দেশজুড়ে

এক বছর আগের বন্যা গাইবান্ধার মানুষকে আজও কাঁদায়

২০১৯ সালের জুলাইয়ের ভয়াবহ বন্যার চিহ্ন গাইবান্ধার মানুষকে আজও কাঁদায়। সাঘাটা উপজেলার ৪টি ও ফুলছড়ি উপজেলার একটি ব্রিজ বন্যায় লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় ১ বছরেও সংস্কার করা হয়নি। ভেঙে যাওয়া সড়কগুলো ঠিক না করায় চলতি মাসে টানা বৃষ্টিতে বেড়ে গেছে জেলাবাসীর দুর্ভোগ।

এলাকাবাসী স্বেচ্ছাশ্রমে ভাঙ্গা সেতুগুলোর স্থানে বাঁশ কিংবা কাঠের সাঁকো তৈরি করে কোনোমতে যাতায়াত করছে। কিন্তু ওই সাঁকোতে ভরসা নেই তাদের। প্রতিদিন হাজারও মানুষের যাতায়াতের ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে সাঁকোগুলো। দুই উপজেলার প্রায় আড়াই লাখ মানুষ ভোগান্তির স্বীকার হচ্ছেন।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানালেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্রিজ কালভার্টগুলোর তালিকা মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায়। সরেজমিনে দেখা যায়, গত বছরের জুলাই মাসের প্রথম দিকে ভয়াবহ বন্যায় গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া-রামনগর-গোন্দিগঞ্জ সড়কটির ওপর নির্মিত তিনটি সেতু বন্যায় বিধ্বস্ত হয়ে ভেঙে যায়। ফলে এই তিনটি স্থানে কাঠ বা বাঁশের সাঁকো দেয়া হলেও সাঁকোগুলো দুর্বল। ফলে হেঁটেচলা ছাড়া কোনো যানবাহন চলাচল করে না।

সাঘাটা উপজেলার বাটি গ্রাম, পশ্চিম রাঘরপুর, রামনগর, দলদলিয়া, ময়মন্তপুর, মানিকগঞ্জ, বুরুঙ্গী, কানিপাড়া ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার রাখালবুরুজ, তেতুলতলি, সোনাইডাঙ্গাসহ ২০টি গ্রামের কাঁচা-পাকা সড়ক ২০১৯ সালের ভয়াবহ বন্যায় ভেঙে গেছে। এসব সড়কের কাঁচা রাস্তাগুলোর কিছু অংশ স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা কাবিটা-কাবিখার প্রকল্প দিয়ে মেরামত করলেও এখনো সংস্কার করা হয়নি পাকা সড়ক ও ব্রিজগুলো।

সাঘাটা উপজেলার গুরত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়কে কাঠের ব্রিজ গত এক বছরের একমাত্র ভরসা। এই ব্রিজের উপর দিয়ে কোনোমতে চলাচল করা গেলেও ভারী যানবাহন চলে না। বন্যায় ভেঙে যাওয়া ব্রিজগুলো বন্যা-পরবর্তী সময়ে মেরামতের আশ্বাস দেয়া হলেও প্রায় এক বছরেও সংস্কার করা হয়নি। ফলে দুর্ভোগের শেষ নেই এ অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষের। সাঘাটা উপজেলার কচুয়া ইউনিয়রের সাবেক ইউপি সদস্য ফরমান আলী জানান, বন্যা পরবর্তীতে ব্রিজ গুলো সংস্কার করা হয়নি। পাশাপাশি সড়ক পারাপারে রয়েছে বাঁশের সাঁকো। সাঁকোগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে পরাপার হয়। যেকোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনার ঘটাতে পারে।

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার রাখালবুরুজ ইউনিয়নের সবজি বিক্রেতা মশিউর রহমান জানান, জীবিকার তাগিদে মালামাল আনতে বোনারপাড়া শহরে যেতে হয়। কিন্তু যাতায়াত ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার পথ ঘুরে মালামাল গ্রামে আনতে হয়। এতে খরচ বেড়ে যায়। চরম দুর্ভোগে প্রায় ১ বছরেও মিলছে না প্রতিকার।

বোনারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়ারেছ প্রধান জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কাঁচা রাস্তাগুলো সাঘাটা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার মাধ্যমে কাবিটা-কাবিখা প্রকল্পের মাধ্যমে সংস্কার করা হয়েছে। ব্রিজগুলো সংস্কারের জন্য এলজিইউডি বিভাগ এগিয়ে আসলেই এই ইউনিয়নের মানুষের কষ্ট লাঘব হবে।

অপরদিকে, গত বছর ২০১৯ সালের জুলাই মাসে বন্যার পানির স্রোতে ফুলছড়ি উপজেলার কেতকিরহাট বাজারে ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যায়। এর ফলে গাইবান্ধা-কঞ্চিপাড়া-কেতকিরহাট পাকা সড়কের কেতকিরহাট বাজারে প্রায় ৫০ ফুট অংশ ভেঙে যায়। পরে ওই সড়কে প্রায় ৫০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৬ ফুট প্রস্থের একটি কাঠের সাঁকো তৈরি করে স্থানীয়রা।

এরপর থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, রিকশা-ভ্যান, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করতে থাকে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আর কোনো মেরামত না করায় সাঁকোটি এখন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এই সাঁকোর ওপর দিয়ে ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া, ফজলুপুর ও উড়িয়া ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ জেলা ও উপজেলা শহরে যাতায়াত করে থাকেন। ফুলছড়ি উপজেলার উত্তর উড়িয়া গ্রামের কৃষক আহম্মেদ হোসেন বলেন, জমিতে উৎপাদিত ধান, গম ও ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল ও সবজি বাজারে বিক্রি করতে হয়। কিন্তু সাঁকোটি বিধ্বস্ত হওয়ায় ৬ কিলোমিটার পথ ঘুরে গাইবান্ধা জেলা শহরে যাতায়াত করতে হচ্ছে। পরিবহন খরচ বেশি হচ্ছে। অথচ কাঠের সাঁকোটির স্থলে মাটি দিয়ে ভরাট করা হলে এই সমস্যার সৃষ্টি হত না।

একই গ্রামের কলেজছাত্র সেলিম মিয়া বলেন, সাঁকোটি মেরামত করা না গেলে চরম বিপাকে পড়তে হবে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ, নারী ও অসুস্থ রোগীদের ভোগান্তির শেষ থাকবে না।

ফুলছড়ি উপজেলার এলজিইডির প্রকৌশলী ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, সাঁকোর স্থলে সেতু নির্মাণে এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে। অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু হবে। এ বিষয়ে গাইবান্ধা এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মো. ছবিউল ইসলাম জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্রিজ কালভার্টের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু করা হবে।

গাইবান্ধা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ২০১৯ সালের বন্যায় জেলার সাতটি উপজেলার ৫১টি ইউনিয়নের ৩৮৩টি গ্রামের ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৩৫০ জন মানুষ পানিবন্দি হয়। ৪৪ হাজার ৭৯২টি বসতবাড়ি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৮০টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৭৪ হাজার ১০৪ জন মানুষ আশ্রয় নেয়।

এছাড়াও বন্যায় ৫৭৫ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা এবং ২৩৫ কিলোমিটার পাকা রাস্তা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৬৩ কিলোমিটার বাঁধ, ২১টি কালভার্ট এবং ১০ হাজার ৮৩৩ হেক্টর আবাদি জমি বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়। ১৭৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ২৬৪টি মাদরাসা পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ২ হাজার ৯৪১টি পুকুরের মাছ বন্যার পানিতে ভেসে যায়।

জাহিদ খন্দকার/এমআরএম/এমকেএইচ