মতামত

মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধ

ডা. মো. রশিদুল হক

প্রতিটি মানুষের যেমন শারীরিক কাঠামো আছে তেমনি তার আছে একটা ‘মন’, যা আমরা দেখতে পাই না কিন্তু এর উপস্থিতি আমরা সবাই উপলব্ধি করি। তাই আমরা আনন্দে হাসি, রাগ আসলে রাগী, ঘৃণা করি, ভালোবাসি, কষ্ট লাগলে কাঁদি। এসবই আমাদের মনের অস্থিত্বকে জানান দেয়। এই মনের সুস্থতাই মানসিক স্বাস্থ্য।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ‘মানসিক স্বাস্থ্য বলতে এমন এক অবস্থাকে বোঝায় যেখানে প্রতিটি মানুষ তার কর্মদক্ষতাকে বুঝতে পারবে, প্রাত্যহিক জীবনের চাপ সামলাতে পারবে, লাভজনক ও সফলভাবে কাজ করতে পারবে এবং সমাজে সে কার্যকর অবদান রাখতে পারবে।’ মানসিক স্বাস্থ্য আমাদের ‘স্বাস্থ্যের’ একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র ‘স্বাস্থ্য’ সংজ্ঞার মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে । ‘স্বাস্থ্য’ বলতে সামগ্রিক শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং ‘আধ্যাত্মিক’ সুস্বাস্থ্য অবস্থাকে বোঝায় এবং শুধু রোগের অনুপস্থিতি বা অক্ষমতাকে বোঝায়নি। তাই শুধু মানসিক রোগ বা মানসিক প্রতিবন্ধিতা না থাকলেই তাকে ভালো মানসিক স্বাস্থ্যের অধিকারী বলা যায় না। সামাজিক, মনোঃস্তাত্ত্বিক এবং জৈবিক নানা প্রভাবেই একজন মানুষের কোনো এক নির্দিষ্ট সময়ে তার মানসিক স্বাস্থ্য নির্ধারিত হয়।

পারিবারিক সহিংসতা, সর্বদা সামাজিক-অর্থনৈতিক চাপ, দ্রুত সামাজিক পরিবর্তন, কর্মক্ষেত্রে চাপ, লিঙ্গবৈষম্য, সামাজিকভাবে একঘরে করা, অস্বাস্থ্যকর জীবনধারা, শারীরিক অসুস্থতা এবং মানুষের অধিকারবঞ্চিত করা রুগণ মানসিক স্বাস্থ্যের কারণ।২০১৩ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ‘সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্য কর্মপন্থা ২০১৩-২০২০’ অনুমোদিত হয়েছে। ডাব্লিউ এইচও (WHO) সদস্য দেশগুলো মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে এবং বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। এই ‘সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্য কর্মপন্থায়’ লক্ষ্যগুলো হলো- ১. মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, ২. মানসিক রোগ প্রতিরোধ, ৩. মানসিক রোগীর সেবা প্রদান, ৪. রোগমুক্তি বাড়ানো, ৫. মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা, ৬. মানসিক রোগীর অসুস্থতা, প্রতিবন্ধিতা এবং মৃত্যুহ্রাস করা। এই কর্মপন্থা নিম্নলিখিত ৪টি উদ্দেশ্যকে কেন্দ্রকরে সম্পূর্ণ হবে- ক. মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে কার্যকর নেতৃত্ব ও কার্যপ্রণালি জোরদারকরণখ. প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কমিউনিটি বেজড সামগ্রিক, সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সেবা প্রদান গ. মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন ও প্রতিরোধে কৌশলপত্র বাস্তবায়নঘ. মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদান এবং প্রামাণিক তথ্য এবং গবেষণা জোরদারকরণ।

মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো আমরা গ্রহণ করতে পারি

১. শিশুদের শৈশবে করণীয়ঃ ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ প্রদান, যা বাচ্চাদের স্বাস্থ্য সংবেদনশীল এবং পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করবে, যেকোনো ধরনের হুমকি মোকাবিলা করা, শিশু শিক্ষা নিশ্চিত করা, শিশুর বিকাশকে সহায়তা করা এবং আবেগগতভাবে সংবেদনশীল করা।২. শিশু-কিশোরদের সহোযোগিতাঃ জীবনভিত্তিক দক্ষতা অর্জনমূলক কার্যক্রম, শিশু ও কিশোর বিকাশ সম্পর্কিত কর্মপরিকল্পনা। ৩. নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নঃ শিক্ষার সুযোগ প্রদান, ক্ষুদ্রঋণ আওতায় আনার সুযোগ প্রদান। ৪. বিদ্যালয়কেন্দ্রিক মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নঃ মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশে বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পরিচর্যা করা।৫. কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যঃ মানসিক চাপ ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম। ৬. বয়োঃবৃদ্ধদের মানসিক স্বাস্থ্যঃ বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ এবং ডে কেয়ার সেন্টার ব্যবস্থা করা।৭. বাসস্থান নীতিমালাঃ বাসস্থানে পরিবেশ উন্নতীকরণ।৮. দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর দরিদ্রতা হ্রাস এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান।৯. সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড।১০. সহিংসতা প্রতিরোধ কার্যক্রমঃ মদ-নেশাজাতীয় বস্তুর সহজপ্রাপ্যতা বন্ধ করা এবং অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ। ১১. পারস্পরিক সামাজিক গ্রামের উন্নয়ন।১২. মানসিক রোগীর অধিকার, সুযোগ-সুবিধা এবং সেবাগ্রহণ উন্নতীকরণ।

আত্মহত্যা কি?

নিজ ইচ্ছায় নিজের জীবন শেষ করাকে আত্মহত্যা বলে। প্রতি বছর প্রায় ৮০,০০০০ মানুষ আত্মহত্যায় মারা যায়, যা প্রতি ৮০ সেকেন্ডে একজন আত্মহত্যার সমান। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিটি আত্মহত্যার পাশাপাশি ২০ জনের বেশি আত্মহত্যায় চেষ্টা করে। আত্মহত্যা সারাজীবনের যেকোনো সময় যে কারো হতে পারে। ১৫-২৯ বছর বয়সী যুবকদের মৃত্যুর দ্বিতীয় অন্যতম কারণ হলো আত্মহত্যা। বৈশ্বিক আত্মহত্যার ৭৯% হয়ে থাকে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত দেশগুলোতে।

আত্মহত্যার পদ্ধতিসমূহ

 গলায় ফাঁসি দেওয়া, কিটনাশক বা ঘুমের ওষুধ খাওয়া, বিষ খাওয়া, আগ্নেয়াস্ত্রের মাধ্যমে নিজেকে শেষ করা আত্মহত্যার প্রধান পদ্ধতি। এছাড়া উঁচু স্থান থেকে লাফ দেওয়া, গাড়ির সামনে লাফ দেওয়া, নদী বা সমুদ্রে লাফ দেওয়া, চাকু বা ধারালো অস্ত্রের মাধ্যমে গলা কাটা, পেটে স্টেপ করা, নিজেকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া আত্মহত্যার পদ্ধতি, যা আমরা সমাজে দেখতে পাই।

আত্মহত্যার করণসমূহ

বিষণ্নতা আত্মহত্যার প্রধান কারণ। মাদকাসক্তি (গাঁজা, ইয়াবা, মদ), ব্যক্তিত্বের সমস্যা, সিজোফ্রেনিয়া, মুড-ডিসঅর্ডারের রোগী আত্মহত্যার করে। কোনো কোনো সময় জীবনের বিভিন্ন চাপে যা ব্যক্তির সামলাতে না পেরে হঠাৎ করে ইম্পালসিভ্লি আত্মহত্যা করে। আর্থিক সমস্যা, সম্পর্কের ব্যর্থতা, দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা বা অসুখ, সহিংসতা, মহামারী, যৌন-সহিংসতা, কোনো কিছু হারানো, একাকিত্ব আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়।

কাদের আত্মহত্যা বেশি হয়

নারীদের আত্মহত্যার প্রবণতা পুরুষের চেয়ে তিনগুণ বেশি কিন্তু প্রকৃত আত্মহত্যা নারীদের চেয়ে পুরুষেরা তিনগুণ বেশি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, অবিবাহিতদের আত্মহত্যার হার বিবাহিতদের চেয়ে বেশি। একাকী বসবাসরত পুরুষ বা নারী, বিধবা, বিপত্নীক, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, অভিবাসী, মহামারী, আন্তঃকোন্দল বা অন্তঃকোন্দলে আক্রান্ত জনগোষ্ঠী, সমকামী, ট্রান্সজেন্ডার, ইন্টারসেক্স জনগোষ্ঠী আত্মহত্যা বেশি করে।

পূর্বে যার আত্মহত্যার ইতিহাস আছে তার আত্মহত্যার সম্ভাবনা বেশি। পরিবারে আত্মহত্যার ইতিহাস থাকলে বা বার বার আত্মহত্যার হুমকি দিলে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যারা আত্মহত্যার পূর্বে সুইসাইড নোট রাখে (আমার আত্মহত্যার জন্য কেউ দায়ী নয়), পূর্বপ্রস্তুতিপূর্বক আত্মহত্যার চেষ্টা যেন কেউ উদ্ধার করতে না পারে, ভায়োলেন্ট (ভয়ংকর) পদ্ধতিতে আত্মহত্যার চেষ্টা, অন্যের কাছে আত্মহত্যার ইচ্ছার কথা বলা আত্মহত্যার প্রবল ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ।

আত্মহত্যা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ

আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য। আত্মহত্যা একটি জটিল প্রক্রিয়া, যা প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয় ও সহযোগিতা প্রয়োজন। শুধু স্বাস্থ্য বিভাগ নয়, পাশাপাশি শিক্ষা, শ্রম, কৃষি, বাণিজ্য, আইন, প্রতিরক্ষা, ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া সর্বোপরি আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।

কারও একার প্রচেষ্টায় আত্মহত্যা রোধ করা অসম্ভব। কার্যকর আত্মহত্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে, মানসিক রোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধ, স্মৃতিভ্রংশতা রোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধ এবং মাদকাশক্তির চিকিৎসা আত্মহত্যা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ।রাষ্ট্রীয়, সামাজিকভাবে প্রতিটি স্তরে ব্যক্তি প্রর্যায়ে আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টা প্রতিরোধ করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘মানসিক স্বাস্থ্য কর্মপন্থা ২০১৩-২০২০’ এ সদস্য দেশগুলো ২০২০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ।সাসটেইনেবল উন্নয়ন লক্ষ্য ২০১৩ অনুযায়ী আত্মহত্যাজনিত মৃত্যু ৩.৪ নামিয়ে আনতে হবে।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে

১. আত্মহত্যার উপকরণ যেমন- কীটনাশক, বিষ, আগ্নেয়াস্ত্র, ঘুমের ওষুধের সহজপ্রাপ্যতা হ্রাস করতে হবে।২. ইলেক্ট্রিক, প্রিন্ট মিডিয়াকে আত্মহত্যার খবর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সচেতনতার সাথে প্রচার করতে হবে, যাতে অন্যরা এতে উৎসাহিত না হয়।৩. বিদ্যালয়কেন্দ্রিক আত্মহত্যা সচেতনতা বা প্রতিরোধমূলক প্রোগ্রাম করা।৪. মাদকদ্রব্য যেমন- মদ, গাঁজা, ইয়াবা ফেনসিডিল ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়ন।৫. মানসিক রোগে আক্রান্ত বা নেশাগ্রস্ত রোগীর রোগ দ্রুত নির্ণয় এবং চিকিৎসা প্রদান।৬. তীব্র আবেগ প্রদর্শন বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা সঠিক নির্ণয় ও সুচিকিৎসা করা।৭. আত্মহত্যামূলক আচরণের সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা।৮. আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছে এমন রোগীর যথাযথ ফলোআপ এবং সামাজিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করা।৯. সময়মতো আত্মহত্যার রেজিস্ট্রেশন এবং রেগুলার মনিট্রিং-ই জাতীয় পর্যায়ে আত্মহত্যা প্রতিরোধের কার্যকর কর্মপন্থা। শেষাংশে আত্মহত্যা একটি আচরণ, যার পরিণতি জীবনের পরিসমাপ্তি। একটু সতর্ক হলে, একটু সহানুভূতিশীল আচরণ একজনের জীবন বাঁচাতে পারে। আমাদের সবাইকে জানতে হবে আত্মহত্যা কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়, এটা কোনো জিন-ভূতের আছরে হয় না। আত্মহত্যা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ, যা প্রতিরোধযোগ্য। আসুন আমরা সবাই মিলে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করি এবং জীবনকে হ্যাঁ বলি।

লেখক: এফসিপিএস (সাইক্রিয়াট্রি) সহকারী অধ্যাপক, মানসিক রোগ বিভাগ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল, ঢাকা।rana.dmc@gmail.com

এইচআর/জেআইএম