মাঠ পুলিশের একজন কর্মকর্তা এসআই ইউনুস (৫১)। চৈত্রের প্রচণ্ড রোদে রাস্তায় নেই তেমন কোনো গাড়ি ও পথচারী। তখনও এক পায়ে দাঁড়িয়ে বরগুনা শহরের টাউন হল সড়কের চৌরাস্তায় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন তিনি।
এমন সময় বরিশালের মুলাদি উপজেলার পূর্ব হোসনাবাদ গ্রামের বাড়ি থেকে ছোট ছেলের ভিডিও কল। ছোট ছেলে ইয়ামিন হাসান জানালো তার দাদি কথা বলতে চায়। তিন মাস হতে চললো প্রিয় বৃদ্ধা মায়ের সাথে তার দেখা নেই। দেখা নেই আদরের দুই ছেলে আর এক মেয়ের সাথেও। দেখা নেই সহধর্মিণী নাজমা বেগমের সাথেও।
ভিডিও কল দেখে এক সহকর্মীকে দায়িত্বে রেখে একটু ছায়ায় এসে বসেন এসআই ইউনুস। মায়ের চেহারাটা দেখে চোখ ছলছল তার। প্রায় তিনমাস হলো মায়ের কাছে যাওয়া হয়নি তার। মোবাইলের অপর প্রান্ত থেকে বলে চলেন মা- ‘বাবা ইউনুস, শরীরের যত্ন নিও বাবা। কি আর করবা চাকরি যখন পুলিশের তখন কষ্টতো একটু করতেই হবে। দায়িত্বে অবহেলা করবানা কখনও। খাওয়া দাওয়া ঠিক সময়মতো করবা।
এরপর একে একে ছোট ছেলে, মেয়ে আর স্ত্রীর সাথে কথা বলে ফোন রেখে আবার ডিউটিতে গিয়ে দাঁড়ান এসআই ইউনুস। ফাঁকে ফাঁকে তার সাথে কথা বলে জানা গেল, প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দুইটা পর্যন্ত এখানে ডিউটি করতে হয় তাকে। প্রচণ্ড রোদে যেখানে ১০ মিনিট দাঁড়ানো যায় না সেখানে সকাল ছয়টা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত কিভাবে এখানে দাঁড়িয়ে ডিউটি করেন তিনিসহ তার সহকর্মীরা?
এসআই ইউনুস বলেন, কষ্ট যে হয় না তা নয়। এতো মোটা পোশাকের ভেতর প্রচণ্ড ঘাম হয়। এতে শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি বেরিয়ে যায়। বিশেষ করে রোজা থাকায় সমস্যাটা হয় অনেক বেশি। তাছাড়া তারা যেহেতু মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন এবং সব ধরনের মানুষের সাথেই তাদের মিশতে হয় তাই তাদের করোনা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও বেশি।
এসময় এসআই ইউনুস আনন্দের সাথে জানান, মাঠ পুলিশের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ হেডকোয়াটার্স। তিনি পুলিশ বাহিনীর প্রধানসহ সকল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন এ মুহূর্তে উদ্যোগটি ভিষণ জরুরি ছিল।
বরগুনা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. শাহজাহান বলেন, করোনা মহামারিতে দেশের সর্বস্তরের সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে জনগণের মাঝে বিভিন্ন ধরনের সহায়তামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে অনেক পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। তাই মাঠে থাকা পুলিশ সদস্যদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষে পুলিশ হেডকোয়াটার্স থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আর এতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা।
তাই পুলিশের ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পুলিশ হেডকোয়াটার্স থেকে পাঠানো সিভিট ও জিংক ট্যাবলেট প্রদানের পাশাপাশি এ বিষয়ে করণীয় প্রসঙ্গে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বরগুনার প্রত্যেক ইউনিটে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসাইন বলেন, এই ক্রান্তিকালে পুলিশ সদস্যদের মনোবল বৃদ্ধির লক্ষে এটি একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তিনি আইজিপি ও ডিআইজিসহ পুলিশের সকল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জেলা পুলিশ বরগুনার পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।
সাইফুল ইসলাম মিরাজ/এমএএস/এমকেএইচ