খেলাধুলা

সর্বোচ্চ লিগের ফুটবলার এখন ৪০০ টাকার রাজমিস্ত্রি

দেশের সর্বোচ্চ ফুটবল আসর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা ফুটবলার মো. আরিফ হাওলাদার এখন পেটের দায়ে করছেন রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ। একসময় ফুটবল থেকে আয় করেছেন লাখ লাখ টাকা। এখন দৈনিক ৪০০ টাকায় হাড়ভাঙা খাটুনি। যে পায়ে বল খেলতেন আরিফ, সে পা এখন রক্তাক্ত জোগালির কাজ করতে গিয়ে।

আরিফদের আদিবাড়ি ভোলায়। তবে তার বাবা মো. শাহজাহান হাওলাদার থিতু হয়েছেন নারায়নগঞ্জে। শহরের ইসদাইরে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন তারা। চার বোন, দুই ভাই আরিফরা। বোনদের বিয়ে দিয়েছেন। আরিফের বাবা হার্ট স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে ঘরে। নিজে ও ছোট ভাই রাব্বি হাওলাদারের ফুটবল থেকে আয়েই চলতো তাদের সংসার।

কিন্তু হঠাৎ ছন্দপতন তাদের সংসারে। আরিফ ও রাব্বির কেউই খেলার জন্য দল পায়নি এ মৌসুমে। আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৬ মাস ধরে রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ নিয়েছেন। ছোট ভাই একটি চায়ের দোকান দিয়েছিল। করোনার কারণে সেখান থেকেও কোন আয় নেই। আরিফের দৈনিক ৪০০ টাকার মধ্যে দুপুরের খাওয়া ও অন্যানন্য খরচ মিলিয়ে ১০০ টাকা চলে যায়। বাসায় ফেরেন ৩০০ টাকা নিয়ে।

জাতীয় দলের গোলরক্ষক শহিদুল আলম সোহেল, রায়হান হাসান, ইয়াসিন খানদের সঙ্গে এক সাথে জাতীয় যুব দলে খেলেছেন আরিফ। জুনিয়র জাতীয় দলের হয়ে লাল-সবুজ জার্সি পরে বিদেশেও খেলেছেন। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে খেলেছেন আরামবাগ, বিজেএমসি ও শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবে। সর্বশেষ গত মৌসুমে খেলেছেন বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপের দল অগ্রণী ব্যাংকে। স্থগিত হয়ে যাওয়া মৌসুমে দলই পাননি আরিফ।

দুই ভাই পিঠাপিঠি। আরিফের বয়স ২৬ বছর, রাব্বির ২৫। দুজনই এখন ফুটবলের বাইরে- বুটহীন। তাই সংসার আর চলছে না তাদের। আরিফদের অসহায়ত্বের খবর জানতে পেরে কোচ কামাল বাবু ব্যক্তিগতভাবে কিছু সহায়তা করেছেন।

‘আমাদের বড় সমস্যা এখন মাসে ৬ হাজার টাকা বাসা ভাড়া দেয়া আর বাবার ঔষধের টাকা। ছোট ভাইয়ের চায়ের দোকানে এখন মানুষ যায় না লকডাউনের কারণে। আমার দৈনিক যে ৩০০ টাকা থাকে সেটাই এখন একমাত্র ভরসা। কারও কাছে হাতও পাততে পারি না। নারায়নগঞ্জের ডিএফএ’র কর্মকর্তারা মেয়ে ফুটবলারদের কিছু সহায়তা করেছেন। কিন্তু আমরা যারা সমস্যায় আছি তাদের কেউ খবর নেননি। আগামী দিনগুলো কিভাবে কাটবে জানি না’- নারায়ণগঞ্জ থেকে বলছিলেন আরিফ।

অথচ আরিফের ফুটবলের পথচলা দারুণভাবেই ছিল। ২০০৬ সালে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ খেলেছেন ফিলিপাইনে। তার আগে অনূর্ধ্ব-১৩ ফুটবলও খেলেছেন দেশের মাটিতে। পারফরম্যান্সের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে উপরেই উঠছিলেন আরিফ। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের তিনটি দলের হয়েও মাঠ মাতিয়েছেন। অথচ নিয়তি তাকে আজ বানিয়েছে সবচেয়ে কঠিন একটি কাজ রাজমিস্ত্রির জোগালি। যে পা দিয়ে দেশের জন্য ফুটবল খেলেছেন, সেই পা দিয়ে রক্ত ঝড়ছে ইট-বালু, সিমেন্ট আর রডের কাজ করতে গিয়ে।

আরিফ প্রসঙ্গে ফুটবল কোচ কামাল বাবু বলেছেন,‘আমার অধীনে কখনও সে খেলেনি। তবে মেধাবী ফুটবলার ছিল। যোগ্যতা দিয়েই প্রিমিয়ারের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছে। আজ আরিফরা অসহায়। এমন অনেক ফুটবলার আছেন যারা কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। এবারের মৌসুমে কোন দল না পাওয়াতেই সমস্যায় পড়ে যায় ওদের পরিবার। যাদের সামর্থ্য আছে তাদের এমন ফুটবলারের পাশে দাঁড়ানো উচিত।’

আরআই/এসএএস/এমএস