ক্যাম্পাস

‘ভেতরের অবস্থা জানলে কোনো অভিভাবক বেরোবিতে সন্তান ভর্তি করবেন না’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর খোলাচিঠি লিখেছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী মুজাহিদুল ইসলাম সজীব। মুজাহিদুল ইসলাম সজীব বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী। তার বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লেখা তার এ খোলা চিঠি হুবহু তুলে ধরা হলো-

‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,আপনি জাতির জনকের কন্যা, আপনি বিদ্যানন্দিনী, আপনি মাদার অফ হিউমিনিটি, আপনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপোষহীন নেত্রী। বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য আপনার যে পরিশ্রম, আপনার যে সাধনা, আপনার ত্যাগ-তিতিক্ষার যোগ্য উপমা দেয়া সম্ভবত বাংলাদেশের কোনো মানুষের নেই। শুধু এতটুকু বলতে চাই, আপনি ছাড়া বাংলাদেশ আসলেই অসম্পূর্ণ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,ইদানীং মানুষ সব ক্ষেত্রেই আপনার হস্তক্ষেপ কামনা করে থাকে। অনেকে পারিবারিক সমস্যা নিয়ে আপনার হস্তক্ষেপ কামনা করে। অনেকে আবার বিবাহ বিচ্ছেদের ফলেও আপনার হস্তক্ষেপ কামনা করে। নানাবিধ মামুলি বিষয় নিয়ে আপনার হস্তক্ষেপ কামনা করে।

আমি একজন ছোট্ট মানুষ, বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে চলা এক যুবক, বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ছাত্রসংঠনের একজন সামান্য কর্মী। সজীব ওয়াজেদ জয়ের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক যুবক।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার কাছে এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে আপনার হস্তক্ষেপ কামনা করতে চাই যে বিষয়টি পাশ কাটিয়ে গেলে বাংলাদেশের বৃহত্তর একটি অঞ্চল আগেও অবহেলিত ছিল, এখনো আছে, এমনকি সুদূর ভবিষ্যতেও অবহেলিত থেকে যাবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,উত্তরবঙ্গে উচ্চশিক্ষার প্রসারের জন্য এই অবহেলিত অঞ্চলের মানুষের অনেকদিনের দাবি ছিলো একটি বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৮ সালে সেটি আলোর মুখ দেখে। উত্তরবঙ্গের মানুষ কিছুটা স্বস্তি পায়। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি সহজ সরল উত্তরবঙ্গের ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষা অর্জনের তীর্থস্থানে পরিণত হওয়ার কথা, কিন্তু বিগত দশ বছর অতিক্রান্ত হলেও এখানে গুণগত মান সম্পন্ন শিক্ষার প্রসার ঘটেনি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,আপনি জেনে অবাক হবেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা যতটা না গুণগত শিক্ষার উন্নয়নের সঙ্গে পরিচিত, তার থেকেও বেশি পরিচিত দুর্নীতির সঙ্গে, শিক্ষকদের নোংরা রাজিনীতির সঙ্গে, অন্তঃকলহ আর স্বার্থান্ধ মানুষের সঙ্গে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আজ বলতে বাধ্য হচ্ছি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপনি আপনার শশুড়বাড়ী পীরগঞ্জে জনসভা ও নৌকার জন্য ভোট চাইতে এসেছিলেন। আপনার নৌকার প্রচারণায় দেশের উচ্চপর্যায়ের অনেক শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীরাও এসেছিলেন। সেদিন আপনি জনসভা করে চলে যাওয়ার পর, আমরা রংপুর জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি মেহেদী হাসান রনি ভাইয়ের নেতৃত্বে দেশের একজন বরেণ্য বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে নৌকার প্রচারণা চালাই। প্রচারণা শেষে উনি আমাদের পরিচয় নেন। সেখানে আমি পরিচয় দিয়েছিলাম, আমি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট। সেদিন সেই বরেণ্য ব্যক্তিটি ফিসফিস বলেছিলেন- আচ্ছা, বিশ্ববিদ্যালয়টি চলে কীভাবে? লজ্জায় আমার মাথা নিচু হয়ে আসে, আমি আর কোনো কথা বলতে পারিনি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,এখানে প্রত্যেকটি ডিপার্টমেন্টে ভয়াবহ সেশনজট। শিক্ষার্থীর তুলনায় ক্লাসরুম অপ্রতুলতা, শিক্ষক সংকট, আবাসন সংকটসহ নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়। সবচেয়ে বড় যে সমস্যা সেটি হলো, এসব সমস্যা উত্তরণের ব্যাপারে প্রশাসন একেবারেই উদাসীন। এখানে পক্ষ বিপক্ষের রাজনীতি চলে। সেশনজট নিরসনের জন্য শিক্ষকদের সহায়তা না করে বুনিয়াদী প্রশিক্ষণের নামে গাড়ি ড্রাইভিং, বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণে নিয়ে যাওয়া হয়। অথচ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণস্পন্দন ছাত্রছাত্রীরা সেশনজটে পড়ে অসহনীয় দুশ্চিন্তায় দিনাতিপাত করে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,আপনি নিশ্চয়ই জানেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সমস্ত ছাত্রছাত্রী লেখাপড়া করেন, তারা অধিকাংশই নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। এই নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা লেখাপড়া শেষ করে বাবার সংসারের হাল ধরতে চায়। কিন্তু এখানকার অনেক স্টুডেন্টের সে আশায় গুড়েবালি। বিশেষ করে বিজ্ঞান অনুষদের ২০১১-১২ সেশনের ছাত্রছাত্রীরা এখন পর্যন্ত মাস্টার্স সম্পন্ন করতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এদিকে নজর না দিয়ে শিক্ষকদের বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ, গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হাতে নেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অবশ্যই আপনার একান্ত হস্তক্ষেপ কামনা করছি কারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নীতি বহির্ভূত অনেক কাজকর্ম করে থাকে। একজন স্টুডেন্ট শুধু সার্টিফিকেট অর্জনের জন্য এখানে ভর্তি হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মানুষ, ন্যায়-নীতি ও আদর্শবান হওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু এখানে সমস্ত কিছু উল্টো। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক, কর্মকর্তা সবাই নীতি ও আদর্শচ্যুত, এখানকার সবাই স্বার্থান্বেষী। বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির উদ্দেশ্য হলো জ্ঞান চর্চাক্ষেত্র হিসেবে, এখানে তার কোন ছাপ নেই। কী কী পদক্ষেপ নিলে শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে, কী কী পদক্ষেপ হাতে নিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত শিক্ষার্থী আদর্শগত দিক থেকে পরিণত হবে, এসব ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো সৃজনশীল চিন্তাধারা নেই। সবাই কাদা ছোড়াছুড়িতেই ব্যস্ত।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো সেই রাষ্ট্রের নাগরিকদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা। নাগরিকদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকল্প নেই। আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের মধ্যে উত্তরবঙ্গের দ্বারপ্রান্তে অবস্থিত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়টি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ অবস্থা স্বচক্ষে দেখলে কিংবা জানলে কোনো অভিভাবক তার সন্তানকে এখানে ভর্তি করানো থেকে দূরে থাকবেন। যারা জানেন তারা ঘৃণার চোখে তাকান।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি গোয়েন্দা সংস্থার দ্বারা একটু খোঁজ নিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন, একটি চক্র কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে নিয়ে খেলছে। এটি কোনো রাজনীতির মাঠ নয়, এটি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে গুণগত শিক্ষার প্রসার ঘটুক, জাতির উন্নয়নে কাজে লাগুক, এটিই সবার কাম্য হওয়া উচিত। কিন্তু গুটিকয়েক স্বার্থান্বেষী মহল বিশ্ববিদ্যালয়টিকে স্বার্থ হাসিলের কারখানায় পরিণত করবে, এটি আমাদের কাম্য নয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন বলতে রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নকে বোঝায়। আমাদের অবহেলিত উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের জন্য আপনার সরকারের হাতে নেয়া উল্লেখযোগ্য কাজগুলো কিছুদিনের মধ্যেই সবার দৃষ্টিগোচর হবে বলে আমরা আশাবাদী। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি যে দিকটার উপর বেশী দৃষ্টি দেয়া উচিত সেটি হলো শিক্ষা। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যেভাবে পক্ষ-বিপক্ষের কাদা ছোড়াছুড়ি চলছে, তাতে সমস্ত ছাত্রছাত্রীর জীবন ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সমস্যা সমাধানের কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে গুটিকয়েক স্বার্থান্বেষী মহলের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য এবং দশ হাজার ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যতের কথা ভেবে আপনার মাতৃসুলভ হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

সজিব হোসাইন/এফএ/এমকেএইচ