মতামত

বামদের ফ্রেন্ডলি হরতাল : বিএনপির সার্কাস

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে রোববার আধাবেলা হরতাল করেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। গণমাধ্যমে বিশেষ করে সংবাদপত্রগুলোতে তেমন কাভারেজ নেই হরতালটির। যতটুকু সংবাদ প্রচার হয়েছে সেটাও নিরুত্তাপ, ঢিলেঢালা ইত্যাদি নামে।

অন্তত তিনটি কারণে এ হরতাল ছিল বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। প্রথমত. হরতালের বিষয়বস্তু অত্যন্ত জনসম্পৃক্ত। দ্বিতিয়ত. টানা তৃতীয় মেয়াদের সরকারের বিরুদ্ধে এটি প্রথম হরতাল। তৃতীয়ত. এতে সমর্থন দিয়েছে বিএনপির মতো বড় দল। কিন্তু, হরতালটি সাড়া তুলতে পারেনি। মিছিল-পিকেটিং জমাতে পারেননি বাম নেতাকর্মীরা। বিএনপিও রাস্তায় নামেনি।

দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকে বামদের হরতালে বিএনপির সমর্থন জানানোকে একটি ভিন্নমাত্রার ঘটনা মনে করা হয়েছিল। কিন্তু, আদতে অনেকটা সার্কাসই করেছে বিএনপি। যেমনটি নিজেরা করে আসছে নানা ইস্যুতে, নানা সময়ে। প্রতিপক্ষের ওজন বুঝেছে সরকারও। হরতাল নিয়ে যথারীতি স্বভাবসুলভ মশকরা করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো যৌক্তিক। কিন্তু হরতাল অযৌক্তিক। গণ-আন্দোলনের অস্ত্র হিসেবে হরতালে মরিচা ধরেছে। জনগণ বাস্তবতা বোঝে।

আসলেই তো। জনগণ যা-ই বুঝুক, সরকার জনগণের বাস্তবতাটা বুঝেছে আরো আগেই। সেটা সব চেয়ে বেশি জেনেছে-বুঝেছে সরকার। জনগণের বুঝজ্ঞানের ভোঁতা দশার ছায়া সবখানেই। তামাশা দেখতেও এখন তাদের অনীহা। সেই উৎসাহ থাকলে বাম জোটের হরতালের তাল-লয় দেখতেও কিছু উৎসুক জনতা পাওয়া যেত। রবিবারের আধাবেলা হরতালে সেটা রাজধানী বা দেশের কোথাও পাওয়া যায়নি। এমন কি তাদের হেড কোয়ার্টার তোপখানা রোডও খাঁ খাঁ করেছে।

সকাল থেকেই যান চলাচল ছিল স্বাভাবিক। কোথাও কোথাও যানজট আগের তুলনায় বেশি ছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ছিল খোলা। এ হরতালের মাধ্যমে বামরা কোনো বার্তা দিতে পেরেছে কি-না, সেটা বলার সময় হয়তো এখনো আসেনি। হরতালের মাধ্যমে গ্যাসের দাম বাড়ানোর এমন দরকার বা সাহস বিরোধীমতের অন্য কোনো দল দেখায়নি। এ সত্য মেনে নেয়া-না নেয়ার অধিকার সবারই আছে। সবারই জানা, রাজধানী বা দেশের কোথাও জোরদার মিছিল-মিটিং, পিকেটিং করার সামর্থ বামদের নেই। এরপরও তারা করার চেষ্টা করেছে।

গ্যাসের দাম বাড়ানো শুধু বামদের সমস্যা নয়। এটি সব মানুষেরই সমস্যা। তাই বলে মানুষ নিজের স্বার্থে হরতালে স্বতঃস্ফুর্ত হয়নি। তার মানে মানুষ সরকারের সঙ্গেই আছে। হরতাল সফল হলেই বামদলগুলো রাতারাতি শক্তিমান হয়ে যাবে, ক্ষমতায় বসে যাবে এমনও নয়। কারো কারো মতে, হরতাল করা সকল দলের গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও এ দেশে আর কোনদিন হরতাল হবে না। এমনকি আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে গেলেও । এমন একটি জনসম্পৃক্ত, জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জনগণ কেন বামদের পাশে এলো না-সেই ভাবনা একান্তভাবে ভাবতে হবে বামদেরই।

দেশের ঐতিহাসিক গণআন্দোলনগুলোতে বামদের ভূমিকাও ঐতিহাসিক। ’৪৭ থেকে ’৭১-এর প্রতিটি পর্যায়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে বামপন্থীদের অবদান বিশাল। শ্রেণি শোষণ থেকে আরম্ভ করে সব ধরনের শোষণ, অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি, কমিউনিস্টরাই সর্বকালে সর্বদেশে লড়াই করে এসেছে। বুর্জোয়া নেতৃত্বও নানা ধরনের সামাজিক অবিচার, লিঙ্গ বৈষম্য ও জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। কিন্তু শ্রেণী স্বার্থের কারণে তারা প্রায়শ দৃঢ়তার সঙ্গে লড়তে পারে না, মাঝপথে আপোস করে। শুধু বাংলাদেশ নয়, অবিভক্ত ভারতবর্ষের ইতিহাসও তাই।

স্বাধীনতার আগে-পরে দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুর নেতৃত্বে ছিলেন বামপন্থি ছাত্রনেতারা। ১৯৬৩-১৯৬৪ থেকে ১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত ডাকসু নির্বাচনে বামপন্থি প্যানেলের প্রবল দাপট দেখা গেছে। ডাকসুর নেতৃত্ব দেয়া সেই নেতারাই পরবর্তী সময়ে দেশ ও জাতির নেতৃত্বে এসেছেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তাদের ভূমিকা ছিল অসাধারণ। নব্বইয়ের গণআন্দোলনেও বামদের নেতৃত্বাধীন পাঁচ দলকে বিশেষ আমল দিয়ে চলতে হতো আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে। ওই সময় আন্দোলনের কৌশল ও কর্মসূচির ফ্যাক্টরি বলা হতো তাদের।

এর বিপরীতে বামপন্থীদের বিশাল অবদানকে উপেক্ষা করার একটি প্রবণতা রয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে অথবা মিডিয়ার প্রচারের ক্ষেত্রেও। বামপন্থীদের অবদানকে হয় অস্বীকার অথবা যতোটা সম্ভব ছোট করে দেখা ও দেখানোর চেষ্টা রয়েছে। বামরাও এ ধকল কাটানোর মতো পদক্ষেপ না নিয়ে বরং ইনু, মেনন, দিলীপ বড়ুয়া তৈরিতে বেশি খাটুনি খাটছে। এর পরিণতিতে গা তুলে দাঁড়ানোর শক্তি সঞ্চয় করতে পারছে না বাম দলগুলো। রাজনীতির মাঠে তারা হয়ে যাচ্ছে কারো না কারো খাদ্য।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারে মন্ত্রীত্ব হারানোর পর গোটা বামপাড়া এখন আরেক ধকলের শিকার। এতোদিন সরকারে থেকেও জাতীয় রাজনীতিতে বা এলাকায় সাংগঠনিক দৈন্যদশা একটুও কমেনি। বরং বেড়েছে। দশ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকার রাজনৈতিক সুযোগ তারা নিতে পারেননি। নিজেদের পার্টির বক্তব্য নিয়ে যেতে পারতেন মানুষের কাছে। গতি আনতে পারতেন সহযোগী গণসংগঠনগুলোতে। ছাত্র সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন শক্তিশালী করার সুযোগ ছিলো তাদের। কিন্তু সেদিকে তাদের মনোযোগ ছিল না।

দলের শক্তি বৃদ্ধি এবং প্রদর্শন করা গেলে জোটের মুরুব্বি আওয়ামী লীগের কাছে বামদের ওজন বাড়তো। শেখ হাসিনার একক দয়ায় যারা মন্ত্রীত্ব পেয়েছেন তারা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ে সৃজনশীলতাও দেখাতে পারেননি। এমপিরা সংসদের ফাঁকা মাঠেও এমন কোনো বক্তব্য বা যুক্তি উত্থাপন করতে পারেননি যা মানুষ মনে রাখতে পারতো। সেই চেষ্টাও ছিল না সরকারঘেঁষা বামদের মধ্যে। তার চেয়ে তারা জানপ্রাণ ব্যস্ত থেকেছেন আওয়ামী লীগের সাথে গলা মিলিয়ে বিএনপি-জামায়াত ঠেকাও বলে চেঁচাতে। শেখ হাসিনার বন্দনায় তারা সফল হয়েছেন। কখনো কখনো পেছনে ফেলতে পেরেছেন আওয়ামী লীগ নেতাদেরও। নতুন মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েছেন সবাই। তা নিয়ে অভিমান দেখাচ্ছেনও নির্লজ্জভাবে। তাদের মন্ত্রিত্ব করা দেখেও দেশের মানুষ হেসেছে।

এখনকার অভিমান দেখেও হাসছে। আবার আন্দোলন, সংগ্রাম, হরতালের শ্রম-ঘাম নিয়েও হাসছে। তামাশা করছে। সার্কাসের আইটেমের মতো মজা নেয়। অথচ শক্তিতে কমজুরি হলেও বামদের প্রতি কিছু মানুষের ছিল ভিন্ন রকমের ধারণা। ইনু-মেনন-দিলীপ বড়ুয়াদের উছিলায় সেটাও কৌতুকে পরিণত হয়ে মাঠে মারা গেছে। এ অবস্থায়ই বামদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এসেছে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পরামর্শ। কিন্তু তারা একে ভালো নজরে নেননি। নিয়েছেন তাচ্ছিল্য হিসেবে। তা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর হিম্মত নষ্ট করে ফেলনা করেছে বামদের। এর জের বা পরিণতি এখন অবধারিতভাবে ভুগছে বামরা। যার এক কিস্তি দেখা গেল জরুরি ও জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে হরতাল ডেকেও।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

এইচআর /এমএস