প্রবাস

চারদিকে শুধুই যুদ্ধের ভয়াবহতা

আকবর হোসাইন, সিরিয়া থেকে

Advertisement

তখন প্রায় ৭টা। বারান্দায় বসে বাচ্চাদের দুষ্টামি দেখছি। আমাদের বাসাটা এক বিধ্বস্ত শহরের মাঝখানে। চারদিকে তাকালেই চোখে পড়ে যুদ্ধের ভয়াবহতা। বসে বসে চিন্তা করছি মানবতার সেবার জন্য সূদুর বাংলাদেশ থেকে এখন সিরিয়ার এক বিধ্বস্ত শহরে। কোবানি তুরস্ক সীমান্তের একদম কাছেই। এই সীমান্ত দিয়ে নাকি আইএস যোদ্ধারা সিরিয়ায় ঢুকেছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত এখানে আসাটা সহজ ব্যাপার ছিল না, যা আজকে সবার সাথে শেয়ার করব।

কক্সবাজারে ৭ বছর ৩টা ভিন্ন অর্গানাইজেশনে মনোবিজ্ঞানী হিসবে কাজ করার পর ২০১৮ সালে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক একটা ‘আন্তর্জাতিক হিউম্যানিট্রিয়ান মেডিকেল অর্গানাইজেশনে’ মেন্টাল হেল্থ এক্সপাট হিসেবে যোগদান করি। প্রথম ফিল্ড অ্যাসাইনমেন্ট হিসবে ইথিওপিয়াতে ১২ মাস শেষ করে কাশ্মীরের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকি। কিন্তু ভিসা জটিলতায় এবং পাক-ভারত যুদ্ধের আনাগোনায় সেটা বাতিল হয়ে সিরিয়া মিশনের জন্য অফার পাই।

সিরিয়ান মানুষদের জন্য কাজ করার তীব্র বাসনা অনেক আগ থেকেই মনে থাকায় সঙ্গে সঙ্গে কনফার্ম করি। ভিসাসহ সবধরনের প্রস্তুতি শেষ করে ১৭ এপ্রিল আমস্টারডামের উদ্দেশ্য রওয়ানা হই। যে কোনো দেশে মিশনে যাওয়ার আগে আমাদেরকে আমস্টারডামের প্রধান অফিসে যেতে হয় ব্রিফিংয়ের জন্য। ব্রিফিং শেষ করে ১৯ এপ্রিল অস্ট্রিয়ান এয়ারলাইন্সে ইরবিল ইরাকে যাওয়ার কথা কিন্তু চেন ইন করতে গেলে তারা জানায় বাংলাদেশিরা তাদের বিমানে করে ইরবিল যেতে পারবে না।

Advertisement

মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। ইউরোপীয়ান সময় তখন সকাল ৫টা ৩০ মিনিটে অফিসও খোলেনি। ওয়াইফাই সংযোগ থাকাতে দ্রুত আমাদের ইন্ডিয়া অফিসে যোগাযোগ করি। এরপর অনেকক্ষণ ত্রিমুখী যোগাযোগের পর বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে ফেগাসাস বিমানের টিকিট পাঠানো হয়। বিমানে না উঠা পর্যন্ত মনের ভেতর ভয় লেগেই ছিল। অবশেষে কোনোরকম সমস্যা ছাড়া বিমানে বোর্ডিং করি। প্রচণ্ড ক্ষুধা পেটেই ভাবলাম, খাবারটা বিমানেই সেরে নেব। কিন্তু বিধিবাম। বিমানে আকাশে উঠার পর একটা ধাক্কা খেলাম আর দেখলাম যে এটা একটা উড়ন্ত হোটেল। কারণ বিমানবালাগুলো মেনু নিয়ে হকার স্টাইলে খাবার বিক্রি শুরু করল। খেতে তো হবেই, পরে ১২ ইউরো দিয়ে এক প্যাকেট খাবার কিনে কাঁচামরিচ দিয়ে (বিমানে উঠলেই আমার ব্যাগে কাঁচা মরিচ থাকে) মজা করে খেলাম। ইস্তানবুল সাবিহা এয়ারপোর্টে ২ ঘণ্টা বিরতি দিয়ে ইরাকের প্লেনে উঠলাম।

ইরবিল, ইরাকের এয়ারপোর্টে নেমেই চিন্তা করলাম এটা ইরাক তো! কারণ এয়ারপোর্টটা এত সুন্দর! সবাই এত আন্তরিক! আগে থেকে ইভিসা নেয়া ছিল তাই লাইনে দাঁড়িয়ে ইমিগ্রেশন শেষ করে বাইরে এসে আমাদের অফিসের গাড়ি করে গেস্ট হাউজের দিকে রওয়ানা করলাম। মসুল, বাগদাদ, নাজাফ লেখা ইনডিকেটরগুলো দেখে যুদ্ধের কথা মনে পড়তে শুরু করলো। ২০ মিনিটে গেস্ট হাউজে পৌঁছে ৩ ঘণ্টা বিরতি দিয়ে ডহুকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলাম। এই প্রথম দিনের আলোতে ইরাক দেখলাম। চারদিকে সবুজ আর সবুজ, ঠাণ্ডা বৃষ্টি হচ্ছে। একটু পরপর চেক পয়েন্ট। ইরাকের কথা মনে আসলেই আমাদের মনোপঠে মরুভূমির কথাই ভেসে উঠে কিন্তু এখানে তার উল্টো। এত সুন্দর একটা দেশে কীভাবে বোম্বিং করলো, হাজার হাজার মানুষ মারলো কথাগুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।

ডহুক শহরে ৩ দিন ছিলাম এবং এই ৩ দিনে ডহিক শহর ঘুরলাম। এত পরিচ্ছন্ন শহর আমি আর দেখিনি। আবাসিক কাড রেজিস্ট্রেশন করার জন্য একটা অফিসে গেলাম যাদের ব্যাবহার অমায়িক। সব জায়গার সুন্দরী অফিসার। রেসিডেন্স ভিসা দেওয়ার আগে সবার রক্ত পরীক্ষা করতে হয়। কেউ যদি পজিটিভ হয় তাহলে দ্রুত ফেরত পাঠিয়ে দেয়।

পরের দিন সকালেই রেসিডেন্সিয়াল ভিসা পেয়ে গেলাম এবং সিরিয়া যাওয়ার জন্য শেষ প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলাম। স্থল বর্ডার পার হয়েই আমাদের সিরিয়া ঢুকতে হবে। ২৩ এপ্রিল সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে ডহুক থেকে বর্ডারের উদ্দেশ্য রওয়ানা দিলাম। সঙ্গে আমার কাশ্মীরি কলিগ যে ছুটি থেকে ফিরছে। এ রকম কখনও কোনো বর্ডার পার হইনি, তাও আবার যুদ্ধের একটা দেশে ঢুকব। সবমিলে কেমন যেন মনে হচ্ছিল।

Advertisement

অবশেষে প্রায় ২ ঘণ্টা পর বর্ডারে পৌঁছালাম। মনে হচ্ছে ইরাকের সেরা সুন্দরীগুলোকে বর্ডার ইমিগ্রেশন অফিসে বসাইছে। কাশ্মীরি কলিগ আমাকে গাইড করে নিয়ে গেল এবং সুন্দরী অফিসার নাম জানতে চাইলেন পুরো নাম বলি মোহাম্মদ আকবর হোসেন। মোহাম্মদ নাম, বাংলাদেশ থেকে আসছি শুনে সে পারে না আমাকে জড়িয়ে ধরবে। খুবই আন্তরিকতা দেখালো। ইরাক সম্পর্কে আমাদের দেশের মানুষের আবেগের কথা তাকে জানালাম।

লাগেজগুলো খুলে চেক করে আলাদা নিয়ে গেল আর আমাদের জন্য বাসের ব্যবস্থা করল। ছোট্ট একটা নদীর ভাসমান ব্রিজের উপর দিয়ে ৫-১০ মিনিটেই সিরিয়ায় ঢোকা যায় কিন্তু ওইদিন ভাসমান ব্রিজটা ভেঙে যাওয়াতে আমাদের অন্য একটা স্থল ব্রিজের উপর দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সবুজের শেষ নাই কিন্তু এখন আমি আর সবুজ উপভোগ করছি না। ভয় লাগছে খুব, সিরিয়ায় ঢুকছি। কি হয় না হয়! ওদিকে গাড়ি চলতেই আছে। নতুন পথ হওয়াতে আমার কাশ্মীরি কলিগ ও কিছু বলতে পারছে না। ১ ঘণ্টা বাস চলার পর আমরা সিরিয়ার বর্ডারে পৌঁছাই। একটা লোহার দরজার সামনে গিয়ে বাসটা থামে। এর আগে যে কয়বার বাস চেক হয়েছে তার হিসেব নাই। ২০ মিনিট অপেক্ষার পর ২টা মাইক্রো গাড়িতে আমরা ১০ জন বিদেশি ছিলাম তাদের আলাদা করে তুলল। কি ঘটতে যাচ্ছে বুঝতে পারছি না। ফরেনারদের আলাদা করলো কেন। কিডনাফের সময় করণীয় কি সেটার উপর পড়াশোনা মাথায় ঘুরাপাক খাচ্ছিল। কাশ্মীরি কলিগককে জিজ্ঞেস করলাম কাহিনী কী, সে বলল আমি এই রুটে প্রথম, জানি না কী হতে যাচ্ছে।

এরপর সিরিয়া ঢুকলাম এবং গাড়ি চলতে শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর বললাম দূরে ধোঁয়া আর আগুন দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধ চলছে কিনা ওখানে! ভয়ে তো মরে যাচ্ছি অবস্থা। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করছি না। যতদূর যাচ্ছি ততই আগুন স্পষ্ট হচ্ছে। খুব কাছে এসেই খেয়াল করলাম ওটা সিরিয়ার তেলের খনি। চারপাশে অনেক ঢেকির মতো মেশিন উঠা নামা করছে। আমার কলিগ জানালো এগুলো তেলের পাম্প। খনি থেকে অনবরত তেল পাম্পিং হয়ে মেইন রিসার্ভারে জমা হয়।

সবুজের বুক চিরে চলছি তো চলছিই। নিরন্তর চলা। কতক্ষণ লাগবে, কোথায় যাচ্ছি কেউ কিছু বলতে পারে না। ড্রাইভার আরবি ভাষা ছাড়া বোঝে না তাই তাকে কিছু বলা যায় না। সামনে কোনো বাড়ি-ঘর শহর কিছুই নেই। মনে মনে চিন্তা করছি আমরা কি কিডনাপিং হচ্ছি! লা ইলাহা... মিনাজোয়ালেমিন... কয়েকবার পড়লাম। কিডনাফ হলে কি করতে হবে সেই নির্দেশনাগুলো মনে মনে চিন্তা করছিলাম।

প্রায় আরও ৯০ মিনিট পর আমরা সিরিয়ার ইমিগ্রেশন বর্ডারে এসে নামার পর আমার কলিজায় পানি আসলো। লাগেজ রিসিভ করে ফর্মালিটিজ সেরে অফিসের গাড়িতে আবার রওয়ানা দিলাম। এবার আর ভয় লাগছে না কারণ এখন আমরা আমাদের অফিসের গাড়িতে। উল্লেখ্য, ইরাক থেকে ৩ ঘণ্টা গাড়িতে করে সিরিয়া আসলাম, লাগেজগুলো আলাদা আনলো, তার জন্য একটি পয়সাও নেয়নি।

রাতটা কাটিয়ে পরদিন সকাল ৭টায় আমার মূল কর্মস্থলে রওয়ানা দিলাম। ৮ ঘণ্টার ভ্রমণ। যে ভ্রমণে একটুও ঘুমাতে পারবেন না, পায়ের উপর ঠ্যাং তুলতে পারবেন না, সানগ্লাস চোখে দিতে পারবেন না কারণ একটু পরপর আর্মস চেকপোস্ট। যেখানে বাহিনীগুলো দেখামাত্র গুলি করবে এ রকম আচরণ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এবার যাওয়ার পথে যত শহর ঘর বাড়ি চোখে পড়ছে সবগুলোতে যুদ্ধের ভয়াবহতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমেরিকার সৈন্যদের ব্যবহৃত আস্তানাগুলো ড্রাইভার দেখিয়ে দিয়ে বলেন এখানে আমেরিকার সৈন্য ছিল। লক্ষণীয় বিষয় হলো এ আস্তানার বিল্ডিংয়ের কোনো জানালা নেই।

৩ ঘণ্টা একটানা ভ্রমণ করে আমাদের একটা গেস্ট হাউজে এসে নাস্তা খেয়ে আবার রওয়ানা দিলাম। যত গাড়ি চলছে ততই যুদ্ধের আলামত বাড়ছে। অবশেষে আমার কর্মস্তলের শহরে পৌঁছলাম আর শহরে ঢুকতেই খেয়াল করলাম আমি একটা যুদ্ধের নগরীতে ঢুকছি। প্রায় প্রতিটা বিল্ডিংয়ে ধ্বংসের আলামত।

সিরিয়ার যে শহরে আমি আছি সেখানের কোনো কিছু সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করা নিষেধ। অনেক রেস্ট্রিকটেড একটা শহরে আমি থাকব ৬ মাস।

এমআরএম/পিআর