দেশজুড়ে

অর্ধশত ঘর-বাড়িসহ কয়েকশ একর আবাদি জমি এখন নদীগর্ভে

গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা বর্ষার পানিতে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার বংশাই ও ঝিনাই নদীতে ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে উপজেলার ফতেপুর ও ভাতগ্রাম ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের অর্ধশত ঘর-বাড়িসহ ও কয়েকশ একর আবাদি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে।

এছাড়া উপজেলা সদরের সঙ্গে ফতেপুর ইউনিয়নের যোগাযোগের প্রধান সড়ক কুর্ণী-ফতেপুর সড়কেও ভাঙন শুরু হয়েছে। ফলে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এলাকাবাসী। সেই সঙ্গে হুমকির মুখে পড়েছে থলপাড়া গ্রামের আশরাফুল উলুম হাফিজিয়া মাদরাসাও।

ভাঙনের কবল থেকে ঘর-বাড়ি রক্ষা করতে অনেকেই নদীর কিনারায় কলাগাছ ফেলে ও বাঁশের বেড়া দিয়ে ভাঙন ঠেকাতে চেষ্টা করছেন।

গত বছর ২ সেপ্টেম্বর পানি সম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম বংশাই ও ঝিনাই নদীর ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন।

পরিদর্শন শেষে উপমন্ত্রী সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে জানিয়েছিলেন, সরকার মির্জাপুরের নদীভাঙন কবলিত এলাকার জন্য ডিপিটি প্রকল্প ও বংশাই নদীতে ড্রেজিং প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এছাড়া বেশি ভাঙন কবলিত এলাকায় দ্রুত ডাম্পিং করার নির্দেশনা দেন। এরপর ভাঙন কবলিত এলাকায় বালির বস্তা ফেলে নামমাত্র কাজ করা হলেও ভাঙন রোধ হয়নি বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন।

এলাকাবাসী জানায়, প্রায় এক মাস আগে বংশাই ও ঝিনাই নদীর পানি বৃদ্ধি শুরু হয়। এছাড়া গত কয়কদিনের টানা বর্ষণ এবং উজান থেকে আসা বর্ষার পানিতে ফতেপুর ইউনিয়নের থলপাড়া, ফতেপুর, বানকাটা, চাকলেশ্বর, বৈলানপুর-পাতিলাপাড়া ও ভাতগ্রাম ইউনিয়নের গোড়াইল এলাকায় ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। ভাঙনের তীব্রতায় এরই মধ্যে রাস্তা, ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি নদী গর্ভে চলে গেছে। থলপাড়া, বানকাটা ও গোড়াইল গ্রামের দরিদ্র পরিবারের অনেকেই বসত বাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে।

হিলরা বাজারের উত্তর পাশের অধিকাংশ স্থান এবং বাজারের পার্শ্ববর্তী এলজিইডির রাস্তা-কালভার্ট ভেঙে গেছে। বিলীন হয়েছে শত শত একর আবাদি জমি।

বর্ষা মৌসুমে গত কয়েক বছর নদীর ওইসব এলাকা থেকে খননযন্ত্র দিয়ে অসাধু ব্যক্তিরা বালু তুলেছেন। প্রতি বছর পানি কমার সাথে সাথে ২০/২৫টি ড্রেজার মেশিন দিয়ে নদীর ওইসব এলাকা থেকে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকে। এ কারণে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করছে বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কুর্ণী-ফতেপুর সড়কে আগে যেখানে গড়ে প্রতিদিন শত শত যানবাহন চলাচল করতো ভাঙনের ফলে এখন প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, পিকআপ, ট্রাক-সব ধরনের মোটর গাড়ির চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

সিএনজি অটোরিকশা চালক রফিক মিয়া, আয়নাল মিয়া জানান, আগে এই সড়কে প্রায় ৩০০ সিএনজি চলাচল করতো। ভাঙনের ফলে এখন ১০/১২টি অটো টেম্পু ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থালপাড়া, হিলড়া ও বানকাটা গ্রামের লোকজন জানান, এলাকার আক্তার হোসেন, সাইজ উদ্দিন, কদ্দুছ, নুরু, পলাশ, প্রিন্স, আওয়াল ও সজল প্রতি বছর ড্রেজার মেশিন দিয়ে ঝিনাই নদীর প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় বিভিন্নস্থানে বালু উত্তোলন করে থাকে। এছাড়া কয়েক বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে খননযন্ত্র দিয়ে ঝিনাই নদী থেকে বালু উত্তোলন করার ফলে ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যাদের বাড়ি ও আবাদি জমি নদী ভাঙনের কবলে পড়েছেন তারা এতই দরিদ্র যে অন্যত্র বাড়ি বানানোর অবস্থাও নেই। অনেকেই ঘর-বাড়ি রক্ষা করতে নদীর কিনারায় কলাগাছ ফেলে ও বাঁশের বেড়া দিয়ে ভাঙন ঠেকাতে চেষ্টা করছেন।

নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বানকাটা গ্রামের সায়েদ আলী, আয়নাল মিয়া, মালেকা বেগম, ফিরোজা বেগম, কানসেব পন বালা ও গোড়াইল গ্রামের জয়নাল মিয়া জানান, তাদের বসত বাড়ি ও আবাদি জমি বংশাই ও ঝিনাই নদীতে চলে গেছে। তাছাড়া বানকাটা গ্রামের বেলায়েত হোসেন, আবুল হোসেন, মুগদম আলী, লাল মোহন সরকার, পলান মিয়া, নিপেন রাজবংশী, কালু রাজবংশী, তইনা রাজবংশী, ও দলু মিয়ার ঘর-বাড়িসহ প্রায় ১০ একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

থলপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ঠিকাদার জাহিদ মিয়া, বারেক মিয়া ও ফতেপুর বাজারের ব্যবসায়ী জুয়েল তালুকদার বলেন, বানকাটা এলাকা থেকে চাকলেশ্বর পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা প্রতিবছরই নদী ভাঙনের শিকার হয়। কিন্তু ভাঙনরোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। জরুরি ভিত্তিতে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া উচিত। পাশাপাশি ভাঙনে ঘর-বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সরকারিভাবে জমি বরাদ্দ দিয়ে বাড়ি বানানোর সুযোগ দেয়ার দাবি জানান তারা।

চাকলেশ্বর গ্রামের বাসিন্দা হাবেল মৃধা, ফরিদ মিয়া, গোড়াইল গ্রামের জয়নাল মিয়া জানান, ভাঙনের কারণে তাদের যাতায়াতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। আবাদি জমি ও বাড়ি নদীতে যাচ্ছে। ভাঙন ঠেকাতে জরুরি পদক্ষেপ দরকার।

আশরাফুল উলুম হাফিজিয়া মাদরাসার পরিচালনা পরিষদের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন ও সম্পাদক আব্দুর রউফ জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে দেড় শতাধিক ছাত্র রয়েছে। কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে আসা বর্ষার পানি ঝিনাই নদীতে তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে মাদরাসাটি হুমকির মুখে পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড টাঙ্গাইল অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, বংশাই নদীতে ২১ কোটি টাকার ড্রেজিং চলমান রয়েছে। ড্রেজিং শেষে ডিপিটি প্রকল্প চালু করা হবে। এছাড়া মন্ত্রীর নির্দেশে গত বছরই ভাঙন এলাকায় এক কোটি টাকার উপরে ডাম্পিং কাজ করা হয়েছে। এ বছর কোনো নির্দেশনা না থাকায় কাজ শুরু হয়নি বলে তিনি জানান।

এস এম এরশাদ/এমএএস/এমকেএইচ