কৃষি ও প্রকৃতি

ধানের উৎপাদন বাড়াবে নতুন তিনটি জাত

আমন ও বোরো মৌসুমে চাষের উপযোগী তিনটি উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। ধানগুলো হলো- রোপা আমনের প্রিমিয়াম কোয়ালিটি জাত ব্রি ধান৯০ ও বোনা আমনের জাত ব্রি ধান৯১ এবং বোরো মৌসুমের পানি সাশ্রয়ী জাত ব্রি ধান৯২। ব্রি ধান৯০ এর গড় ফলন হেক্টর প্রতি ৫.০ টন। এ ফলন আমন মৌসুমের জনপ্রিয় জাত ব্রি ধান৩৪ এর চেয়ে হেক্টরে ১.০-১.৪ টন বেশি। ব্রি ধান৯১ এর হেক্টর প্রতি গড় ফলন ২.৩৭ টন, যা স্থানীয় জাত ফুলকলির চেয়ে ১.৫ টন বেশি। আর বোরো জাত ব্রি ধান৯২ এর গড় ফলন হেক্টর প্রতি ৮.৩ টন। তবে উপযুক্ত পরিচর্যায় এ জাত হেক্টর প্রতি ৯.৩ টন ফলন দিতে সক্ষম।

সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নাসিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় বীজ বোর্ডের সভায় নতুন এ জাতগুলো চাষাবাদের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। ব্রি’র মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীরসহ কৃষি মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় বীজ বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ সভায় উপস্থিত ছিলেন। ব্রি জনসংযোগ বিভাগের প্রধান মো. আবুল কাসেম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

নতুন জাতের ধানের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আবুল কাসেম জানান, ব্রি ধান৯০ এ আধুনিক উচ্চ ফলনশীল ধানের সব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। উচ্চমাত্রার প্রোটিন সমৃদ্ধ এ জাতের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো- এর দানার আকৃতি ব্রি ধান৩৪ এর মতো হালকা সুগন্ধযুক্ত। এ জাতের পূর্ণবয়স্ক গাছের গড় উচ্চতা ১১০ সেন্টিমিটার। এ জাতের গড় জীবনকাল ১১৭ দিন, যা ব্রি ধান৩৪ এর চেয়ে ২১ দিন আগাম। এর চাষাবাদের জন্য সারের মাত্রা অন্যান্য উফশী জাতের মতোই। তবে ইউরিয়া সারের পরিমাণ এতে কিছুটা কম প্রয়োজন হয়। এ ধানে অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৩.২% এবং প্রোটিন ১০.৩% ভাগ। এ জাতের ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন ১২.৭ গ্রাম। ব্রি ধান৯০ জাতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো- এর কাণ্ড শক্ত, সহজে হেলে পড়ে না এবং ধান পাকার পরও গাছ সবুজ থাকে। এ জাতের ডিগপাতা খাড়া ও ফুল প্রায় একসাথে ফোটে, বিধায় দেখতে খুব আকর্ষণীয় হয়। এর গড় ফলন পাঁচ টন হলেও উপযুক্ত পরির্চযায় এটি সাড়ে পাঁচ টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম। আশা করা হচ্ছে, উদ্ভাবিত এ জাত স্থানীয় জাত চিনিগুড়া এবং চিনি আতপের বিকল্প হিসেবে ভোক্তাদের চাহিদা পূরণ করবে।

আরও পড়ুন > আমন মৌসুমের নতুন জাত উদ্ভাবন

ব্রি ধান৯১ এর শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য হলো- এর পাতা গাঢ় সবুজ রঙের ও ডিগপাতা খাড়া। গাছের চারা বেশ লম্বা ও দ্রুত বর্ধনশীল। এ জাতের ধান গাছের গড় উচ্চতা ১৮০ সেন্টিমিটার এবং সহজে হেলে পড়ে না। এটি মধ্যম মাত্রার স্টেম ইলঙ্গেশন গুণ সম্পন্ন। অর্থাৎ পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এটি বাড়তে পারে এবং এটি জলমগ্নতা সহিষ্ণু। এ জাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো- বন্যার পানি সরে যাওয়ার পরে হেলে পড়লেও গাছের কাণ্ড পরে শক্তভাবে দাঁড়াতে পারে। এটি মুড়ি ফসল হিসেবে চাষ উপযোগী। এর গড় জীবনকাল ১৫৬ দিন, যা স্থানীয় জলি আমন ধানের চেয়ে ১০-১৫ দিন আগাম। এর ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ২৬.০ গ্রাম। এর ভাত ঝরঝরে ও সাদা। এ জাতে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ প্রচলিত জাতের চেয়ে কম হয়।

স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে চাষ করা জলি আমনের জাতের মধ্যে আছে মানিকগঞ্জ অঞ্চলে দীঘা, দুধবাওয়াইলা, ঝিঙ্গাশাইল, ভেপা; ফরিদপুর অঞ্চলে বাইল্যা দীঘা, খইয়ামটর এবং কুমিল্লা অঞ্চলে ফুলকুড়ি, কাইত্যা বাগদার ইত্যাদি। এসব স্থানীয় জাত থেকে ব্রি ধান৯১ হেক্টরে অন্তত এক টন ফলন বেশি দেয়। এ জাত দেশের এক মিটার উচ্চতার গভীর পানির বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে পাঁচ লাখ হেক্টর জমিতে চাষ করতে পারলে উৎপাদন প্রায় পাঁচ লাখ টন বৃদ্ধি পাবে।

আর বোরো মৌসুমের পানি সাশ্রয়ী জাত ব্রি ধান৯২। এ ধান চাষে তুলনামূলক কম পানি ব্যবহার করেও ব্রি ধান২৯ এর সমান ফলন পাওয়া যায়। সেজন্য বরেন্দ্র অঞ্চলে শুকনো মৌসুমে যেখানে পানির স্তর নিচে নেমে যায়, সেখানে এটি চাষ করে সুফল পাওয়া যাবে। এ জাতের জীবনকাল ব্রি ধান২৯ এর সমান অর্থাৎ ১৫৬-১৬০ দিন। এ জাতের কাণ্ড শক্ত, পাতা হালকা সবুজ এবং ডিগপাতা চওড়া। এ ধানের ছড়া লম্বা ও ধান পাকার সময় ছড়া ডিগপাতার উপরে থাকে। এর চাল লম্বা ও সোজা। এ জাত হেক্টরে গড়ে ৮.৪ টন ফলন দেয়। তবে উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে হেক্টরে ৯.৩ টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম। এ জাতের পূর্ণবয়স্ক গাছের গড় উচ্চতা ১০৭ সেন্টিমিটার। এ জাতের গাছের কাণ্ড শক্ত। তাই গাছ লম্বা হলেও হেলে পড়ে না। এর দানা লম্বা ও চিকন। এর পাতা হালকা সবুজ রঙের। ডিগপাতা খাড়া এবং ব্রি ধান২৯ এর চেয়ে প্রশস্ত। এ ধান পাকার সময় কাণ্ড ও পাতা সবুজ থাকে। এ জাতের ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ২৩.৪ গ্রাম। এ জাতের ধানে ভাত ঝরঝরে করার উপাদান অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৬% ভাগ।

আরও পড়ুন > আমন ধানের ফলন বাড়াতে যা করবেন- শেষ পর্ব

ব্রি’র বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, নতুন জাত তিনটি কৃষক পর্যায়ে জনপ্রিয় হবে এবং সামগ্রিকভাবে ধান উৎপাদন বাড়বে।

মো. আমিনুল ইসলাম/এসইউ/জেআইএম