জাতীয়

মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ কি আপনার বাবা-মাকে খাওয়াবেন?

ওষুধ ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ করে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বাজারে দুই বছরের আগের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধও পাওয়া যায়, আমার প্রশ্ন আপনি কি আপনার বাবা-মাকে খাওয়াবেন মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ?’

সোমবার পুরান ঢাকার ইংলিশ রোডে বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির কেন্দ্রীয় পরিষদের এক মতবিনিময় সভায় তিনি একথা বলেন।

ডিজি বলেন, ২০৪১ সালে আমরা উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। এই অর্জনের অন্যতম একটি ভাগিদার হবেন আপনারা। কারণ উন্নত দেশ হওয়ার অন্যতম একটি ইন্ডিকেটর হচ্ছে খাদ্য ও স্বাস্থ্য।

ওষুধ ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার ওষুধের র‌্যাক চেক করুন যে মেয়াদ শেষ হওয়ার কোনো ওষুধ আছে কি না? আমরা অভিযানে দেখেছি দুই বছর আগের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়া গেছে ফার্মেসিতে। মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ছয় মাস আগে ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করুন। অথবা মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ওষুধগুলো একটি বড় বাক্স রেখে বাক্সের ওপর লাল কালি দিয়ে ‘মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ’ লিখে রাখুন এবং এটি দোকানের দৃশ্যমান একটি জায়গায় রাখবেন, যাতে সবাই দেখতে পারেন। আমি জানি ব্যবসায়ীদের মধ্যে ৯৯ শতাংশের উদ্দেশ্যই ভালো, বাকি এক থেকে দুই শতাংশ ইচ্ছা করে এসব কাজ করে। তাদের প্রতি আমি বলতে চাই, আপনারা কি আপনার মা-বাবাকে এসব মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ খাওয়াবেন?

>>আর পড়ুন : ২ জুলাইয়ের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ধ্বংসের নির্দেশ

ডিজি বলেন, আমরা আপনাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করব, ফার্মেসি মালিক এবং ফার্মাসিস্টদের ট্রেনিং দেব। তবে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটলে আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেব। আদালত আদেশ দিয়েছেন যত দ্রুত সম্ভব এসব ওষুধ সরাতে। ২ জুলাইয়ের পর যেন কারও দোকানে এসব ওষুধ না থাকে।

তিনি বলেন, একটা কথা মনে রাখবেন আপনারা মুদি দোকানদার নন, আপনারা ওষুধের ব্যবসা করেন, আপনাদের সঙ্গে একটা মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন জড়িত।

এ সময় বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সভাপতি মো. সাদেকুর রহমান বলেন, আমরা দোকানে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রাখব না কিন্তু অনেক কোম্পানি এসব ওষুধ ফেরত নিতে রাজি হয় না। যদি ২ জুলাইয়ের মধ্যে তারা এসব ওষুধ ফেরত না নেয় তাহলে আমরা তাদের বর্জন করব। চোর হয়ে আমরা আর ব্যবসা করতে পারব না। বঙ্গবন্ধুর দেশে কোনো দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবে না।

ওষুধ প্রশাসনের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রায়ই বিভিন্ন কোম্পানি ওষুধের দামের ওপর নতুন স্টিকার সিল দিয়ে দাম বাড়িয়ে দেয়। এসব দেখলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর আমাদের ব্যবসায়ীদের জরিমানা করে। আমি চাই আপনারা তাদের (কোম্পানির) বিষয়টি নজরে রাখবেন।

>>আরও পড়ুন : ১০ ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, ৩০ লাখ টাকা জরিমানা

তিনি আরও বলেন, অনেক সময় চিকিৎসকরা আনরেজিস্টার্ড ওষুধ প্রেসক্রাইব করে। রোগীর অনুরোধের কারণে আমাদের সেসব ওষুধ আনতে হয়। ভবিষ্যতে চিকিৎসকদের আপনারা এসব আনরেজিস্টার্ড ওষুধ প্রেসক্রাইব করা বন্ধ করতে বলবেন। যদি তারা এমন করে তাহলে আমরা হাজার হাজার ফার্মাসিস্ট এক হয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ব। তাদের জন্যই আজকাল সাধারণ মানুষ আমাদের চোর বলছে।

অনুষ্ঠানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মঞ্জুর মো. শাহরিয়ার বলেন, আমাদের ভিশন ভোক্তার আস্থা অর্জনের বাংলাদেশ গড়ে তোলা। ধরাধরি কোনো বিষয় নয়, সম্মিলিতভাবে আমাদের দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। আমরা জানি, একজন ব্যবসায়ীর পরিবার আছে, সন্তান আছে, সামাজিক সম্মান আছে, সেসব বিষয় মাথায় রেখেই আমরা সব সময় কাজ করি। আপনারা (ব্যবসায়ীরা) এ বিষয়গুলো মনে রাখবেন। আমরা বারবারই মিটিং ও সচেতনতামূলক সভার আয়োজন করি কিন্তু কাজ হয় না। চকবাজার, শ্যামবাজার ও মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ী সমিতির সঙ্গে আমরা কয়েকবার বৈঠক করেছি নকল পণ্য নিয়ে। তারা কথা দিয়েছিলেন যে তাদের বাজারে কোনো নকল পণ্য থাকবে না। অথচ দেখেন রোজার মাসে আমি ও র‌্যাবের নির্বাহী মাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম ঠিকই তাদের বাজারে নকল পণ্য পেয়েছি। তাহলে মালিক সমিতি থেকে লাভ কি? আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে।

মতবিনিময় সভায় ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. সালাউদ্দিন ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন দেন। সেখানে তাদের লেভেলবিহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ, নিবন্ধনবিহীন নকল ওষুধ সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়। এছাড়া নকল ওষুধের কারখানার তথ্য চেয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সহায়তা চাওয়া হয়।

>>আরও পড়ুন : ফার্মেসিতে ভারতীয় ওষুধ, দেড় লাখ টাকা জরিমানা

সভায় কেমিস্টদের পক্ষ থেকে কয়েকটি দাবি তোলা হয়। সেগুলো হচ্ছে- ফার্মেসি সার্টিফিকেট রেজিস্ট্রেশন কোর্স চালু, ড্রাগ লাইসেন্সের মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু করা, ফিজিশিয়ান স্যাম্পল উৎপাদন বন্ধ করা, লাইসেন্সবিহীন দোকানদারকে লাইসেন্স দেয়া, ফুড সাপ্লিমেন্ট প্রেসক্রিপশন না করা, যেকোনো বাহিনীর অভিযানে স্থানীয় এবং সমিতির কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাখা।

ওষুধের দোকানে র‌্যাবের অভিযান বন্ধের বিষয়ে সভায় রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, আমাদের শাসন ও শোষণ করার জন্য সরকার একটি সংস্থা তৈরি করেছে- তার নাম ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর। অধিদফতর থেকে আমাদের আইন-কানুন শেখাবে, আমাদের অন্যায় হলে অভিযান চালাবে। দু-একজন অপরাধ করে, আর তাদের জন্য গোটা ওষুধ ব্যবসায়ীদের ধরতে র‌্যাব আসে। তারা যখন এই মিটফোর্ডে আসে তখন আমরা ভয় পাই। পুলিশ দেখলেই আমরা ভয় পাই। আমরা চাই ওষুধ প্রশাসন আসুক অভিযানে, কেমিস্ট সমিতির নেতারা আসুক। আপনারা আমাদের নামে মামলা দেন যা খুশি করেন, কিন্তু র‌্যাবকে ব্যবসায়ীরা ভয় পায়।

এআর/জেএইচ/এমকেএইচ