দেশজুড়ে

বদলে গেছে রাজবাড়ীর প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো

২০১৮-১৯ অর্থ বছরে রাজবাড়ী সদর উপজেলার ১৩৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও শ্রেণি বিন্যাসে সংস্কারমূলক উন্নয়নে পৃথকভাবে বিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন অংকের টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। তবে বরাদ্ধকৃত খাত একাধিক হওয়ায় সংস্কারমূলক উন্নয়ন কাজ আলাদা আলাদাভাবে দৃশ্যমান হয়নি। কিন্তু বিদ্যালয় সংস্কার ও বিভিন্ন ধরনের উপকরণ ক্রয়ে বছরে প্রায় ৩ লাখ টাকা পায় অসংখ্য প্রাথমিক বিদ্যালয়।

এ রবাদ্দকৃত খাত বা কাজের বিষয়ে শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ছাড়া জানেন না অন্য কেউ। অভিভাবক ও সচেতন মহলের দাবি জনগণকে জানিয়ে এসব কাজ করলে কাজের মানসহ স্বচ্ছতা বাড়বে। তাই আগামী দিনে স্থানীয় এলাকাবাসী ও অভিভাকদের জানিয়ে স্কুলের উন্নয়নমূলক কাজ করার দাবি তাদের।

এদিকে বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির সভাপতিদের দাবি উপজেলা প্রকৌশলীর নির্দেশনা মোতাবেক বিদ্যালয়ের ভবন, আসবাবপত্র সংস্কার, রংসহ অন্যান্য কাজ করা হয়েছে। এছাড়া যথাযথ কর্তৃপক্ষ কাজ পরিদর্শন করে প্রত্যয়নও দিয়েছেন এবং স্বচ্ছতার জন্য কাজের ব্যয়ের বিবরণ ভাউচারসহ রেখে দিয়েছেন।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে বিদ্যালয়গুলো রাজস্ব ও উন্নয়নের জন্য দেড় বা ২ লাখ টাকা, স্লিপের শিক্ষার্থী অনুযায়ী ৫০ বা ৭০ হাজার, রুটিন মেইনটেন্যান্সের ৪০ হাজার, ওয়াসব্লকের ২০ হাজার এবং প্রাক-প্রাথমিকের ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। তবে ১৩৫টি স্কুলের মধ্যে রাজস্ব খাতে ২০টি ২ লাখ ও উন্নয়ন খাতে ২০টি স্কুল দেড় লাখ করে মোট ৪০টি স্কুল বরাদ্দ পায়।

এছাড়া উপজেলার প্রতিটি স্কুল স্লিপের ৫০ বা ৭০ হাজার ও প্রাক-প্রাথমিকের ১০ হাজার করে টাকা পেয়েছে এবং ওয়াসব্লক থাকা স্কুলগুলো পেয়েছে ২০ হাজার ও রাজস্ব ও উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ না পাওয়া স্কুলগুলো রুটিন মেইনটেন্যান্সের ৪০ হাজার টাকা করে পেয়েছে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রাজস্ব ও উন্নয়ন খাতের দেড় বা দুই লক্ষ টাকা দিয়ে বিদ্যালয় ভবন রং, ফ্যান ক্রয় ও মেরামত, দরজা-জানালা, বেঞ্চ মেরামত, কেচি গেট মেরামত, বাগান তৈরি, বাণী লেখা, শোকেস বার্ণিশ, আলমারি ও ফাইল কেবিনেট রং করা, টেবিল চেয়ার মেরামত, গ্রিলের গেট তৈরি ইত্যাদি।

স্লিপের প্রকার ভেদে ৫০/৭০ হাজার টাকায় বায়োমেট্রিক হাজিরা, শিক্ষা উপকরণ তৈরি, উপকরণ রাখার সেলফ তৈরি, জাতীয় দিবস উদযাপন, মা সমাবেশ উদযাপন, গরিব শিক্ষার্থীদের খাতা ও কলম ক্রয়, টয়লেট পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্নকরণ সামগ্রী ক্রয়, ফুলের বাগান তৈরি, মেধা পুরস্কার ক্রয়, ক্ষুদে ডাক্তারদের ড্রেস তৈরি, পাঠাগারের বই ক্রয়, ফিল্টার ও স্টিলের আলমারি মেরামত ইত্যাদি।

রুটিন মেইনটেন্যান্সের ৪০ হাজার টাকায় দেয়াল ও মেঝে মেরামত, শ্রেণিকক্ষ সজ্জিতকরণ, অফিস ও শ্রেণিকক্ষে বিভিন্ন উপকরণ ক্রয়, প্রাক-প্রাথমিকের ১০ হাজার টাকায় প্লাস্টিকের ম্যাট ক্রয়, প্লাস্টিকের ঘোড়া, স্লিপার, জুতার বাক্স, রং পেনসিল, চক, হাড়ি, পাতিল, বল ইত্যাদি। ওয়াসব্লকের ২০ হাজার টাকায় টয়লেট সামগ্রী ও তালা ক্রয়, বাল্ব ও হোল্ডার ক্রয়, রং করা, ট্যাঙ্কি পরিষ্কর, পরিচ্ছন্নকর্মীর চার্জ ইত্যাদি কাজে খরচ করা হয়েছে।

রাজবাড়ী বেসরকারি পলিটেনিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক আছিফ মাহমুদ জাগো নিউজকে বলেন, বর্তমান সরকার শিক্ষা বান্ধব সরকার। শিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সংস্কারের জন্য বছরে ছোট ছোট যে বরাদ্দ দিচ্ছে। তাতে বিদ্যালয়গুলোর চেয়ার পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেভাবে হচ্ছে না। তাই উন্নয়ন কাজ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির পাশাপাশি স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও সুশীল সমাজের মানুষের সমন্ময়ে করা উচিত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বলেন, আসলে মেরামত, সংস্কার, স্লিপ, রুটিন মেইনটেন্যান্স যাই বলেন না কেন ওই টাকা দিয়ে স্কুলের কাজই করা হয়। কারণ ওই সামান্য টাকা দিয়ে একটি স্কুলের সারা বছরের মেরামত কাজসহ অন্যান্য কাজ করা কষ্ট। স্কুলে তো অনেক খরচ। কাজের শেষে খরচের স্থানে উল্লেখ করে লেখা হয় কি কাজ করা হয়েছে। কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এলে চা নাস্তার ব্যবস্থা, হঠাৎ কেউ পরিদর্শনে এলে চা নাস্তার ব্যবস্থা করতে হয়। সেই খরচ কে দেবে? আর সেই খরচ তো রেজিস্ট্রারে লেখা যায় না। তাই উন্নয়নমূলক সবগুলো কাজ একত্রে করে কাগজে কলমে ভাগ ভাগ করে দেখানো হয়। তবে এসব ছোট ছোট বরাদ্দের টাকা থেকে তেমন দুর্নীতি হয় না। কাজ শেষে কিছু টাকা থাকে। যা সারা বছরের আপ্যায়নে খরচ হয়। এছাড়া জরুরি ভিত্তিতে স্কুল শিক্ষার্থী বা শিক্ষকের কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এসব টাকা থেকে খরচ করা হয়।

রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. নূর মোহাস্মদ ভূইয়া জাগো নিউজকে বলেন, তার স্কুলের নতুন ভবনের দ্বিতীয় তলা ও ওয়াসব্লকের নির্মাণ কাজ চলছে। যার কারণে স্কুলটি শুধু স্লিপ ও প্রাক-প্রাথমিকের টাকা পেয়েছে। নির্মাণ কাজ চলায় সেই টাকাও এখনও উঠাননি। তবে কিছু দিনের মধ্যে টাকা তুলে কাজ শুরু করবেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্কুলের এ অল্প বরাদ্দের টাকা এদিক ওদিক হয় না। কারণ যারা দায়িত্বে থাকেন, তারা সেটি করতে দেন না। সদরের প্রতিটি স্কুলের কমিটির সদস্যরা অনেক ভালো এবং শিক্ষার উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে তাদের সবার।

সিংঙা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাশিদা খাতুন বলেন, তার স্কুল ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে স্লিপ, রুটিন মেইনটেন্যান্স, ওয়াসব্লক ও প্রাক-প্রাথমিকের টাকা পেয়েছে এবং সেই টাকা দিয়ে কাজও করিয়েছেন। এ কাজ তো আরও ৫/৬ মাস আগে শেষ হয়েছে।

আলাদী আরসি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাছিমা আক্তার বলেন, তার স্কুল রাজস্ব খাতের দুই লাখ টাকাসহ, স্লিপ, ওয়াসব্লক ও প্রাক-প্রাথমিকের টাকা পেয়েছেন। এ টাকা দিয়ে স্কুল ভবন রং, প্লাস্টার, বাণী লেখা, পেইন্ট করা, শিক্ষা ও খেলাধুলার উপকরণ ক্রয়, ফ্যান মেরামত ও ক্রয় ইত্যাদি কাজে খরচ করেছেন। এসব উপজেলা প্রকৌশলীর নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেছেন। কাজ শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এসে পরিদর্শন করে প্রত্যয়ন দিয়েছে। শুধুমাত্র বায়োমেট্রিক হাজিরার টাকাগুলো এখন আছে। কারণ ওটা শিক্ষা অফিসের মাধমে কেনা হবে। কাজ তো অনেক দিন আগে করা হয়েছে। এখন দেখলে মনে হবে পুরাতন, কিন্তু না।

কোলা সরকারি প্রাথমকি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি টিটোন বিশ্বাস বলেন, স্কুলের অভিভাবক ও শিক্ষকদের সমন্ময়ে উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়। টাকা নিয়ে অনিয়ম করা তো দূরের কথা, মাঝে মাঝে নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয়। উন্নয়ন কাজ চলার সময় তিনি কাজের সার্বিক তদারকি করেছেন।

সদর উপজেলার শিক্ষা অফিসার নাসরিন সুলতানা বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের টাকা তো জুনে শেষ হয়েছে। আবার নতুন অর্থবছর শুরু হয়েছে। ওই অর্থ বছরে তার ১৩৫টি স্কুলের ৩৮টি স্কুল রাজস্ব ও উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ পেয়েছে। এছাড়া অন্যান্য সব স্কুল স্লিপ, রুটিন মেইনটেন্যান্স, ওয়াসব্লক ও প্রাক-প্রাথমিকের টাকা পেয়ে যথাযথ নিয়মে কাজ করেছে।

তিনি ও উপজেলা প্রকৌশলীসহ তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্কুলগুলো পরিদর্শন করেছেন। কোনো স্কুলের কাজ বা অনিয়ম নিয়ে কোনো অভিযোগ পাননি। কাজ চলাকালীন সময়ে প্রতিবেদনের জন্য এলে ভালো বুঝতেন। এখন তো কয়েক মাস অতিবাহিত হয়ে গেছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হোসনে ইয়াসমিন করিমী জাগো নিউজকে বলেন, উন্নয়নমূলক শিক্ষা বাজেটগুলো বর্তমানে সরাসরি উপজেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে স্কুলগুলো পায়। তবে গত অর্থ বছরের বরাদ্দকৃত টাকা নিয়ে কোনো অনিয়মের তথ্য বা অভিযোগ পাননি।

রুবেলুর রহমান/এমএএস/জেআইএম