দেশজুড়ে

‘নুরুল আমিনকে দিয়ে নুসরাতকে কক্ষে ডেকে পাঠান সিরাজ’

ফেনীর আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা মামলায় পরীক্ষার হল সুপারসহ তিনজনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়েছে।

মঙ্গলবার ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতেমামলার ১৯ নম্বর সাক্ষী হল সুপার নুরুল আবছার ফারুকী, ২০ নম্বর সাক্ষী নুসরাতের সহপাঠী তানজিনা বেগম সাথী ও ২১ নম্বর সাক্ষী অপর সহপাঠী বিবি জাহেদা তামান্নার সাক্ষ্যগ্রহণ ও আসামি পক্ষের আইনজীবীদের জেরা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় সকল আসামি আদালতে হাজির ছিলেন।

আদালত সূত্রের বরাত দিয়ে জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট হাফেজ আহাম্মদ জানান, গত ২৭ জুন থেকে মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। এ পর্যন্ত আদালত ২১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করেন ও তাদের জেরা সম্পন্ন হয়।

আগামীকাল বুধবার মামলার ২২ নম্বর সাক্ষী ওই মাদরাসার বাংলা বিভাগের প্রভাষক খুজিস্তা খানম, ২৩ নম্বর সাক্ষী মাদরাসার আয়া বেবি রানি দাস, ২৪ নম্বর সাক্ষী আকলিমা আকলিমা আক্তার ও ২৫ নম্বর সাক্ষী মো. কায়সার মাহমুদের সাক্ষ্যগ্রহণের কথা রয়েছে।

হল সুপার ফারুকী সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেন, সেদিন আমি হল সুপারের দায়িত্ব পালন করছিলাম। সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে হলের বিভিন্ন কক্ষে প্রবেশ করে পরিদর্শন করি ও সার্বিক প্রস্তুতি তদারক করি। ১০টার কিছু আগে বহু লোকজনের হৈ চৈ শুনে, চিৎকার শুনে অন্য অনেকের সঙ্গে আমিও বাইরে ছুটে যাই। দেখি- বেশ কয়েকজন মিলে একটা আগুনে পোড়া দেহ নিচে নামিয়ে আনছেন। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি সে আলীম পরিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি। সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানাই। পরে গণমাধ্যমের খবর ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ নানা মাধ্যমে জানতে পারি- ওই মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে করা যৌন হয়রানির মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় অধ্যক্ষের অনুগতরা তার নির্দেশে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে।

হল সুপার আরও বলেন, ঘটনার পর তদন্ত করতে গিয়ে পিবিআই কর্মকর্তারা মাদরাসার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদ থেকে কেরোসিন মিশ্রিত কালো রঙের পলিথিন, বাটিকের একটি ওড়নার পোড়া অংশ, সেন্টারের নিচের মেঝে থেকে এক জোড়া নেভি-ব্লু রঙের জুতা, একটি টিয়া রঙের সালোয়ারের নিচের দিকের পোড়া অংশ, একটি কালো রঙের বোরকার পোড়া অংশ ও নীল রঙের রাবারের ম্যাট (মাদুর) উদ্ধার করেন। পরে একটি জব্দ তালিকা তৈরি করা হলে আমি তাতে স্বাক্ষর করি।

সাক্ষ্য দিতে গিয়ে নুসরাতের সহপাঠী তানজিনা বেগম সাথী বলেন, ‘২৭ মার্চ অধ্যক্ষ পিয়ন নুরুল আমিন নানাকে দিয়ে নুসরাতকে তার কক্ষে ডেকে পাঠান। নুসরাত একা না গিয়ে নিশাত ও ফুর্তিকে নিয়ে যায়। নিশাত ও ফুর্তি বাইরে থাকে, নুসরাত ভেতরে যায়। পরবর্তীতে আমরা জানতে পারি-ওখানে অধ্যক্ষ তাকে যৌন হয়রানি করেছেন। পরে দেখা হলে আমি নুসরাতের কাছে জানতে চাই, ওখানে কী ঘটেছিল? নুসরাত বলে, কী হতে পারে তোরা জানিস না? নুসরাতের মৃত্যুর পর তার ঘর থেকে পাওয়া খাতায় দেখা যায়, সে আমার ও আমার বোন তামান্নার উদ্দেশে লিখে গেছে ওই দিনের ঘটনা। সে লিখেছিল- ওস্তাদ তো ওস্তাদই হয়। সে কীভাবে ছাত্রীর গায়ে হাত দেয়? নুসরাত লিখেছিল, আমি মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে এর বিচার চাইব। আমি আমার অসম্মানের বিচার চাইতে শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাব। আমি কিছুতেই হারব না।’

সাথী বলেন, ওই খাতার কথা আমরা নানা গণমাধ্যমে ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে জানলেও তা পাইনি। নুসরাত তার আবেগ মেশানো কিছু কথা খাতায় লিখে গেছে বলে জানান সাথী। নুসরাত তাকে বলেছিল, অনেককে বোঝাতে চেয়ে পারিনি। কেউ আমাকে বুঝতে পারেনি। যেখানে গিয়েছি অসম্মানের শিকার হয়েছি।

অপর সাক্ষী তামান্নার বক্তব্যও একই হওয়ায় আদালত তার বক্তব্য গ্রহণ না করে ‘উভয়ের একই বক্তব্য’ হিসেবে গ্রহণ করেন।

পরে সাক্ষীদের জেরা করেন আসামি পক্ষের আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন নান্নু, কামরুল হাসান, নাছির উদ্দিন বাহার, মাহফুজুল হক, সিরাজুল ইসলাম মিন্টু, ফরিদ উদ্দিন নয়ন, আহসান কবির বেঙ্গল ও নুরুল ইসলাম। রাষ্ট্র ও বাদী পক্ষে ছিলেন পিপি হাফেজ আহাম্মদ, এপিপি এ কে এস ফরিদ আহাম্মদ হাজারী, এম শাহজাহান সাজু।

নুসরাত হত্যা মামলায় সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ দৌলা (৫৭), নুর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর (৫০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে চম্পা/শম্পা (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদরাসার সাবেক সহসভাপতি রুহুল আমিন (৫৫), মহিউদ্দিন শাকিল (২০) ও মোহাম্মদ শামীমের (২০) সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে চার্জশিট দেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

এ মামলায় মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, উম্মে সুলতানা পপি, কামরুন নাহার মনি, জাবেদ হোসেন, আবদুর রহিম ওরফে শরীফ, হাফেজ আবদুল কাদের ও জোবায়ের আহমেদ, এমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার হোসেন রানা ও মহিউদ্দিন শাকিল আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

চলতি বছরের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের দায়ে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ৬ এপ্রিল ওই মাদরাসা কেন্দ্রের সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে অধ্যক্ষের সহযোগীরা নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। টানা পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে মারা যান নুসরাত জাহান রাফি।

এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন।

রাশেদুল হাসান/এমবিআর/পিআর