মতামত

‘বিএনপি’র রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নেই

৯ জুলাই(২০২০) তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘প্রকৃতপক্ষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজে এবং তার নেতৃত্বে দলের নেতৃবৃন্দসহ পুরো বিএনপিই এখন হোম আইসোলেশনে। হঠাৎ হঠাৎ টেলিভিশনে উঁকি দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা ছাড়া বিএনপির আর কোনো কাজ নেই।’ উপরন্তু তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘মির্জা ফখরুল সাহেবের বক্তব্যে মনে হয় সারা দুনিয়ায় সবদেশের ক্ষেত্রেই করোনা মোকাবিলা এমন কঠিন কিছু ছিল না, অথচ উন্নত দেশগুলোসহ পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ করোনায় মৃত্যুবরণ করেছে। যারা জনগণের পাশে নেই, জনগণের জন্য কিছু করছেন না, হঠাৎ হঠাৎ টেলিভিশনে উঁকি দিয়ে এ ধরণের কথা বলা তাদেরই মানায়।দায়িত্বপূর্ণ জায়গায় থেকে এ ধরণের কথা বলা সমীচীন নয়।’

অর্থাৎ করোনা মহামারিতে বিএনপি জনগণের পাশে নেই এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার জায়গায় তারা নেতিবাচক ভূমিকায় অবতীর্ণ।সংক্রমণের ভয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাউন্সিল, বিভিন্ন দিবসভিত্তিক আলোচনা সভা, রাজনৈতিক কর্মসূচি—মিটিং, মিছিল ও জনসভা নেই।করোনার কারণে এসব স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। ফলে এ সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাজ হওয়া দরকার দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারকে সাহায্য করা ও জনগণকে ভয়ের কবল থেকে রক্ষা করা। কিন্তু দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সে কাজে নিয়োজিত হলেও বিএনপি-জামায়াত জনকল্যাণে সম্পৃক্ত নয়; তাদের নেতা-কর্মীদের রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করতেও দেখা যাচ্ছে না।

পক্ষান্তরে করোনা মহামারিতে সারা দেশে ত্রাণ সহায়তা এবং বিভিন্ন হাসপাতালে সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণে আওয়ামী লীগ দলীয় তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করছে।ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা অনুদান দিয়েছে।যারা নিজেরা ত্রাণ বিতরণ করেননি, সেসব সমর্থক শুভাকাঙ্ক্ষী দলের ত্রাণ বিতরণে অর্থ দিয়েছেন। রাজধানীসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও দলের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে অনুদান দিয়েছেন নেতা-কর্মীরা।সমগ্র পৃথিবী আজ করোনাভাইরাসের কারণে অসহায় এবং পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের তুলনায় অনেক সমৃদ্ধ হলেও করোনা মোকাবিলায় তাদের অসহায়ত্ব প্রকাশ পেয়েছে, সেখানে মৃত্যুর মিছিল ছিল ভয়ঙ্কর। সেই তুলনায় বাংলাদেশ সীমিত সামর্থের একটি উন্নয়নশীল দেশ।এখানকার শহরগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ। এ সত্ত্বেও, এখনও পর্যন্ত সরকার এবং বেসরকারি পর্যায়ের সমস্ত হাসপাতাল ও স্বেচ্ছাসেবীসহ সম্মিলিতভাবে করোনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে অনেক উন্নত দেশের তুলনায় সাফল্য দেখাতে সক্ষম হচ্ছে, বিশেষ করে মৃত্যুহার কম রাখার ক্ষেত্রে। দেশে মৃত্যুর হার ভারত-পাকিস্তান এবং ইউরোপ-আমেরিকার চেয়ে অনেক কম। আশ্চর্য হচ্ছে, এই বাস্তবতার মধ্যে বিএনপি’র অপ-রাজনীতি থেমে নেই।

২.

গত ৫ জুলাই (২০২০) বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বিএনপির নেতারা ছাড়াও জামায়াতের নেতাদের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। বৈঠকে করোনাভাইরাস, নতুন অর্থবছরের বাজেট, চিকিৎসা ব্যবস্থার দুরাবস্থা, কৃষকদের ঋণ প্রণোদনা দেওয়া, শহর ছেড়ে গ্রামে ফেরা মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে নেতাদের কথায়।এছাড়া পাটকল বন্ধ, শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া, উচ্চাভিলাষী বাজেট প্রত্যাখ্যান করার বিষয়টিও নেতাদের আলাপে স্থান পেয়েছে।বৈঠকে তাদের রাজনৈতিক চিন্তাগুলো সরকারের উদ্দেশে জানানো হবে বলা হয়েছে। অন্যদিকে চলমান করোনা মহামারিতে উপনির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহ নেই বিএনপির। আগামী ১৪ জুলাই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া যশোর-৬ ও বগুড়া-১ আসনের উপনির্বাচন পেছানোর দাবি জানানো হচ্ছে দলটির পক্ষ থেকে। উল্লেখ্য, গত ২৯ মার্চ যশোর-৬ এবং বগুড়া-১ আসনের উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে ভোট গ্রহণের সপ্তাহখানেক আগে তা স্থগিত করা হয়। আসন দুটির মধ্যে বগুড়ার আসন শূন্য হয় ১৮ জানুয়ারি এবং যশোরের আসন শূন্য হয় ২১ জানুয়ারি। ইতোমধ্যে আসন দুটির উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের ৯০ দিন পার হয়েছে। সংবিধান প্রদত্ত সিইসির হাতে থাকা পরবর্তী ৯০ দিন পার হবে যথাক্রমে ১৫ ও ১৮ জুলাই। এর আগে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বগুড়া-১ ও যশোর-৬ আসনের উপনির্বাচনে একেএম আহসানুল তৈয়ব জাকির ও আবুল হোসেন আজাদকে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছিল বিএনপি।

একই দিন সরকারের নানা চাপ সত্ত্বেও বিএনপি কখনও মাথানত করে বসে থাকেনি বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘বিএনপি লড়াই করছে, সংগ্রাম করছে। আমি বিশ্বাস করি, বিএনপি উঠে দাঁড়াবে, সেই ফিনিক্স পাখির মতো উঠে দাঁড়াবে এবং জয়ী হবে। খালেদা জিয়া আসবেন সামনে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাদের সঙ্গে আসবেন, এসে গণতন্ত্রকে আমরা প্রতিষ্ঠা করবো এবং সব ধরনের সংকট মোকাবিলা করে আমরা জয়ী হবো—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’

অর্থাৎ উল্লিখিত বিবরণ অনুসারে, করোনা মহামারির মধ্যে দেশের জনগণকে কোনো ভালো কথা বলে পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করতে দেখা যায়নি বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটির নেতা-কর্মীদের।ব্যাধির দুর্যোগে অসহায় মানুষের পাশে থাকা জনসম্পৃক্ততার অন্যতম দৃষ্টান্ত হতে পারত এই রাজনৈতিক দলটির। কিন্তু মানুষের জন্য দায়বদ্ধ নয় সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা কৃষকের ধান কাটা থেকে শুরু করে দুস্থদের ত্রাণ বিতরণে ব্যাপকভাবে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত। জনসম্পৃক্ততার কারণে বেশ কিছু আওয়ামী লীগ নেতা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণও করেছেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি’র লক্ষণীয় কোনো কাজ চোখে পড়ে নি। বরং মহামারি মোকাবেলায় সরকারের বিপুল প্রচেষ্টাকে অভিনন্দন জানাতে কুণ্ঠিত হতে দেখা গেছে তাদের। সরকারের কোনো কোনো ইস্যুতে তারা সমালোচনামুখর হয়েছেন, সফল ও সুন্দর উদ্যোগকে ব্যঙ্গ করেছেন।

প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিকভাবে ফায়দা লুটার জন্য বিএনপি অনেক কাজ শুরু করেছে। একাধিক মিডিয়াতে সরকারের করোনা মহামারি মোকাবেলার প্রচেষ্টা নিয়ে তর্কযুদ্ধে লিপ্ত হতে দেখা গেছে। সংকটের মধ্যেও দুই চার দিন পর একইকথা তাদেরকে বলতে শোনা যায়। উন্নয়ন নিয়ে তাদের কথা বলার সুযোগ নেই। দেশের বর্তমান উন্নয়নের চেয়ে তাদের সময়ে অনেক বেশি উন্নয়ন হয়েছে- এটা বলা কেবল বাতুলতা।সরকারের দুর্নীতির কথা বলারও সুযোগ নেই। কারণ দুর্নীতির দায়ে তাদের শীর্ষ নেতারা উচ্চ আদালত পর্যন্ত দণ্ডিত হয়েছেন। কাজেই তাদেরকে আবার পুরানো ধারায় ফিরে যেতে হচ্ছে।গুরুত্বহীন ইস্যুতে সরকার বিরোধিতা তো আছেই, তার সঙ্গে জামায়াতের মতো ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির উপর তাদেরকে নির্ভর করতে দেখা যাচ্ছে।

৩.

‘নাইকো দুর্নীতি’ মামলার সাজা প্রত্যাহার করে আইনি লড়াইয়ে জয়ী হওয়া কিংবা রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার প্রত্যয় এখন আর নেই বিএনপির নেতা-কর্মীদের। কারণ শেখ হাসিনা সরকার খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে দিয়েছে।অবশ্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিয়েছিল নেত্রীর মুক্তি-আন্দোলনের অংশ হিসেবে। কিন্তু সবাই তখন নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় আন্দোলনের কিছুই হয়নি।২০১৯ সালে পরপর বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুটি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, বেগম জিয়ার মুক্তিতে ‘প্যাকেজ’ কর্মসূচি দেওয়া হবে। কিন্তু সেসময় কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারেনি দলটি। ৭২-ঊর্ধ্ব বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ১ বছরের বেশি সময় কারাবাসে ছিলেন।নানা রোগ-শোকে আক্রান্ত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। অবশ্য তাঁর দুর্দশা নিয়ে বিএনপির কোনো ভাবনাই ছিল না।এজন্য বলা হতো বেগম জিয়াকে বিএনপি ভুলে গেছে। আইনি লড়াইয়ের পথে তাকিয়ে ছিল বিএনপির একটি অংশ। আরেক অংশ বলছিল, আইনি প্রক্রিয়ায় বেগম জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয়। রাজপথে আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু গত ১১ বছরে জ্বালাও-পোড়াও ছাড়া রাজপথে বিএনপি-জামায়াত কোনো ধরনের আন্দোলন করে দাবি আদায় করতে পারেনি। আসলে গত বছরও প্রমাণ হয়েছে বিএনপি এখনো তারেক জিয়ার খপ্পরে। লন্ডন প্রবাসী পলাতক আসামি তারেক জিয়ার ভুল নির্দেশনায় দলটি এখনো ছন্নছাড়া। অতীতে খালেদা জিয়া নতুন প্রজন্মের নাম করে তার দুর্নীতিবাজ দুই পুত্রকে ক্ষমতায় বসাতে চেয়েছিলেন। কোকো মারা গিয়ে সেই চেষ্টা থেকে মাকে মুক্তি দিয়েছে। এখন খালেদা জিয়া নিজে দুর্নীতির দায়ে সাজাভোগ করছেন গৃহবন্দি হয়ে। সকলের নিশ্চয় মনে আছে, খালেদা জিয়া জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করেছিলেন। তার দুই ছেলে পিতার নামে অরফানেজ ট্রাস্ট করে এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে পাওয়া অনুদানের টাকা আত্মসাৎ করেছিলেন। বিচারে খালেদা জিয়ার ৫ বছর এবং তারেক জিয়ার দশ বছর কারাদণ্ড হয়।মুদ্রাপাচার মামলায় খালেদার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোকে ২০১১ সালের ২৩ জুন ছয় বছর কারাদণ্ড দেন ঢাকার জজ আদালত। এসব ঘটনা মাথায় রেখেই কোনো কোনো নেতা দল পুনর্গঠনের জন্য কাজ করেছেন কিন্তু তাঁরাও স্বার্থবাদী আর সুবিধাবাদী রাজনীতির ঘেরাটোপে আটকে ছিলেন।সবমিলে বিএনপি এখন মুর্মূষু রাজনৈতিক দল, বেগম খালেদা জিয়ার মতো অসুস্থ, দুর্বল এবং নেতৃত্বশূন্য দিশাহীন।

৪.

রাজনৈতিকভাবে দায়বদ্ধতাশূন্য বিএনপি নামক দলটি অতীতে শুধু রাজপথে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ আর বক্তৃতা-বিবৃতিতে জনগণের কথা না বলে নিজেদের কথা বলে গেছে। সামাজিক সমস্যা কিংবা জনগণের পক্ষে রাজপথের কোনো শক্ত কর্মসূচিতে যেতে চান নি নেতারা। এতে উটকো ‘ঝামেলা’ বাড়বে বলেও মনে করতেন নেতৃবৃন্দ। বাস্তবে আত্মকেন্দ্রিক ব্যস্ততায় ছিলেন দলের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা। এরই মধ্যে বিএনপি নেতারা নানা ইস্যুতে পরস্পরকে দোষারোপ করেছেন। একজন আরেকজনকে বিএনপির শত্রু বলেও আখ্যা দিয়েছেন। এক ধাপ এগিয়ে সরকারের ‘দালাল’ বা ‘এজেন্ট’ বলেছেন। সর্বশেষ ২০১৯ সালে পাঁচ এমপির শপথে নেতা-কর্মীদের ধারণা ছিল, বেগম জিয়ার মুক্তি নিয়ে সমঝোতার অংশ হিসেবে তারা সংসদে গেছেন। এ নিয়ে দলের সিনিয়র নেতারা বলেছিলেন, এমপিদের শপথের সঙ্গে বেগম জিয়ার মুক্তির কোনো সম্পর্ক নেই। আসলে বিএনপি নেতারা সবাই ব্যস্ত নিজেদের নিয়ে। নিজের অর্থ সম্পদ রক্ষা, নিজের পদ-পদবি, নমিনেশন বা বলয় সৃষ্টি করতে মরিয়া কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি বড় অংশ। এক্ষেত্রে মা’র মুক্তির জন্য আন্দোলনকে চাঙ্গা করার বিষয়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামি তারেক জিয়ার ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।

অনেক আগেই উইকিলিকস খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান এবং তাঁদের সঙ্গে সম্পর্কিত নানান বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করেছে। তারেক রহমান জিয়ার নটরিয়াস জ্যেষ্ঠপুত্র এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। তাকে অনেকে বলে থাকেন দুর্নীতিবাজ, রাজনীতি ও ব্যবসায়ী ক্ষেত্রে অনভিজ্ঞ, অর্ধ-শিক্ষিত ও দুর্বিনীত। তবে তিনি বিএনপির সিনিয়র পদে অভিষিক্ত হওয়ায় তার মা খালেদা জিয়া অধিকতর নিরাপদ অনুভব করেন। যদিও তারেক ‘হাওয়া ভবন’ খ্যাত ছায়া সরকারের কর্মকাণ্ডের মূল হোতা ছিলেন। উইকিলিকস রিপোর্টে মার্কিন তারাবার্তায় ভবিষ্যতে খালেদা জিয়া তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন কিনা তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল। পুত্রের গুণাবলি ও যোগ্যতা এবং মাতার প্রশ্রয় সম্পর্কে উইকিলিকস সূত্রে আমরা জানতে পেরেছিলাম, খালেদা জিয়া কেবল নিজের সন্তান তারেককে নিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে তোলেন। একজন মা হয়ে তার পুত্রের সুখকর ভবিষ্যৎ রচনার জন্য অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি করেছেন; রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যন্ত্রকে ব্যবহার করেছেন নির্বিচারে। পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত একটি স্যুটকেস ও ছেঁড়া গেঞ্জির চমক দেখাতে গিয়ে সন্তানরা দুর্নীতির চোরাগুপ্তা পথ বেছে নিলে তাদেরকে নিষেধ করেন নি তিনি। ফলে অনেক আগে থেকেই বিএনপি’র মতো রাজনৈতিক দল তার গতিপথ হারিয়েছে।

৫.

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। পক্ষান্তরে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের ভরাডুবি এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেওয়া; উপরন্তু ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে পুনরায় ভরাডুবি হওয়ায় গত একদশকে আবর্তিত বিএনপি’র রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। মহাজোট সরকারের আমলে বিরোধী দল হিসেবে জনগণের কোনো দাবি নিয়ে তারা রাজনৈতিক মঞ্চে আবির্ভূত হতে পারে নি। বরং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় নিজেদের অবস্থান ছিল অস্পষ্ট। দেশের অগ্রগতি ও উন্নয়নে কোনো ধরনের অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়নি বিএনপি’র কোনো নেতাকে। আন্তর্জাতিকভাবে নিজেদের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতেও ব্যর্থ হন তারা। বরং ভারতবিরোধী হওয়ায় ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ না করে বেগম খালেদা জিয়া বিতর্কিত হন। আর দুর্নীতির মামলায় নিজের অবস্থান জনগণের কাছে পরিষ্কার করতে এ পর্যন্ত সক্ষম হননি তিনি। অন্যদিকে বিএনপি’র কিছু নিবেদিত সমর্থক শ্রেণি থাকলেও ১১ বছরে তাদের অবস্থানও পাল্টে গেছে। কেউ কেউ রাজনীতি থেকে দূরে আছেন। কেউ বা আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন। অতীতে হরতাল-অবরোধ দিয়ে ঘরে বসে থেকে বিএনপি নেতারা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা সাধারণ মানুষকে আরো বেশি ভোগান্তিতে ফেলেছিল। কারণ পেট্রোল বোমা আর আগুনে মানুষ পুড়িয়ে মারার ভয়ঙ্কর সংস্কৃতি চালু করেন তারা। ফলে গত ১১ বছরে বিএনপি’র রাজনীতি বিভিন্ন অভিযোগের কারণেই জনসমর্থন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। অবশ্য এই সময়ের মধ্যে তারা একাধিক জনসমাবেশ করলেও নির্বাচনে তারেক জিয়ার নমিনেশন বাণিজ্য দলের কর্মকাণ্ডকে বিতর্কের মধ্যে পতিত করে।

বিএনপি’র নেতৃত্বে তারেক জিয়ার মতো ব্যক্তির প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন এখন সর্বত্র। ২০০৭ সালের ঘটনাধারায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তারেক রহমান লন্ডনে গিয়ে আর দেশে ফেরেননি। সেখানেই তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন; তার রাজনৈতিক জীবনে দেউলিয়াত্ব প্রকাশের সূচনা-সংগীতও তখন থেকে বেজে চলেছে। ইতোমধ্যে দুর্নীতি এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা স্পষ্ট হওয়ায় তিনি এখন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। এজন্য ভবিষ্যতে ২০ দলীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রীত্বের আসনেও ঘৃতাহুতি দিয়েছেন তিনি। অনেক আগেই ব্রিটেনের নাগরিকত্ব লাভ করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তার অক্ষমতাও প্রকাশ পেয়েছে। উপরন্তু সেখানে বসে আওয়ামী লীগ সরকার ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে নানাবিধ বিভ্রান্তিকর কথা বলে গেছেন। আসলে ব্রিটিশ সরকারের কাছে বর্তমান সরকার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা প্রচার করে তার রাজনৈতিক আশ্রয় কতটুকু দেশপ্রেমিক নেতার পরিচয় বহন করে- তা নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে। অন্যদিকে বর্তমান সরকারের দ্বারা তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে পারেন বলে প্রচার করেছিলেন।তা থেকেও ব্রিটিশ সরকারের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেন নি।২০১৮ সালে কোটা সংস্কারের আন্দোলনের ঘটনাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহার করে দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ কিংবা আওয়ামী লীগ সরকার ব্যর্থ অথবা বিরোধী দলকে নিষ্পেষণ করা হচ্ছে বলে প্রচারে নেমেছিল বিএনপি; যা একেবারে হাস্যকর। আবার বর্তমান সরকারের কার্যক্রমকে বিশ্বের সরকার প্রধানরা সমর্থন করছে না বলে প্রচারও ধান্দাবাজ ব্যক্তির নিজের আখের গোছানোর অপচেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। আসলে তারেক রহমান নিজেই অপরাধী; ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার খল নায়ক ও খুনি এবং অর্থপাচারের প্রকৃত আসামি, দুর্নীতি মামলার সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি।

উল্লেখ্য, মানুষ হত্যার আসামি বলেই তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে এ সরকারের আমলে মামলা পরিচালিত হয়েছে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে ১৪টি মামলা দায়ের করা হয়। বর্তমান সরকারের আমলে অর্থপাচার ও আলোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আসামি করে আরও দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তাকে গ্রেফতার করেছিল ২০০৭ সালে যৌথবাহিনী। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পেয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়ে আর ফিরে না এসে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন তিনি। তারেক জিয়া ও তার বন্ধু গিয়াস উদ্দিন মামুনের অর্থপাচারের মামলাটি হয় ২০০৯ সালে ২৬ অক্টোবর। মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন(দুদক)। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২৯ মার্চ ২০০৭ সালে যে শীর্ষ জঙ্গিদের ফাঁসি কার্যকর করে তাদের সকলেরই তারেক রহমান ও জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই অতীতে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় গ্রেফতারকৃত হরকাতুল জিহাদের প্রধান মুফতি হান্নান তার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে হামলার সাথে বিএনপি নেতা তারেক রহমান, আবদুস সালাম পিন্টু, লুৎফজ্জামান বাবর এবং ইসলামী ঐক্য জোট নেতা মুফতী শহিদুল ইসলামের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার অন্যতম সাজাপ্রাপ্ত আসামি লন্ডনে আশ্রিত তারেক রহমান।

৬.

আসলে গত প্রায় এক যুগে বিএনপির উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, আসামি তারেক জিয়ার অপকর্মসমূহের বিচার ও দণ্ড ঘোষণা এবং দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা পাওয়া ও কারাগারে যাওয়া। ফলে বিএনপির নেতৃত্বে ঐক্য নেই। সর্বোপরি ২০১৮ সালের নির্বাচনে শরিকদের সঙ্গে আসন বণ্টনসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় নিয়ে ছিল বিরোধ। ওই পরিস্থিতির মধ্যে বিএনপি তখন ভারতের ‘নিরপেক্ষ’ ভূমিকা প্রত্যাশা করে দৌড়ঝাঁপে লিপ্ত হয়েছিল। অবশ্য ভারত এ দেশে নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেও বিএনপি’র জামায়াত সম্পৃক্ততাকে মেনে নিতে পারে নি। ফলে বিএনপি’র আশায় শেষ পর্যন্ত গুড়েবালি জুটেছিল বলা যেতে পারে। কারণ উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ২০০১-০৬ সাল পর্যন্ত তখনকার বিএনপি সরকারের নেপথ্য ভূমিকা ছিল বলে ভারত অভিযোগ করে এসেছে।আবার ভারতের সঙ্গে তৎপরতা বেশি দৃশ্যমান হলে চীন যাতে বিগড়ে না যায় সেদিকেও দৃষ্টি রাখে বিএনপি। কারণ বিএনপি সরকারের আমলে ঢাকায় তাইওয়ান সেন্টার নির্মাণকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দূরত্বও বিভিন্ন সময় চীনে প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে কমিয়ে আনতে পারেনি তারা।

২০১৮ সালে নেতাদের ভারত সফর থেকে মনে হয়েছিল বিএনপি তাদের ভারতবিরোধিতার নীতিতে পরিবর্তন আনছে- কিন্তু বাস্তবতা হলো দলটি নানা কর্মকাণ্ডে অকারণ ভারতবিরোধিতায় মেতে আছে এখনো। উল্লেখ্য, ভারতবিরোধিতা বিএনপির রাজনীতির একটি বড় অনুষঙ্গ। দলটির উদ্ভব, বিকাশ, নির্বাচনী কর্মকাণ্ড, এমনকি নিত্যদিনের রাজনৈতিক বিবৃতিতে এ বিরোধিতার উদাহরণ স্পষ্ট। এ পর্যন্ত রাজনীতিতে ভারতের সঙ্গে নিবিড় বাণিজ্য ও কানেকটিভিটির বিষয়ে নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। বিএনপি তার প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগকে ভারতের কাছে নতজানু বলে বরাবরই কোণঠাসা করতে চেয়েছে।

অথচ সকলে জানেন, ভৌগোলিক ও বিশ্বে রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। দেশটিকে এড়িয়ে বাংলাদেশের শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নও কঠিন। তাছাড়া ঢালাও বিরোধিতা করোনাকালেও সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো প্রভাব ফেলে নি।এছাড়া দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ব্যাপারে ভারতের নেতিবাচক অবস্থান রয়েছে। ভবিষ্যৎ দলীয় প্রধানের ব্যাপারে প্রতিবেশী দেশটির অবস্থান ইতিবাচক হওয়া দরকার। এটিও বিএনপির চিন্তা করা দরকার। ২০১২ সালের শেষ দিকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ভারতে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলেছিলেন। পরে অবশ্য তাঁর কথাবার্তায় পরিবর্তন দেখা যায়। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন নিয়ে যেকোনো দলের স্থায়ী ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান থাকা দরকার।

৭.

মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর শাসনামল থেকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে পাকিস্তানবাদী বিরোধী শক্তির সমালোচনা ও অপপ্রচার শুরু হয়েছিল তারই প্রকৃত রূপ দেখা যায় বিএনপি’র রাজনীতিতে।১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর জিয়াউর রহমান-খালেদার নেতৃত্বে বিএনপি মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিকে ‘দাসত্বের চুক্তি’ বলে বারবার সমালোচনা করে এসেছে। ১৯৯৭ সালে এ চুক্তি শেষ হওয়া পর্যন্ত একে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বলে সমালোচনা করে গেছে খালেদা জিয়ার দল। ফারাক্কার পানিবণ্টন চুক্তিকে বিএনপি বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বলে সমালোচনা করেছে। ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষর হওয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে বিএনপি। খালেদা জিয়া তখন বলেছিলেন, পার্বত্য চুক্তি হলে ফেনী পর্যন্ত ভারতের অংশ হয়ে যাবে। ক্ষমতায় গেলে ফারাক্কা ও পার্বত্য চুক্তি বাতিলের প্রতিশ্রুতিও দেয় বিএনপি; যদিও তা তারা করেনি। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল, আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে দেশ ভারত হয়ে যাবে। এসব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা বক্তৃতায় শুধু নয়, বিভিন্ন সময় রূঢ় আচরণে বিএনপি ভারতের প্রতি তার নেতিবাচক মনোভাব তুলে ধরে। ২০১৩ সালের মার্চ মাসে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশে এলে আগে থেকে নির্ধারিত সৌজন্য সাক্ষাতে যাননি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বিএনপির আমলে ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল দেশের সবচেয়ে বড় অস্ত্রের চোরাচালান ১০ ট্রাক অস্ত্র ধরা পড়ে। রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজারের (সিইউএফএল) জেটিঘাটে খালাস করার সময় ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালানটি আটক করে টহল পুলিশ। অস্ত্রের চালানটি উলফার জন্য যাচ্ছিল। এ নিয়ে ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি দুটি মামলার রায় দেন আদালত। এর মধ্যে একটিতে সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়া এবং দুটি গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ১৪ জনের ফাঁসির আদেশ হয়।

উপরের এই অবস্থা এখনো পাল্টায় নি। একাদশ সংসদ নির্বাচনের পরও তাদের একাধিক নেতা বিএনপি’র ভারতবিরোধী চিরাচরিত অবস্থানের আদলেই কথা বলেছেন। ২০১৮ সালের ২৭ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর নিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছিলেন, ‘সরকারি অর্থ ব্যয় করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে ভারতের কাছে আকুতি জানাতে ওই সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী।গণমাধ্যমের খবরে এটা পরিষ্কার ছিল, প্রধানমন্ত্রী দেশের স্বার্থে ভারতে যাননি, তিনি তিস্তার পানিচুক্তি, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে যাননি। তিনি ভারতে গেছেন ক্ষমতায় টিকে থাকতে দেনদরবার করার জন্য।’ প্রধানমন্ত্রীর ওই সফর নিয়ে এই নেতার বক্তব্য একেবারেই তাদের ভারতবিরোধী অবস্থানকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। পক্ষান্তরে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঢাকা থেকে ধরা হয় আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা অনুপ চেটিয়াকে। আর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর উলফা, টিএনভি, এনএলএফটিসহ একাধিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের নেতাদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এসব উদ্যোগের ফলে উত্তর-পূর্ব ভারতে সহিংসতা অনেকটাই কমে এসেছে। ভারতকে দেয়া এসব সহযোগিতা নিয়ে শেখ হাসিনার কথারও সমালোচনা করে বিএনপি। ফলে ভারতের নীতি নির্ধারক মহল তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হওয়ার কথা নয়।ভারতবিরোধিতা বিএনপির নির্বাচনী রাজনীতিতে সব সময় মূল বিষয় থেকেছে। দেশীয় রাজনীতির সুস্থ ধারা প্রবর্তন এবং আঞ্চলিক সুসম্পর্কের ক্ষেত্রে তাদের অবদান শূন্য।

আসলে স্বাধীনতার আগে থেকেই প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার বিরুদ্ধে যত শক্তি আছে, তাদের মূল লক্ষ্যই ছিল ভারতবিরোধিতা, ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি এবং ধর্মান্ধতা। নির্বাচনে তারা এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত ও উস্কে দিতো। ২০১৮ সালে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট, বিএনপি এবং জামায়াতকে সেই পুরানো ধাঁচে ভারতবিরোধিতা, ধর্ম চলে যাওয়া, ধর্মাশ্রয়ী বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। এগুলোই তাদের রাজনীতির মূলধন।বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটি একটি আদর্শের উপর টিকে আছে তিন দশকের বেশি সময় ধরে।বিশ্বে সামরিক শাসকদের কোনো রাজনৈতিক দলই টিকে নেই। ধর্মাশ্রয়ী পাকিস্তানি মুসলিম লীগীয় ভাবধারা এবং ভারতের বিরোধিতা করেই কেবল এই দলটি রাজনীতিতে টিকে আছে।কিন্তু বিএনপি এখন জনবিচ্ছিন্ন এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতাশূন্য দল।

৮.

একটি রাজনৈতিক দল কতটা দেউলিয়াত্বের পরিচয় দিতে পারে তার একটি ঘটনা এখানে বলা যেতে পারে।২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে সামনে রেখে ওই একই সালের ২৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন(ইসি) সচিবালয়ে হাজির হয়ে বিএনপি নেতৃবর্গ তাদের সংশোধিত গঠনতন্ত্র জমা দেয়। নতুন ওই গঠনতন্ত্রে বাদ পড়ে ৭-এর সব উপধারা। এর ফলে দুর্নীতিবাজ ও কুখ্যাতদের জন্য বিএনপির দ্বার উন্মুক্ত হয়।২০১৬ সালের ১৯ মার্চ তাদের কাউন্সিল সম্পন্ন হলেও ২০১৮ সালে সেটি জমা দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল বেগম জিয়ার মামলার রায়ের জন্য অপেক্ষা করা।

তখন গঠনতন্ত্র সংশোধন করে চেয়ারপারসনকে রক্ষার করার বিষয়টি সকলের কাছে পরিষ্কারভাবে ধরা পড়েছিল।উল্লেখ্য, বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭ নম্বর ধারায় কমিটির সদস্য পদের অযোগ্যতা শিরোনামে বলা ছিল, ‘নিম্নোক্ত ব্যক্তিগণ জাতীয় কাউন্সিল, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, জাতীয় স্থায়ী কমিটি বা যেকোনো পর্যায়ের যেকোনো নির্বাহী কমিটির সদস্য পদের কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী পদের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। তারা হলেন: (ক) ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নম্বর ৮ এর বলে দণ্ডিত ব্যক্তি, (খ) দেউলিয়া, (গ) উন্মাদ বলে প্রমাণিত ব্যক্তি, (ঘ) সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি।’ প্রকৃতপক্ষে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ের দিন ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতেই গঠনতন্ত্রের ‘৭’ ধারা বাদ দেয়া হয়েছিল।মনে করা হয়েছিল, মামলার রায়ে খালেদা জিয়ার সাজা হলে দলের গঠনতন্ত্রের ধারা ৭-এর ‘ঘ’ সামনে আনা হতে পারে। এছাড়া এই ধারা ব্যবহার করে দলের ভাঙন সৃষ্টির পাঁয়তারা হতে পারে। অর্থাৎ গঠনতন্ত্রের পরিবর্তনের কারণে দুর্নীতি প্রমাণ হয়ে দণ্ডিত হবার পরেও দলে বহাল তবিয়দে পদ নিয়ে থাকতে পারবেন বেগম জিয়া। আসলে নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া গঠনতন্ত্রে দলের জাতীয় কাউন্সিল ছাড়া সংশোধনী আনার বিষয়টি গোপন রাখা হয়।উপরন্তু গঠনতন্ত্র সংশোধন করতে হলে কাউন্সিলে তা অনুমোদন আনতে হয়- সে রীতিও লঙ্ঘন করা হয়েছিল। অবশ্য ২৮ জানুয়ারি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দলের সিনিয়র নেতা নজরুল ইসলাম খান বলেছিলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ছাড়া আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে না বিএনপি। তাদের বাদ দিয়ে বিএনপির নির্বাচনে যাওয়ার ভাবনা মূর্খতা। তিনি আরও বলেন, আগামী নির্বাচন থেকে অন্যায়ভাবে বিএনপিকে বাইরে রাখার জন্য সরকার ষড়যন্ত্র করছে। খালেদা জিয়া বা তারেক রহমানকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার চেষ্টা করা হলে বিএনপির কেউ নির্বাচনে অংশ নেবে না।’ যদিও সেই নির্বাচনে বিএনপিসহ দেশের সকল রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছিল এবং যথারীতি শোচনীয়ভাবে পরাজিতও হয় তারা।

অর্থাৎ ২০১৮ সালে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম কুখ্যাত ও দুর্নীতিবাজকে সরাসরি সাংবিধানিকভাবে অনুমোদন দিয়েছিল বিএনপি। তাদের নিজেদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিএনপি তখন থেকে ঘোষিত দুর্নীতিবাজ দল। কারণ শুধু একজন বা একটি পরিবারের জন্য কোনো দলের গঠনতন্ত্রে দুর্নীতি জায়েজ করা এক নজিরবিহীন ঘটনা। এমন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিজেদের নীতিহীনতার পরিচয়কেই আরেকবার বড় করে তুলে ধরেছিল বিএনপির নেতৃবৃন্দ। আর এমন গঠনতন্ত্রের কারণেই ‘প্রমাণিত’ ও কুখ্যাত সব দুর্নীতিবাজদের জন্যই বিএনপির দ্বার উন্মুক্ত হয়। একইসাথে গঠনতন্ত্রের ওই পরিবর্তনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার এতিমের টাকা মেরে দেওয়ার ব্যাপারটিও স্বীকার করে নেয়া হয়েছিল।

২০০৮ সালে ১/১১ আমলে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা ১৮টি মামলা উধাও হয়ে গেল, আর একই আমলে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোতে তাঁকে শাস্তিতে পেতে হলো- এরকম একটি বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা ছড়ানো হয়। সত্য হলো- ২০০৮ সালে শেখ হাসিনার নামে যে সব মামলা হয়েছিল সেগুলো আদালতের চলমান সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় নিষ্পন্ন হয় এবং যে অভিযোগগুলো জননেত্রীর বিরুদ্ধে এসেছিল সেগুলো আদালতে যুক্তিতর্কের মাধ্যমেই বাতিল হয়েছে। বাতিল হয়েছে এই কারণে নয় যে তিনি প্রধানমন্ত্রী। মামলাগুলো আদালতে যে প্রক্রিয়ায় অভিযুক্তকে সম্মুখীন হতে হয় সেভাবেই আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে মোকাবেলা করা হয় এবং ওই মামলার যে যৌক্তিকতা নেই তা প্রমাণিত হয়েছে।

বিএনপি নেতাদের অভিযোগ অনুসারে যদি আওয়ামীলীগ স্বাধীন বিচার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপই করত তাহলে খালেদা জিয়া বিরুদ্ধে ভৈরব সেতুর মামলা কিভাবে একই প্রক্রিয়ায় বাতিল হয়েছিল? আসলে ভৈরব সেতুর মামলায় যৌক্তিকতা ও কোনো ধরনের প্রমাণ না থাকার কারণে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ভৈরব সেতু মামলাকে আওয়ামীলীগ সরকারের আমলেই আদালত বাতিল করে। পক্ষান্তরে খালেদা জিয়া এতিমের টাকা চুরির মামলাটি মোকাবিলা করেন আর ওই মামলার কোনো মেরিট না থাকলে তাও বাতিল হয়ে যেত। কিন্তু যেহেতু ওই মামলার মেরিট ছিলো তাই ২০০৮ সালে দায়ের করা মামলাটিকে প্রতিহত করার জন্য খালেদা জিয়া ও তাঁর আইনজীবীরা সুচতুরভাবে আদালতের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করার জন্য ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেননি। বরং বার বার তারিখ নিয়েছিলেন। এজন্যই খালেদা জিয়াকে ওই মামলায় বার বার আদালতে হাজিরা দিতে হয়।২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে পেট্রোল বোমার রাজনীতি করে ক্ষমতায় বসবেন এমন দিবাস্বপ্ন দেখে ভেবেছিলেন ক্ষমতায় এলে তাঁরা এসব মামলাকে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। অথচ এতিমের টাকা মেরে দেবার পূর্বাপর ঘটনা বাস্তব ও প্রমাণিত। মূলত খালেদা জিয়াসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় হয় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। সাজা ভোগের মধ্যে বর্তমানে তিনি প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বাসাতে অবস্থান করছেন।

৯.

বিএনপি এখন কেবল সাংগঠনিকভাবে দুর্বল দল নয়, তারা ষড়যন্ত্রকারী এবং মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি হিসেবে চিহ্নিত।জনবিচ্ছিন্ন যেমন তেমনি চোরদের রক্ষার জন্য বিএনপি গঠনতন্ত্রের ৭ নং ধারা পরিবর্তন করে বিতর্কিত দলে পরিণত হয়েছে।শাস্তিপ্রাপ্ত আসামি তারেকের মতো ব্যক্তিদের রাজনৈতিক দলের প্রধান হওয়ার কারণেই বিএনপি-জামায়াতের ২০ দলীয় নেতারা প্রকৃতপক্ষে আলাদা, ভিন্ন, স্বতন্ত্র ও নেতৃত্বের গৌরবজনক আসনে সমাসীন নন। তাঁরা কখনো এদেশের জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে ভূমিকা রাখেননি। জনতার আকাঙ্ক্ষাসমূহ এবং টিকে থাকার বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধনের সাহায্যে রাজনীতিতে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন। এজন্যই গত ১১ বছরের রাজনীতিতে তারা হত্যা ও নাশকতার পথ বেছে নিয়েছিল। কিন্তু সে পথে রাজনীতিতে সাফল্য এখন সুদূর পরাহত। কারণ যুগ পাল্টে গেছে; মানুষ নাশকতা ও জঙ্গিবাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এজন্য খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়াকে নেতা মেনে রাজপথের আন্দোলনে জনসমর্থন নেই। অন্যদিকে বিএনপি যে ফিনিক্স পাখির মতো জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন পেয়ে এখন আবার ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে তা অস্বাভাবিক।

লেখক : বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট; সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম; নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। email-writermiltonbiswas@gmail.com

এইচআর/এমকেএইচ