দেশজুড়ে

করোনা আর নদী ভাঙনে দিশেহারা কুড়িগ্রামের মানুষ

করোনার প্রভাব মোকাবেলার পাশাপাশি নদ-নদীর ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছে কুড়িগ্রামের মানুষ। ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের প্রভাবে ভারতের উজানের ঢল এবং কুড়িগ্রামে টানা বৃষ্টির কারণে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শুরু হয়েছে ভাঙন। গৃহহীন হয়ে পড়েছে শত শত মানুষ।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন- ভাঙন রোধে প্রকল্প করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জানা গেছে, কয়েকদিন আগে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের প্রভাবে জেলার বড় বড় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। এতে গৃহহীন হয়ে পড়েছে শত শত পরিবার। অনেকের পাকা ধান, গম, ভুট্টাসহ হাজার হাজার বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা বিলীন হয়ে গেছে নদী ভাঙনে। ভাঙনে ঘরবাড়ি, ফসলি জমিসহ শেষ সম্বল টুকু হারিয়ে অন্যের জায়গায় আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন অনেকে। মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয় টুকু হারিয়ে বিপাকে পড়েছেন পরিবার-পরিজন নিয়ে।

একদিকে করোনার প্রভাবে কাজ নেই অন্যদিকে নদী ভাঙনে সম্পদ হারিয়ে দিশেহারা মানুষজন। যেখানে পরিবারে খাদ্যের যোগান দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সেখানে আবার মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে হচ্ছে। এ যেন মরার ওপর খাড়ার ঘা। ভাঙন রোধে সরকারের হস্তক্ষেপ চান নদ-নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা।

উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের কলাতি পাড়ার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম(৫০), মজিবর হক (৭০), আজগর আলী(৬৫), সাইফুল (৩৫), ছামিনা বেগম (৫৫) ও রমিছা বেগম (৫০) বলেন, গেল একমাসে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে বাড়িঘরসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ, সুপারির বাগান বিলীন হয়ে গেছে। এর সঙ্গে পাকা ধান, ভুট্টা, গমসহ বিভিন্ন ফসলের জমি বিলীন হয়ে গেছে।

তারা বলেন, আমরা দিন এনে দিন খাই। এভাবে সংসার চলে আমাদের? গেল তিনমাসের বেশি সময় ধরে করোনার প্রভাবে তেমন কাজকর্ম নেই। এই অবস্থায় পেটের খাবার জোটাবো নাকি থাকার আশ্রয় খুঁজবো। এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে মহাদুশ্চিন্তায় দিন কাটছে। নদী ভাঙনে বা বন্যার সময় বাঁধে আশ্রয় নেয়া যেত। কিন্তু বাঁধের সংস্কার হওয়ায় সেখানেও এবার আশ্রয় জুটবে না। অনেকেই ৫-১০ বছরের জন্য অন্যের জমি শতক প্রতি দুই হাজার টাকায় ভাড়া নিয়ে থাকছে। কেউবা অন্যের দয়ায় কোনো রকমে আছে। দ্রুত ভাঙন রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান তারা। হাতিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হোসেন জানান, গত একমাসে ব্রহ্মপুত্র নদের দুই কিলোমিটার এলাকায় ভাঙনে প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবার ঘড়বাড়ি হারিয়েছে। প্রায় ৫০ একর ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে। নদী ভাঙন রোধ করা না হলে হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদসহ ইউনিয়নের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজারসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হবার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত ভাঙন রোধে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, জেলার চারটি বড় নদ-নদী বেষ্টিত ৭টি উপজেলার ২০টি পয়েন্টে ৫ হাজার ৮২০ মিটার ভাঙনের জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় ধরলা নদীর ভাঙনে মোগলবাসায় ৩০০ মিটার, কালুয়াতে ২৫০মিটার ও ভেরভেরিতে ৫০মিটার। ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে চিলমারী উপজেলায় কাঁচকলে ৮০০ মিটার, দক্ষিণ খাউরিয়ার চরে এক হাজার মিটার, রৌমারী উপজেলায় সাহেবর আলগা ৫০০ মিটার, যাদুরচর ও কর্তিমারীতে ৩০০ মিটার। তিস্তা নদীর ভাঙনে উলিপুর উপজেলায় গুনাইগাছে ৮৮মিটার, ঠুটাপাইকরে ৪০০ মিটার, কাশিম বাজারে ৩৫০ মিটার ও বজরাতে ৭০ মিটার।

দুধকুমার নদের ভাঙনে নাগেশ্বরী উপজেলায় নুনখাওয়ায় ৬০০ মিটার, বামনডাঙ্গার মুরিয়াতে ১৫০মিটার, খেলার ভিটায় ২০০ মিটার, নারায়ণপুরের ঝাউকুটি ৩৫০ মিটার এবং ভূরুঙ্গামারী উপজেলার ধাউরিয়ারকুটিতে ১৫০ মিটার এলাকা জুড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম বলেন, জেলার বৃহত্তম নদ-নদী ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, তিস্তা ও ধরলার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। আমরা ভাঙনের ২০টি পয়েন্ট চিহ্নিত করেছি। ইতোমধ্যে ভাঙন রোধে প্রকল্প করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে ভাঙন রোধে দ্রুত কাজ হবে।

তিনি আরও বলেন, সরকার নদ-নদী রক্ষা এবং সংস্কারের জন্য বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়ন হলে এই জেলার মানুষ নদী ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাবে।

নাজমুল হোসাইন/আরএআর/এমএস