নীলফামারীর ডিমলায় তিস্তা অববাহিকায় দুর্গম চরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে চেনেন না শিক্ষার্থীরা। সহকারী শিক্ষক সরকার দলীয় কর্মী হওয়ায় তিন বছরে একদিন গিয়ে যোগদান করে এসেছেন তারপর আর বিদ্যালয়ে যাননি। প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগও দুর্গম চরাঞ্চলের ধোয়া তুলে উক্ত বিদ্যালয়ে পরিদর্শন করেননি। বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়মিত উপস্থিত না হলেও মাসে একদিন এসে ব্যাংকে টাকা উত্তোলন করেছেন ওই শিক্ষক। চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে উপজেলার টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের চরখড়িবাড়ী মধ্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়টিতে দুইজন শিক্ষক থাকলেও প্রধান শিক্ষক মাসে একদিন আর সহকারী শিক্ষক ৩ বছরে একদিন গিয়েছিলেন বিদ্যালয়ে যোগদান করার জন্য। সহকারী শিক্ষক প্রশান্ত কুমার রায় ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের সরকার দলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকার কারণে বিদ্যালয়ে যান না। ছাত্রলীগের এই নেতার কারণে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসও বিদ্যালয়টি পারদর্শন করতে পারছে না। ন্যাশনাল সার্ভিজের তিনজন শিক্ষকের উপর বিদ্যালয়টি পরিচালনা হলেও গত আগস্ট মাসে কার্যক্রম শেষ হওয়ায় বিদ্যালয়টি প্রতিনিয়ত বন্ধ রয়েছে। একদিকে বন্যার ভাঙন প্রকট অপরদিকে শিক্ষক সঙ্কটে শিক্ষার্থীদের নাভিশ্বাস উঠেছে।দশ হাজার জনবসতির শিক্ষা বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করার লক্ষে ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত করা হয়। বিল্ডিং ভবন নির্মান করা হয় ২০১২ সালে। বর্তমানে বিদ্যালয়টির মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৪৩ জন। আর এই শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেয়ার জন্য দুই জন শিক্ষক কাগজে কলমে থাকলেও তাও আবার অনুপস্থিত। বন্যার প্রবল ভাঙনে বিদ্যালয়টি পানিতে তলিয়ে গিয়ে বন্যার প্রবল স্রোতধারা নিয়মিত প্রবাহিত হচ্ছে বিদ্যালয়ের মূল পাটাতনের নিচ দিয়ে। এজন্য দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। ভাঙনের কারণে বিদ্যালয় ভবনটি বর্তমানে দাঁড়িয়ে রয়েছে শূন্যের উপর। যেকোনো মুহূর্তে ভবনটি দেবে গিয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটিতেই চালানো হচ্ছে প্রথম হতে ৩য় শ্রেণির ৩৮০ জন কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম। বাকি ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণির ৬৩ জন শিক্ষার্থীদের পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বন্যার সঙ্গে যুদ্ধ করা তিস্তা অববাহিকার খেটে খাওয়া মানুষগুলো ওই বিদ্যালয়টির দিকে তাকিয়ে ভাবেন তাদের সন্তানদের শিক্ষিত করার স্বপ্নের কথা। তাদের সেই স্বপ্ন সর্বগ্রাসী তিস্তা ও বিদ্যালয়ের বেহাল শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দিচ্ছে খানখান করে। বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, বন্যার পানির কারণে চরম হুমকির মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিদ্যালয়টিতে গিয়ে কোনো শিক্ষককে পাওয়া যায়নি। শিক্ষার্থী মনিরা আক্তার, সালামা আক্তার, আব্দুস সোবাহানসহ অনেকে জানায় সহকারী শিক্ষক প্রশান্ত কুমার রায়কে তারা চিনেন না। প্রশান্ত নামে স্যার থাকলেও কোনোদিন স্যারকে তারা দেখেননি। তারা অভিযোগ করেন হেড স্যার (প্রধান শিক্ষক) মাসে ১/২ দিন আসেন দুপুরে। প্রধান শিক্ষক শাহাদৎ হোসেন পার্শ্ববর্তী গয়াবাড়ি ইউনিয়ন থেকে বিদ্যালয়ে মাসে ২/১ দিন উপস্থিত থাকলেও বিদ্যালয়ে আসেন নিজের সংসার আর ব্যবসা বাণিজ্য সামলিয়ে নিজ সময় অনুযায়ী। অপর সহকারী শিক্ষক ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ছাত্রলীগের নেতা প্রশান্ত কুমার রায় সরকার দলীয় কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত রয়েছেন ৩ বছর ধরে। আর বাড়িতে বসেই বেতন ভাতা উত্তোলন করছেন নিয়মিত। এ ব্যাপারে প্রধান শিক্ষক শাহাদৎ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, বিদ্যালয়টিতে যাতায়াতের ব্যবস্থা নাজুক হওয়ায় সঠিক সময়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে সমস্যা হয়। তাছাড়া মাসের ৮/৯দিন বিভিন্ন কাজে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যেতে হয়। তাই নির্ধারিত সময় মতো বিদ্যালয়ে পৌঁছতে পারি না। সহকারী শিক্ষক মাঝে মধ্যে আসেন মর্মে তিনি স্বীকার করেন। তিনি আরও বলেন গত ২ বছরে ন্যাশনাল সার্ভিসের তিনজন কর্মী বিদ্যালয়ে চাকরি করায় বিদ্যালয়টি ভালো চলছিল। কিন্ত গত আগস্ট মাসে তাদের চাকরির সময়সীমা শেষ হওয়ায় বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস করতে পারছি না। সহকারী শিক্ষক প্রশান্ত কুমার রায় জাগো নিউজকে বলেন, শুরু থেকেই বিদ্যালয়গুলো এভাবেই চলে আসছে। তাই আমিও এভাবেই চলছি। এখন রাজনৈতিক কাজে ব্যস্ত আছি বিকেলে ফ্রি হয়ে রিং দেয়ার কথা বলেন মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে দেন। বিদ্যালয়ের দায়িত্বে থাকা উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কাজল চন্দ্র রায় জাগো নিউজকে বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষক অনুপস্থিতির বিষয়টি আমার জানা নেই। তিনি ওই বিদ্যালয়টি পরিদর্শনের দায়িত্বে থাকলেও দুর্গম চরের বিদ্যালয়টি যেতে পারেননি। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষক অনুপস্থিতির বিষয়টি আমার জানা নেই, বিষয়টি তদারকির জন্য সহকারী একজন শিক্ষা কর্মকর্তা রয়েছেন। বিষয়টি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সহিদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, কোনো শিক্ষক চাকরি ফাঁকি দিয়ে রাজনৈতিক কাজে ব্যস্ত থাকবে বিষয়টি মেনে নেয়া হবে না। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দিলীপ কুমার বনিক জাগো নিউজকে জানান, বিষয়টি আমার জানা নাই। তবে দ্রুত তদন্ত করতে প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে বলবেন।জাহেদুল ইসলাম/এমজেড/এমএস