প্রবাস

চোখের সামনে স্বদেশি খুন, বিচারে আগ্রহ নেই কারও

কদিন আগেই দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে গাড়ি পার্কিং নিয়ে কথা-কাটাকাটির জের ধরে খুন হন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আজাদ মিয়া (৫০)। তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে আজাদকে গুলি করে হত্যা করে ওই ভারতীয়। হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিচার প্রক্রিয়ায় মধ্যে যেতে প্রবাসীদের কোনো উদ্যোগই লক্ষ্য করা যায়নি।

Advertisement

নিহতের বোনের ছেলে জানান, ঘটনার পর ভারতীয় নাগরিক পুলিশ স্টেশনে উপস্থিত হয়ে জানিয়েছেন আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুড়েছে। নিহতের পক্ষে কেউ অভিযোগ দায়ের না করায় বর্তমানে মুক্ত জীবনযাপন করছে খুনি। ঘটনাস্থলেই ২০-২৫ জন বাংলাদেশি গুলি চালানোর দৃশ্য দেখলেও মামলা কিংবা সাক্ষী হতে কেউ এগিয়ে আসেনি।

কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর কাছে মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তারা নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ নামও বলতে রাজি হননি। এমনকি ঘটনাস্থলে গুলি করার পরে চিৎকার চেঁচামেচি করার পরবর্তীতে গুলিবিদ্ধ আজাদকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে স্বদেশি খুনের ঘটনা নিয়ে সাক্ষী হয়ে মামলা করার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় লোডিয়ামের যে স্থানে ঘটনাটি ঘটে সেটি ভারতীয় অধ্যুষিত এলাকা। সেখানেই বাংলাদেশি আজাদ মিয়া হার্ডওয়ার স্টোর ব্যবসা করতেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আজাদকে সশস্ত্র ভারতীয় নাগরিক পরপর ৪ রাউন্ড গুলি করে চলে যায়।

Advertisement

ঘটনাস্থলের পাশেই স্থানীয় বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট বিসমিল্লাহ হোটেলের কর্মচারী আব্দুস শুকুর বলেন, ‘কেউ সাক্ষী হয়ে মামলা করার সাহস করছে না। সবাই ছোটখাট চাকরি করে। মামলা করলে কোর্টে আসা যাওয়ায় অনেক সময় নষ্ট হয়। তাছাড়া প্রচুর অর্থ খরচ হয়’।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ বসবাস করলেও বাংলাদেশি নাগরিকরাই সবচেয়ে বেশি অপমৃত্যুর শিকার হয়। এর বড় কারণ, দুর্ঘটনার পরে আইনি সংস্থাগুলোর কাছে কেউ যেতে চাই না। ফলে অপরাধীদের শাস্তিও হয় না। বাংলাদেশিরা নিজেদের মধ্যে বিভক্তিসহ নানা কারণে এসব বিষয়ে চরম উদাসীনতার পরিচয় দিয়ে আসছে।

সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকায় কয়েকশ বাংলাদেশি গুম, খুন হত্যার শিকার হলেও বিচার চাওয়া বা পাওয়া কোনো রেকর্ড নেই। দেশটিতে কোনো বাংলাদেশি অপমৃত্যুর শিকার হলে শুধুমাত্র মরদেহ দেশে পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করে বাংলাদেশি।

মামলা হলেও তদারকির অভাবে বিচারকার্য ঝুলে থাকে আর অভিযুক্ত জামিন নিয়ে মুক্তভাবে জীবনযাপন করে। এসব কারণে দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশিরা সহজ শিকারে পরিণত হয়েছে।

Advertisement

এ বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রবাসীদের সংগঠন বাংলাদেশ পরিষদের সহ-সভাপতি শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে বাংলাদেশিদের সঙ্গে এমন ঘটনা অহরহ ঘটে চলছে। দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করা ঠিক সম্ভব হয়ে উঠছে না। মামলা করে গ্রেফতার করানো হয়ছিল, শেষ পর্যন্ত মামলা চালিয়ে না নেওয়ায় চূড়ান্ত রায় হয়নি’।

তিনি বলেন, ‘একটা ঘটনা নিয়ে কাজ করতে করতে আরও নতুন নতুন ঘটনা সামনে চলে আসছে। সবাই মিলে কাজ করলে হয়তো আমারা অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারব। তবে আমাদের আরও বেশি সতর্ক হয়ে চলাফেরা করা উচিত’।

শফিকুল ইসলাম বলেন, কমিউনিটিকে বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছে। যে কারণে সাধারণ প্রবাসীরা অসহায় নিরূপায়, এসব বিষয়ে দূতাবাসকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে আমরা সাধারণ মানুষরা এগিয়ে আসতে সাহস পাব।

দক্ষিণ আফ্রিকার বেকারত্ব এবং অপরাধ প্রবণতা: নব্বই এর দশক থেকে বাংলাদেশ থেকে মানুষ দক্ষিণ আফ্রিকায় কাজের সন্ধানে যেতে শুরু করে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বৈধভাবে দেড় লাখের মতো বাংলাদেশি রয়েছেন।

দেশটিতে এখনও সাদা এবং কালো মানুষদের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ব্যাপক এবং ভূমির মালিকানা নিয়েও রয়েছে চরম অসন্তোষ। সেই সঙ্গে গত কয়েক বছর ধরে দেশটিতে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে, স্থানীয়দের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩৮ শতাংশ। কর্মসংস্থান না থাকায় কেপটাউন এবং জোহানসবার্গসহ বড় শহরগুলোর অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া দেশটির একটি বড় সমস্যা।

এমআরএম/পিআর