ভ্রমণ

শুভলং ঝরনা ও পাহাড়ি জীবনের খোঁজে

আবু আফজাল সালেহ

Advertisement

ভোরেই পৌঁছলাম রাঙ্গামাটির রিজার্ভবাজারের বাস স্টেশনে। এরপর ঝটপট নাস্তা সেরে নিলাম। সিএনজি ভাড়া করে গেলাম তবলছড়ি পর্যটন মোটেলের শেষ প্রান্তে, ঝুলন্ত ব্রিজের ঠিক মুখে। ২০ টাকার টিকিট কেটে ঢুকতে হবে। এ ঝুলন্ত ব্রিজই রাঙ্গামাটির প্রতীক। কাপ্তাই হ্রদের দুপাশের পাহাড়ের সঙ্গে সেতুবন্ধন করেছে ছোট্ট ব্রিজটি। ব্রিজটি ঘিরেই রয়েছে বিভিন্ন রাইড। নৌকা ভ্রমণের ব্যবস্থা।

এখান থেকে দরদাম করে ট্রলার বা স্পিডবোট ভাড়া করে ঘুরতে পারেন শুভলং ঝরনা, আর্মি ও আনসার ক্যাম্প। বিভিন্ন ভাসমান হোটেলেও যেতে পারবেন। ঘণ্টাখানেক এখানে অবস্থান করে মূল শহরে গেলাম। রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রামের সড়কপথ ধরে উপজাতিদের ছোট ছোট বাজার। বিভিন্ন ফল-মূল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা করছে বাঙালি ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। দারুণ সম্প্রীতির বাংলাদেশ!

কাছাকাছি রাজবাড়ি দেখলাম। ভেতরে প্রবেশ করায় নিষেধাজ্ঞা আছে। প্রায় বেলা ১১টার দিকে রিজার্ভ বাজারের লঞ্চঘাটের দিকে রওনা দিলাম সিএনজিতে। ১২ টাকা ভাড়া। নেমেই ৫০০ গজের মতো হেঁটে লঞ্চঘাট। লঞ্চঘাট থেকে ১৬০০ টাকায় ছোট্ট একটি ট্রলার ৬-৭ ঘণ্টার জন্য চুক্তি করলাম। শুরু হলো সবচেয়ে রোমাঞ্চকর কাপ্তাই হ্রদে বোট ট্যুর। দেশের বৃহত্তম ও বিশ্বের অন্যতম বড় কৃত্রিম হ্রদ ভ্রমণ! রোমাঞ্চের ডালপালা মেলে দিলো। চার জনই রোমাঞ্চিত।

Advertisement

লঞ্চঘাট থেকে কয়েক মিনিট যেতেই মনে হয় বিশাল সাগরে এসে পড়লাম। চারিদিকে অথৈ পানি। একটু দূরে ছোট ছোট দ্বীপ। কিছুদূর যেতেই পাহাড় দেয়াল। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ছোট ছোট বাসা। সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে আমরা চার জন ছোট্ট ট্রলার নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। জেলেদের মাছধরার দৃশ্য আর মাথার ওপর বিভিন্ন পাখিদের ওড়াউড়ি, কী মনোরম! আহা, কী দৃষ্টিসুখ! আর কিছুদূর যেতেই সোনা রঙের মূর্তি দেখতে পেলাম। মাঝি বললেন, এটিই স্বর্ণমন্দির। নেমেই গেলাম। দেখলাম। উপজাতিদের সাথে কথাও বললাম।

আবার উঠলাম ট্রলারে। এবার কাপ্তাই হ্রদের পানিরাশি সবুজ। চারিদিকের সবুজ পাহাড়ের প্রতিচ্ছায়ায় এমন। পেরিয়ে যাচ্ছি করমজল উপজেলা। সবুজ পাহাড়ের মোহনা! কী নান্দনিক! এমন মোহনা প্রায়ই দেখা যাচ্ছে। চোখ টেনে নিচ্ছে; মনও। প্রায় ৪৫ মিনিট পানিভ্রমণ শেষে নান্দনিক জায়গা। হ্রদের অংশ ঢুকে পড়েছে পাহাড়ের ভেতর। মাঝি বললেন, এটিই শুভলং ঝরনা; মায়াবী ঝরনা। তবে শীতকালে পানি একেবারেই কম। বর্ষাকালে কী যে পাহাড়ি রূপ! একটু চোখ বুলিয়ে নিলাম। নামলাম। ২০ টাকার টিকিট কেটে ঝরনায় প্রবেশ করতে হয়। এখানে ক্যান্টিন আছে। যে কেউ হালকা চা-নাস্তা করে নিতে পারেন।

আবার যাত্রা শুরু পাহাড় উপত্যকার জলপথ দিয়ে। আরও ১০ মিনিট যেতেই ছোট্ট বাজার, আর্মি ক্যাম্প। বলে রাখি, এরপর যেতে হলে সেনাবাহিনীর অনুমতি লাগবে। এখানকার সবকিছুই সেনাসদস্যরা নিয়ন্ত্রণ করেন। অনুমতি নিয়ে বারবার মোহনা ও দ্বীপ পাশ কাটিয়ে প্রায় ২০ মিনিট পরে বড় স্থাপনা দেখতে পাচ্ছি। মাঝি বললেন, এটা শুভলং আনসার ক্যাম্প। পাহাড়ের গায়ে জল-পাহাড় বেষ্টিত ক্যাম্পটি দেখতে সুন্দর।

এবার ফেরার পালা। বিকাল ও গোধূলিবেলায় আধো-আধো আলোতে কাপ্তাই হ্রদের কী যে দৃশ্য! ভুলে যাওয়ার নয়। মাঝপথেই সন্ধ্যা হয়ে গেল। জেলেরা আলো জ্বালিয়ে মাছ ধরছে। দ্বীপগুলোয় আলো জ্বলছে। মাথার ওপর রাতজাগা পাখিদের ওড়াউড়ি। দ্বীপগুলো ও হ্রদের পার্শ্ববর্তী রাঙ্গামাটি শহর যেন আমেরিকান কবির নিউইয়র্ক কবিতার মতো বিল্ডিংগুলো যেন made of glass and lights দিয়ে তৈরি। প্রায় ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিটি রোমাঞ্চকর জলভ্রমণ শেষে রিজার্ভ বাজারের লঞ্চঘাটে এসে পৌঁছলাম।

Advertisement

যাতায়াত: রাঙ্গামাটি শহরের রিজার্ভ বাজার সংলগ্ন লঞ্চঘাট থেকে লঞ্চ ভাড়া করতে হবে। ছোট-বড়ভেদে ১২০০ টাকা থেকে শুরু। ১০-২০ জন ভ্রমণ করা যাবে। কোন কোন স্পটে যাবেন, তা আগেই ঠিক করে নিতে হবে। স্পিডবোটেও যেতে পারবেন। ৫-৬ জনের ভাড়া ২০০০ টাকা থেকে শুরু। তার আগে ট্রেন বা বাসে চট্টগ্রাম যেতে হবে। অক্সিজেন মোড় থেকে পাহাড়িকা বা শান্তি পরিবহনে ১২০ টাকা ভাড়া। পাহাড়ের মধ্যদিয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন রাঙ্গামাটির রিজার্ভ বাজারে। একটু এগিয়ে গিয়ে লঞ্চঘাটে দরদাম করে লঞ্চ বা স্পিড বোট ভাড়া করে কাপ্তাই ভ্রমণ করুন। এ ছাড়া ঢাকা থেকে কিছু পরিবহন ৯-১০ ঘণ্টা সময়ে রাঙ্গামাটি পৌঁছে দেবে। এসি-নন এসি ভেদে ভাড়া ৬৫০ টাকা থেকে শুরু।

থাকা ও খাওয়া: রিজার্ভ বাজারসহ শহরের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন বাজেটের আবাসিক ও খাওয়ার হোটেল পাবেন। এছাড়া উপজাতিদের বাড়িতে থাকতে ও খেতে পারবেন। পর্যটন কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রিত মোটেল বা আবাসনে থাকতে ও খাওয়া-দাওয়া করতে পারবেন। খরচ তুলনামূলক একটু বেশি হতে পারে।

নৌকা বা স্পিড বোট ভাড়া: রাঙ্গামাটি শহরের রিজার্ভ বাজারের লঞ্চঘাটে নৌকা পাওয়া যাবে। দরদাম করতে হবে। স্পিড বোটে ৩-৪ হাজার টাকা।

পাহাড়ি বাজার: সকালের দিকে শহরের রাস্তায় ছোট ছোট ভাগ করে পাহাড়িরা ফল-মূল ও কাঁচাবাজার নিয়ে বসে। এ দৃশ্য মনোরম। শহরের বিভিন্ন দোকান, উপজাতি অনেক বাড়ি থেকে পোশাক ও হস্তশিল্প সামগ্রী কেনাকাটা দারুণ ও উপভোগ্য হবে।

এসইউ/এমএস