মতামত

‘আত্মহত্যার’ পোস্টমোর্টেম

নাজমুল হুদা

বলিউডের উঠতি তারকা সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যার কয়েক সপ্তাহ পরও অনেক মাধ্যম শোকাবহ আলোচনা সমালোচনায় সরগরম! তারকাদের খ্যাতির টানাপোড়েন নিয়ে যখন আলোচনার ঝড় এর মধ্যে বাংলাদেশের পাবনা জেলার সাঁথিয়ার সুইট নামের এক উচ্চশিক্ষিত তরুণ কিংবা চাঁদপুরের মতলবের কলেজপড়ুয়া এক কিশোরী নীরবে স্বেচ্ছায় পৃথিবী ত্যাগ করেছেন।

রাজপুত অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিলেন। দিল্লিতে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ৭ম স্থান করেছিলেন। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছিলেন। সেসব ছেড়ে দিয়ে একদিন ভালোলাগার পেছনে ছুটলেন। হয়ে গেলেন অভিনেতা। বিজ্ঞাপনে, টিভিতে, সিনেমায় কাজ করে দ্রুতই মানুষের মনে জায়গা করে নিলেন। কিন্তু বলিউডে বা পৃথিবীতে তার আর জায়গা হলো না।

উচ্চশিক্ষিত বেকারদের প্রতিনিধি সুইট খুব মেধাবী ছিলেন কিনা তা খতিয়ে দেখা হয়নি। তবে তিনি ইংরেজিতে মাস্টার্স করে চাকরির বয়স শেষ না হওয়া পর্যন্ত টিকে ছিলেন। সর্বোচ্চ সার্টিফিকেট আর জিপিএ স্কোর নিয়ে ‘রান’ করাতো দূরের কথা অনেকে ক্রিজেই টিকে থাকতে পারলেন না! অসময়ে গলায় ফাঁস নিলেন সুইট! অবশ্য সুইটদের জন্য সবসময় অসময়! তাদের মতো উচ্চশিক্ষিত বেকারদের সমস্যা দেখার সময় কারও নেই। বড়জোর ‘রেস্ট ইন পিস (আরআইপি)’ লিখে সস্তা সমবেদনায় শামিল হতে হওয়া য়ায়। কিন্তু অকালে ঝরে যাওয়া এসব উঠতি বয়সী কিশোর-কিশোরী কিংবা উচ্চশিক্ষিত তরুণ কারোরই ‘আত্মহত্যার পোস্টমোর্টেম’ করা হয় না। মৃত্যুর সাথে সাথেই তাদের ভেতরের ক্ষোভ, অভিমান, কষ্ট মাটিচাপা পড়ে যায়।

কখনও কেউ ঘুনেধরা সিস্টেম, ভুলে ভরা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মাথা ঘামায় না। মাথা ঘামানো তো দূরের কথা উল্টো তাদের মাথায় অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে অভিভাবক, শিক্ষক সবাই। একটা ‘চাপ বলয়’ তৈরি করে কোমলমতি শিশু, কিশোরদের বৃত্তবন্দি করে ফেলছি আমরা। যেমন হালের করোনাকালে ঘরবন্দি শিশুদের অনলাইন শিক্ষা দেয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে সবাই। দু-তিন মাস যেতে না যেতেই পিছিয়ে গেল গেল বলে অনলাইন শিক্ষার নামে ওদের গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে মাইক্রোফোন আর হাতে অ্যান্ড্রয়েড। অথচ এ সময় রং পেন্সিল, ড্রইং বোর্ড, বিজ্ঞান খেলনা, গাছের চারা বা পাখির ছানা নিয়ে খেলার সুযোগ পেলে ওরা হয়তো আরও বিকশিত হয়ে উঠতে পারত! ভালো ফলাফলও হয়তো উপহার দিতে পারতো।

জীবনে নানামুখী পরীক্ষার চাপ, উচ্চ স্কোরের আকাঙ্ক্ষা, অসুস্থ প্রতিযোগিতা কিংবা এর বিপরীতে ভর্ৎসনা, বেকারত্ব তাদের ক্রমেই বিকারগ্রস্ত করে কতশত কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীকে যে অকালমৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় সে হিসাব আঁতকে ওঠার মতো! শুধু এ বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পরই এক ডজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার সহজ পথ বেছে নিয়েছে। গত তিন বছরে এসএসসি পরীক্ষার পর ১৫০ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। তিন হাজার ৭৫০ জনের কিছু বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যার চেষ্টা করে। এর মধ্যে ৪০০ জন আবার দ্বিতীয়বার চেষ্টা করেছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কৈশোর-তারুণ্যে আত্মহত্যা হচ্ছে বিশ্বে মৃত্যুর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ! ২০১৭ সালে যারা আত্মহত্যার শিকার তাদের ৬৮ শতাংশেরই বয়স ১৩ থেকে ১৮-এর মধ্যে। এরমধ্যে আবার মেয়েদের হার আরও বেশি, আশঙ্কাজনক। ২০১৭ সালে সারাদেশে যে ২১৩টি শিশু বা কিশোর বয়সী আত্মহত্যা করে, তাদের মধ্যে ৫৩ জন ছেলেশিশু এবং ১৬০ জন মেয়েশিশু।

শিক্ষার শিকলে বাধা পড়ে নানামুখী চাপে দিন দিন তরুণদের মাঝে বাড়ছে অধৈর্য, অস্থিরতা, সহিংসতা, আত্মহত্যার ঝোঁক, মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন মানসিক রোগ। যাদের মানসিক রোগ হয়, তাদের ৫০ শতাংশের ওই রোগের প্রথম লক্ষণ ১৪ বছরের মধ্যেই দেখা দেয়। সেই বয়সের কোনো ছেলে মেয়ের কথায় কান দেয়ার মতো সময় কারও থাকে না, প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়াতো দূরের কথা।

আমেরিকার নিউইয়র্কে ‘মেন্টাল হেলথ এডুকেশন ইন স্কুলস ল’ নামে একটি আইন পাস করা হয়েছে। এই আইনে নিউইয়র্কের কিন্ডারগার্টেন থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সব স্কুল-কলেজে ছাত্রছাত্রীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষাদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে স্কুল-কলেজ থেকেই ‘সোশ্যাল ইমোশনাল লার্নিং’ (এসইএল) শেখানো হয়। এতে থাকে আত্মসচেতন হওয়ার শিক্ষা; নিজেকে সামলানোর কৌশল; সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি; সম্পর্ক ও যোগাযোগ-দক্ষতা; দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা। আমাদের দেশেও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকে স্থান দিতে হবে।

শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য নানামুখী প্রচার ও প্রোগ্রাম রয়েছে। যেমন: হাত ধোয়া, দাঁত মাজা, ভালো পুষ্টি, ব্যায়াম। একই রকম প্রচার ও প্রোগ্রাম মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য থাকবে না কেন? এছাড়া বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও কর্মশালার মাধ্যমে শেখাতে হবে যেকোনো চাপ, দুর্যোগ, বিপর্যয়ের পর কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয় ও দুরূহ স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করা যায়। সবার সহযোগিতাপূর্ণ ব্যক্তিগত সম্পর্ক; সমস্যা সমাধানে ভালো দক্ষতা; প্রয়োজনীয় সহায়তা মাধ্যমে আসলেই আত্মোন্নয়ন ঘটাতে পারলে আশা করা যায় আত্মহত্যার প্রবণতা কমে আসবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক ও উপপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

এইচআর/বিএ/পিআর