বগুড়ার গাবতলী উপজেলার সুখানপুকুর ইউনিয়নের নতুনপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. আলম (২৮)। তার বাবা গত ৬ ফেব্রুয়ারি স্ট্রোক করে পরপাড়ে পাড়ি জমান। তার কিছুদিন পর ১৮ মার্চ সেই স্ট্রোকেই বড়ভাইও চিরবিদায় নেন। বড়ভাই রেখে গেছেন তিন শিশু। এরই মাঝে আঘাত হানে করোনা। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে তাদের ধান কাটার সময় হয়। এ রকম দুর্যোগময় মুহূর্তে পাশে এসে দাঁড়ায় সুখানপুকুরের সামাজিক সংগঠন প্রজন্ম। তারা আলমের ভাইয়ের অংশের ৪৩ শতাংশ এবং তাদের ২৭ শতাংশ জমির ধান কেটে দেয়। আলম বলেন, ‘ওই সময় ধান কেটে দেয়ায় আমাদের অনেক উপকার হইছে।’
করোনার এই সময়ে ধান কেটে দেয়ার পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি করা, দরিদ্রদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ, টেলিমেডিসিন সেবাও দিয়ে আসছে প্রজন্ম। এছাড়া সরকারি জমি দখল প্রতিরোধ, মাদকের আখড়া ভেঙে দেয়া, বিশেষ পরিস্থিতিতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর মেরামত, সুপেয় পানি নিশ্চিত করা, জুয়া, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, গুজব, বাল্যবিবাহসহ নানা অসঙ্গতির বিরুদ্ধে কাজ করে চলেছে তরুণদের নিয়ে গড়ে ওঠা সংগঠনটি। বর্তমানে প্রজন্ম কেবল সুখানপুকুর ইউনিয়নে কাজ করছে। ভবিষ্যতে তারা পরিধি বাড়িয়ে পুরো গাবতলী উপজেলায় কাজ করার স্বপ্ন দেখছেন।
প্রজন্মের কাছ থেকে টেলিমেডিসিন সেবা নিয়েছেন-এমন দুজনের সঙ্গে জাগো নিউজের কথা হয়েছে। তাদের একজন মো. শাকিল বলেন, ‘আমার আম্মু আনোয়ারা বেগমের অসুখ ১২ থেকে ১৫ দিন আগে হঠাৎ বেড়ে যায়। আম্মুর মেরুদণ্ডের সমস্যা। আম্মু প্রচণ্ড অসুস্থ যান, একেবারে নড়াচড়া করতে পারছিলেন না। করোনার কারণে আম্মুকে শহরে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইনি। এজন্য প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ করি। আম্মুর কিছু রিপোর্ট ছিল, সেগুলো প্রজন্মকে দেখাই। তাদের আম্মুর সব সমস্যা খুলে বলি। সব শোনার পর প্রজন্মের চিকিৎসক প্রেসস্ক্রিপশন (ব্যবস্থাপত্র) দেন। সেই প্রেসক্রিপশনের ওষুধ খেয়ে আম্মু এখন মোটামুটি সুস্থ।’
সুখানপুকুরের তেলিহাটা গ্রামের ফকিরপাড়ার দিলবার আলী খাঁ-ও টেলিমেডিসিন সেবা নিয়েছেন। তার নাতি মো. আকুল বলেন, ‘প্রায় পাঁচ বছর আগে দাদুর একবার স্ট্রোক হয়। ওই সময় ডাক্তাররা যে চিকিৎসাপত্র দেয়, তা ঠিকমতো খাননি। ইদানীং তিনি হারবাল জাতীয় ওষুধ খাচ্ছিলেন। কয়েকদিন আগে সমস্যা আরও বেশি হয়। এখন বলছেন বগুড়ায় যাবেন। কিন্তু করোনা মহামারির মধ্যে তো বগুড়ায় যাওয়া সমস্যা।'
তিনি বলেন, করোনার এই সময়ে সুখানপুকুড়ের প্রজন্ম বিনামূল্যে টেলিমেডিসন সেবা দেয়-এটা আমি জানতাম। দাদুর অসুখ সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে এখান থেকে চিকিৎসা নিয়েছি। দাদুর বয়স ৮৬ বছরের বেশি। ডাক্তার বললেন, এই বয়সে তো একেক দিন একেকরকম হবে। তবে দাদু এখন অনেক ভালো।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এবং প্রজন্মের সভাপতি সাহানুর শাকিল জাগো নিউজকে বলেন, ‘মাদক, জুয়া, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, গুজব, বাল্যবিবাহসহ সকল অসামাজিক কাজের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস চর্চা করে সোনার বাংলা বিনির্মাণে ভূমিকা রাখতেই প্রজন্মের সৃষ্টি। একদল সৃষ্টিশীল তরুণদের নিয়ে এগিয়ে চলেছে প্রজন্ম। সাম্প্রতিক করোনা ইস্যু প্রজন্মের দায়িত্বের পরিধি বাড়িয়ে দেয়। আর্ত-মানবতার সেবায় নিবেদিত হই আমরা। অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়েছে। যতদিন এই সংকট থাকবে, ততদিন প্রজন্ম মানুষের পাশে থাকবে, কাজ করে যাবে।’
গাবতলী উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম মুক্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘টেলিমেডিসিন সেবার বিষয়টা আমি জানি না। তবে তারা কাজ করছে, এটুকু জানি। তারা বিভিন্ন জায়গায় খাদ্য পৌঁছে দিচ্ছে, ধান কেটে দিচ্ছে। রাস্তাঘাটে ট্রাফিক ঠিক রাখা, সচেতনতা বাড়ানো-এসব কাজ করছে তারা। তারা ভালো কাজ করছে। তারা অনেকে ছাত্র, কারও কারও ছাত্রত্ব শেষ হয়ে গেছে।’
সুখানপুকুরে দুই বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করছে প্রজন্ম। তবে গত ১৭ মার্চ ৩১ সদস্যের প্রথম কমিটি দিয়েছে প্রজন্ম। কমিটির সবাই বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী। ২৬ মার্চ জীবাণুনাশক স্প্রে করার মধ্য দিয়ে করোনা থেকে সুরক্ষার কার্যক্রম শুরু করে তারা। এই অল্প সময়ে তারা যেমন মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন, তেমনি অনেকের শত্রুতেও পরিণত হয়েছেন।
আমিনুল ইসলাম মুক্তা বলেন, ‘প্রজন্ম ও তার সভাপতি শাকিল এলাকায় ব্যাপক কাজ করছে। এলাকা মাদকমুক্ত করার জন্য চেষ্টা করছে। সুখানপুকুরে মাদকের একটা আড্ডা ছিল। সেখানে তার আন্দোলনের কারণে প্রয়াত এমপি আব্দুল মান্নানের সহযোগিতায় ওখানকার মদের যে ঘাঁটি ছিল, সেগুলো সে বন্ধ করতে পারছে। রেলের জায়গা-জমি দখল করে মানুষ দোকানপাট করছিল, সেগুলো বাধা দিয়েছে। এসব কাজ করার কারণে কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের শত্রুও হয়ে গেছে তারা। তবে আমি এটুকু বলতে পারি, সে (প্রজন্মের সভাপতি) যে কাজগুলো করছে, সাধারণ মানুষের দোয়া পাবে।’
পিডি/এসআর/জেআইএম