স্বাস্থ্য

ডেঙ্গু নিয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে

দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মোট মৃত্যুহার দশমিক ২ শতাংশেরও (০.২) কম। তবে মৃত্যুহারের দিক দিয়ে চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মৃত্যুহার মোট মৃত্যুর প্রায় ৫ শতাংশ, যা সাধারণ মানুষের তুলনায় ২০ থেকে ২৫ গুণ বেশি। বিষয়টি অবশ্যই গবেষণার দাবি রাখে। এছাড়া ডেঙ্গু মোকাবিলায় চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।

রোববার (২৫ আগস্ট) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সেমিনার সাব-কমিটির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ‘ডেঙ্গু : বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষিত শীর্ষক কেন্দ্রীয় সেমিনার’ এ এসব তথ্য জানানো হয়।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, সরকারি হিসাব মতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৬২ হাজারেরও বেশি রোগী এবং এর মধ্যে মারা গেছেন ৪৭ জন। তবে বেসরকারি হিসাব মতে মৃত্যুহার এর দ্বিগুণ। সরকারি অথবা বেসরকারি যে হিসাবই ধরা হোক না কেন চিকিৎসক, নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ানদের নিরলস প্রচেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট সবার সুন্দর ব্যবস্থাপনার কারণে শতকরা মৃত্যুহার দশমিক ২ শতাংশের নিচে রাখা সম্ভব হয়েছে এবং ডেঙ্গুর সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করাও সম্ভব হয়েছে।

সেমিনারের প্রধান অতিথি বিএসএমএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, প্রতিরোধেই অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। মশা নিধনে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।

তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেঙ্গু সেল চালু হওয়ার পর থেকে আজ (২৫ আগস্ট, রোববার) সকাল ৮টা পর্যন্ত ১ হাজার ২১ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে তিনজন মারা গেছেন। অন্যরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫ হাজার ৫৫৫ জন। যারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।

বিএসএমএমইউ উপাচার্য বলেন, সাধারণ জ্বরের রোগীদের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার এখন ১০ শতাংশের মতো। তারপরও ডেঙ্গু রোগীর আক্রান্তের সংখ্যা আরও কমিয়ে আনতে হবে। এ জন্য সিটি কর্পোরেশন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে মশা নিধনে আরও তৎপর হতে হবে। সাথে সাথে সাধারণ জনগণকেও এডিস মশা কোথায় থাকে তা জেনে মশা নিধনের বিষয়ে আরও বেশি সচেতন হতে হবে।

তিনি বলেন, যে সব মুমূর্ষু রোগী আইসিইউ, এইচডিইউ, সিসিইউর মতো ইউনিটে চিকিৎসাধীন থাকে সেখানে গভীর রাত বা ভোর রাতেও সমানভাবে রোগীকে পর্যবেক্ষণ করতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও নার্সকে সতর্ক থাকতে হবে। বিএসএমএমইউ থেকে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, নিটোর, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চিকিৎসক প্রেরণ করা হয়েছে।

সেমিনারে বিএসএমএমইউর উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. সাহানা আখতার রহমান, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ রফিকুল আলমসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক ও রেসিডেন্ট ছাত্রছাত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারে প্যানেলিস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএসএমএমইউর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. চৌধুরী আলী কাওসার, ন্যাশনাল গাইডলাইন ফর ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট অব ডেঙ্গু, অধ্যাপক ডা. কাজী তরিকুল ইসলাম।

এডিস মশার বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার। ডেঙ্গু ভাইরাসের নানা দিক নিয়ে বিশদভাবে তুলে ধরেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আফজালুন নেছা। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর জটিল পরিস্থিতি ও বিশেষ চিকিৎসাসেবা এবং ব্যবস্থাপনার ওপর বিস্তারিত তুলে ধরেন ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ আরাফাত।

ডেঙ্গু পরীক্ষা ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। শিশুদের ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিষয়ে তুলে ধরেন শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কামরুল লায়লা। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মো. জিলন মিঞা সরকার। মডারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান।

গুরুত্বপূর্ণ এ সেমিনারে বিশেষজ্ঞ ও আলোচকরা মশা নিধন, রোগ প্রতিরোধ ও যথাযথ চিকিৎসাসেবা প্রদানের ওপর আলোকপাত করেন। তারা বলেন, যত দ্রুত রোগ নির্ণয় করা যাবে তত দ্রুত রোগীকে উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রদান করা সম্ভব হবে, যা রোগীর জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হবে।

তারা আরও বলেন, সেমিনারের মাধ্যমে বিএসএমএমইউ ডেঙ্গু রোগ নিয়ে গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে এবং সেই গবেষণার ফলাফলই আগামী দিনে বাংলাদেশের ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবে। শুধু তাই নয়, আজকের সেমিনার বর্তমান সময়েও ডেঙ্গু ভাইরাসের কোনটাতে কী ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন তা জানা সম্ভব হচ্ছে।

সেমিনারে ডেঙ্গু ভাইরাস বাহক এডিস মশা নিধন থেকে শুরু করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত জটিল রোগীর সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা প্রদান ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচিত হয়। সেমিনারে শিশুদের ডেঙ্গু চিকিৎসার ব্যবস্থা, জটিল ও ক্রিটিক্যাল রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়ে আলোকপাত করা হয়।

ন্যাশনাল গাইডলাইন ফর ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট অব ডেঙ্গু, অধ্যাপক ডা. কাজী তরিকুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় যথাযথ ফ্লুয়েড ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত জরুরি। ডেঙ্গু মোকাবিলায় চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর সার্বিক পরিস্থিতি কেমন থাকে সেদিকে যেমন দৃষ্টি রাখতে হবে তেমনি পরিস্থিতি মোকাবিলায়ও সংশ্লিষ্ট সবাইকেই প্রস্তুত থাকতে হবে।

এমইউ/আরএস/জেআইএম