মতামত

করোনা সনদে ভেজাল ও মজ্জার ময়লা

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম

অতি মহামারি কোভিড-১৯ এমনিতেই পৃথিবীতে আসেনি। মানুষ তার অনিয়ন্ত্রিত ও ভেজাল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথিকে পৃথিবীতে আগমনের সুযোগ করে দিয়েছে। এর বর্তমান বিস্তৃতির জন্য মানুষের অবহেলা ও অসচেতনতা দায়ী। মানুষ এর মরণকামড়ে চ্যাপ্টা হয়ে পড়লেও অনেকে একে নিয়ে দালালি করছে। কেউ কেউ হীন ব্যবসা ফেঁদে বসেছে।

করোনার প্রকোপ আসার শুরুতেই ইউরোপে মাস্কভর্তি বিমান গায়েব, আমাদের দেশে এন-৯৫ মাস্কের নকল সিল তৈরি করে ভেজাল ব্যবসা এবং এসব ভেজাল মাস্ক পরে পেশাদারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ব্যাপক হারে সম্মুখসারির যোদ্ধা চিকিৎসক ও নিরাপত্তাকর্মীদের আক্রান্ত হয়ে প্রাণহানি সবাইকে হতাশ করেছে।

করোনার কমিউনিটি সংক্রমণের সাথে মানুষ যখন চিকিৎসার নাগাল না পেয়ে নাজেহাল, যখন মানুষ জীবনের জন্য জীবিকাকে সমার্থক ভেবে বাড়ি থেকে বের হয়ে পড়েছে, তখন অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মচারীদের চাকরি বাঁচাতে নিরাপত্তার জন্য করোনা টেস্ট করে সার্টিফিকেট আনো- এটা লাগবে, ওটা লাগবে ইত্যাদি চেয়ে আরও বেশি ভোগান্তির মধ্যে ফেলে করে দিয়েছে।

এদিকে পর্যাপ্ত পিসিআর মেশিন না থাকায় করোনা উপসর্গসহ অসংখ্য রোগী টেস্ট করার জন্য দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়িয়ে অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। টেস্ট করা ও ফলাফল পেতে দীর্ঘসূত্রিতা তাদের চাকরি হারানোর সময় ঘনিয়ে আনছে। ইত্যাকার নানাবিধ নাজুক পরিস্থিতির শিকার হতাশ মানুষের এই কালো সময়কে পুঁজি করে একশ্রেণির দুষ্ট মানুষ দালালি ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে। এই অন্যায় কাজে তারা ভুয়া করোনা সনদ ও ভেজাল রিপোর্ট বিক্রি করে প্রতারণা করছে এবং অসহায় মানুষকে অপরাধ করতে উদ্বুদ্ধ করছে।

আর তা করবেই না বা কেন? ভেজাল কাজ করা আমাদের অস্থিমজ্জায় মিশে আছে। বার্ষিক বাজেটে এবারও কালো টাকা সাদা করার কথা বলা হয়েছে। টাকা নিজে কখনও কালো রঙ ধারণ করতে পারে না। মানুষ ভেজাল করে নিজেরাই চকচকে রঙিন টাকাকে কালো বলে। অর্থাৎ অবৈধভাবে ঘুষ-দুর্নীতি, কলোবাজারি, নকল টাকা ছাপানো, চুরি-ডাকাতি ইত্যাদি করে বৈধ আয়ের চেয়ে বেশি পরিমাণ টাকা- যার ওপর স্বাভাবিকভাবে সরকারি কর দিতে গেলে উৎসের ভেজালে ধরা পড়ে যাবে সেটাই কলো টাকা। রাষ্ট্র যখন কালো টাকাকে সাদা করার ঘোষণা দেয় তখন দুর্নীতিবাজদের দুনীতি করার ক্ষেত্র অবারিত থেকে যায়। মানুষের মন থেকে কালিমা দূর হওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে ভুয়া, ভেজাল, নকল ইত্যাদি নিয়ে একশ্রেণির চোর-বাটপার, ঘুষখোর তাদের অনৈতিক কারবার চালাতে তৎপর হয়ে ওঠে।

এভাবে মানুষের ভেজাল আয়, ভেজাল ভোগ, এর মাধ্যমে মানুষের রক্ত-মাংস, অস্থিমজ্জায় ভেজাল ঢুকে গিয়ে একাকার হয়ে পড়ে। এসকল মানুষ ভালো হতে চাইলেও পরিবেশ ও সমাজ তাদের ভালো ও সৎ জীবনযাপন করতে বাধা দেয়। সর্বোপরি তাদের মন-মানসিকতা তাদের নির্ভেজাল জীবনযাপনে নিবৃত্ত করে। এ ধরনের মানুষের মনে খারাপ কাজে কোনো রূপ ধিক্কার জন্মে না। এরা অভাব বা দারিদ্র্যের কারণে এই ভেজাল কাজ করে না। বরং এরা অনেক বড় মাফিয়া, গ্যাং ও বিত্তশালী দলের লেজুড় হয়ে বেতনভুক্ত হয়ে নির্দিষ্ট নিয়মে দায়িত্ব পালন করে এবং অনেক হোমড়া-চোমড়াদের নিয়মিত বখরা প্রদান করে ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখে। এদের হাত অনেক লম্বা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেও বেশিদিন বন্দী থাকে না। ফলে আমাদের সমাজ থেকে এরা নির্মূল হয় না।

এরা একবার ধরা পড়লে ফিরে এসে আরও বেশি অমানবিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। এরা প্রায়শই দলীয়ভাবে অনৈতিক কাজে অংশগ্রহণ করে ও একটি সুনির্দিষ্ট নেটওয়ার্ক অনুসরণ করে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এদের কাজের তালিকা তৈরি করে দেয়া হয়।

করোনাকালীন কালো সময়ে মানুষের কষ্টকে পুঁজি করে এসকল বাটপার ভুয়া সনদ ও ভেজাল রিপোর্টের হীন ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। পত্রিকায় প্রকাশ- মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় করোনা পজিটিভ বা নেগেটিভ সনদ বিক্রি করা হচ্ছে। সম্প্রতি মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বর থেকে র্যাব চারজন প্রতারককে গ্রেফতার করেছে। গত জুন ২৯ তাদের জেলে পাঠানো হয়েছে।

বাসা থেকে নমুনা নিয়ে করোনার ভুয়া রিপোর্ট প্রদান করা হচ্ছে বলে পত্রিকায় জানা গেছে। বাসা থেকে করোনার নমুনা নিয়ে ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে রোগীপ্রতি পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা আদায় করার সিন্ডিকেট প্রধান এক চিকিৎসক পলাতক। র্যাবের একজন কর্নেল সংবাদমাধ্যমকে বলেন, প্রতারকরা ১৫০ জনের নিকট ভুয়া করোনা সনদ বিক্রি করেছে। সম্প্রতি র্যাবের অভিযানে দেড় হাজার বোতল নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার উদ্ধার ও চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এসব নকল স্যানিটাইজারের বোতলে জীবাণুনাশক কোনো উপাদান নেই। প্রতারকরা এভাবে মানুষের মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করার ফাঁদ পেতেছে।

বিএমএ প্রদত্ত এক তথ্য থেকে জানা গেছে, আমাদের দেশে করোনা থেকে প্রতিরক্ষণ পাওয়ার কিট ভেজাল হওয়ার কারণে হাজার হাজার চিকিৎসাকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ পর্যন্ত নকল কিটের কারণে ১০১১ জন চিকিৎসক, ১৩১৩ জনস্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ, ১১৬০ জন নার্স করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। সারা পৃথিবীতে চিকিৎসকদের আক্রান্ত হওয়ার হার ২.৫% হলেও বাংলাদেশে এই হার ৪%। জুলাই ২ পর্যন্ত দেশে ৬২ জন চিকিৎসক মারা গেছেন।

অন্যদিকে নমুনা সংগ্রহ ছাড়াই করোনা পজিটিভ রোগী পাওয়া গেছে। যাচাই করে দেখা গেছে- এটা নামের বিভ্রাট বা টাইপিং এরর নয়। অর্থাৎ, এগুলো ভুয়া সনদ ও ভেজাল রিপোর্টের হীন বাটপাদের ব্যবসার ফসল। আমরা এই ভেজালের মধ্যে বসবাস করছি।

শুধু আমরাই নই- করোনা শুরু হওয়ার পর অনেক রাষ্ট্র নিজের ইমেজ ও ক্ষমতা হারানোর ভয়ে নানা ছল-চাতুরীর আশ্রয় নিয়েছে করোনায় মৃত্যু লুকানো রোগ শুরু হয়েছে চীনে। রাতের আঁধারে হাজার হাজার বেওয়ারিশ লাশ পুড়িয়ে ফেলেছে চীনা প্রশাসন। এখন এই প্রবণতা দেশে দেশে ছড়িছে পড়েছে।

বিবিসি বলেছে, করোনায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা তুলে ধরা হচ্ছে না। সাতাশটি দেশের তথ্যের ভিত্তিতে করা এক গবেষণা রিপোর্টের আলোকে বলা হয়েছে- সারাবিশ্বে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী পাঁচ লাখের অধিক লোক করোনায় মারা গেলেও আরও অন্তত এক লাখ ত্রিশ হাজার মানুষ করোনায় মারা গেছেন। হাসপাতালের বাইরে ঘটা করোনায় মৃত্যুগুলো গণনা করার বিষয় নিয়ে এসব দেশ মোটেও তৎপর নয়।

একদিকে করোনায় মৃত্যু লুকানো অন্যদিকে ভেজাল তথ্য করোনার কাছে মানুষের অসহায়ত্বকে খুব ন্যক্কারজনকভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। পৃথিবীর সভ্য মানুষগুলো নিজেদের সভ্য, সৎ বলে যতই দাবি করুক, নিজেদের নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ায় দিনরাত যতই সত্য বলে প্রচার করুক- করোনার আক্রমণে তাদের অন্তসারশূন্যতা বের হয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে, সেই দুর্বলতা ঢাকার জন্য সবাইকে নানা রঙের মুখোশের মাধ্যমে নাক-মুখ ঢেকে রাস্তায় চলাফেরা করতে হচ্ছে।

দেশের অন্যান্য সেক্টরের চেয়ে মেডিকেল সেক্টরের দুর্নীতির খবর অতি ভয়াবহ বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসক ও কর্মচারীদের খাবারের ভৌতিক বিশ কোটি টাকা বিল নিয়ে ২০২০-২০২১ সালের বাজেট আলোচনায় চলতি জাতীয় সংসদে বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে। এমন ভৌতিক খরচ নিয়ে অনেকে অবাক হয়েছেন। এই অবাস্তব খরচের রহস্য শিগগিরই খতিয়ে দেখা হবে।

এ জন্য আমাদের স্বাস্থ্যখাতে মৌলিক সংস্কার করা জরুরি। স্বাস্থ্যবিভাগের কেনাকাটায় চিহ্নিত টেন্ডারবাজদের সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে স্বচ্ছতা আনয়ন খুব জরুরি। সঠিক ও নির্ভুলভাবে রোগনির্ণয়ের জন্য ব্রান্ডহীন, পুরাতন ও ভেজাল মেশিনপত্র আমদানি নিষিদ্ধ করতে হবে। দেশের সকল নাগরিকের জন্য দেশের ভেতরই বাধ্যতামূলকভাবে চিকিৎসা নেয়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত। এ জন্য গণ-স্বাস্থ্যবীমা চালু করতে হবে। এর আওতায় সকল নাগরিক সরকারি ও বেসরকারি সব ধরনের হাসপাতালে একই পরিমাণ ফি দিয়ে চিকিৎসাসেবা পেতে পারবেন। তাহলে দায়ে পড়ে অসম চিকিৎসাব্যয় সর্বসাধারণের নাগালে চলে আসবে এবং দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা আধুনিক মানসম্মত সাজে গড়ে উঠতে পারে।

এতদিন যেসব ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা ও বিত্তশালী ভাবতেন, অসুস্থ হলেই তারা বিদেশে উড়াল দেবেন। বিশ্বব্যাপী ধনী-দরিদ্র প্রায় সব দেশেই করোনা আক্রমণের পর চিকিৎসাসেবার নাজুক অবস্থা দেখে তাদের ভ্রম ভেঙেছে। তাদের ভাবা উচিত এবং খুব দ্রুত দেশে বিশ্বমানের চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য বিনিয়োগ করা উচিত। তা না হলে করোনার সময়ের চেয়ে আরও খারাপ সময় আসলেও মানুষের কষ্টকে পুঁজি করে এই প্রতারক বাটপাররা ভুয়া চিকিৎসা সনদ ও ভেজাল রিপোর্টের হীন ব্যবসা ফেঁদে মৃত্যুকে আহ্বান করতেই থাকবে। হয়তো সেখান থেকে সহসা মুক্তি মিলবে না কারও।

দেশের বিত্তবানদের স্থানীয় চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর যে নেতিবাচক ধারণা ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে সেটা তিলে তিলে জমে থাকা আমাদের মিথ্যা অহমিকার অস্থিমজ্জার ময়লা। করোনার এই কঠিন সময়ে এসে সবাইকে সুদে-মুলে তার খেসারত দিতে হচ্ছে। এ জন্য আমাদের দেশে মানুষের অসুখ ও দেশীয় চিকিৎসাসেবার ওপর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তার ফলস্বরূপ একশ্রেণির দালাল ও লুটেরা গোষ্ঠী গজিয়ে উঠে ভুয়া ডাক্তার, ভুয়া ফার্মাসিস্ট, ভুয়া সেবক সেজে- ভেজাল ওষুধ, ভেজাল রিপোর্ট, ভেজাল সনদ প্রদানের অপতৎপরতা শুরু করে দিয়েছে।

এসব অপতৎপরতা আমাদের সুশাসনের দুর্বলতা প্রমাণ করে এবং সমাজের উঁচুশ্রেণির কিছু মানুষের অনৈতিক কাজের যোগসাজশের ফলকে তর্জনী উঁচিয়ে দেখিয়ে দেয়। এ জন্য সাধারণ নিরীহ মানুষ বারবার নাজেহাল হয়ে কষ্ট পায়। কিন্তু এত কিছু ঘটে যাওয়ার পরও দায়িত্বশীলদের ঘুম ও ভ্রম ভাঙে না। তাই সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক হয়ে আত্মশুদ্ধি অর্জন ছাড়া অতি দ্রুত বিকল্প কিছুর সমাধান আশা করা নিতান্তই অমূলক।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান। ই-মেইল: fakrul@ru.ac.bd

এইচআর/বিএ/পিআর