা তার মেয়েকে চিকিৎসা দিয়েছেন রোগী হিসেবে, কোন দেশ থেকে তিনি এসেছেন বা তার গায়ের চামড়ার রং কি সেই বিবেচনা না করে সেবা দিয়ে তার মেয়েকে সুস্থ করে তুলেছেন। সেই কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই জন্ম নেয় দেশটির প্রতি ভালোবাসা।

ব্রিটেনই এখন তার প্রথম প্রায়োরিটি। নতুন প্রজন্মকে তিনি ব্রিটেনকে ভালোবাসতে অনুপ্রেরণা যোগাতে চান বলেই গ্যালারিতে ইংল্যান্ডের জার্সি গায়ে খেলা দেখতে গেছেন। ব্রিটেনকে বেনিয়ার জাত বললে তিনি আহত হন, দুইশত বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আর নীলকরের অত্যাচারের প্রতিশোধ হিসেবে যারা ইংল্যান্ডের পরাজয় চান তাদের বিরুদ্ধে আফজাল আলীর অবস্থান। অন্তত ব্রিটিশ বাংলাদেশীদের মুখে এমন কটু কথা শুনতে তিনি নারাজ। যেই দেশ আপানাকে সব দিচ্ছে সেই দেশে থেকে সেই দেশকে যারা অবহেলা আর অবজ্ঞার চোখে দেখেন তাদের ব্রিটেনে থাকার কোন অধিকার নেই বলে মনে করেন তিনি।

আফজাল আলীর সাথে তাল মিলিয়ে গিয়াস আহমেদ সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার একটি প্রবাদ লিখে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আইসিসি'র ফেসবুক পেজে, "কার হগদা খাও গো বান্দি ঠাকুর ছিনো না।" অর্থাৎ যার নুন খেয়ে বেঁচে থাকা তাকে না চেনার ভান করা। শুধু আফজাল আলীই নন, ইংল্যান্ডের জয়ের মুহূর্তে স্কাই স্পোর্টসের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে আরেক শশ্রুষা মন্ডিত বাঙালি তরুণের মুখ, যিনি পিঠে জড়িয়েছিলেন ইংল্যান্ডের জাতীয় পতাকা।

এমন বহু আফজাল আলী হয়তো বুকের মধ্যে ইংল্যান্ডের জন্য ভালোবাসা নিয়ে খেলা দেখতে বসেছিলেন। তবে ক্রিকেট বিশ্বকাপে ন্যাচারালাইজড ব্রিটিশ বাংলাদেশী অর্থাৎ যাদের জন্ম বাংলাদেশে পরবর্তীতে ব্রিটেনের নাগরিকত্ব নিয়েছেন তাদের অধিকাংশের পছন্দই বাংলাদেশ, দ্বিতীয় পছন্দের তালিকায় অবশ্যই ইংল্যান্ড। তবে নতুন প্রজন্মের ব্রিটিশ বাংলাদেশীরা যাদের জন্ম ইংল্যান্ডে তারা বাংলাদেশ ও ইংল্যান্ড উভয় দলকেই সমান ভাবে ভালোবাসেন। ইংল্যান্ডের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও অধিকাংশ তরুণ প্রজন্মের ব্রিটিশ বাংলাদেশীরা মাঠে যাচ্ছেন বাংলাদেশের জার্সি গায়ে। ইংল্যান্ডের সাথে বাংলাদেশ জিতলে তারা একটু বেশি খুশি হতেন বটে কিন্তু ইংল্যান্ডের জয়ে তারা খুশি হয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলে বিশ্বাসঘাতক হয়ে যাবেন না মোটেও।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক। একাত্তর টেলিভিশনের যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি।

এইচআর/এমকেএইচ