প্রবাস

বিশ্ব তারকাদের মাদকাসক্তি ও করুণ পরিণতি

সর্বকালের সেরা ফুটবল খেলোয়াড় কে? বয়স ভিত্তিতে প্রশ্ন করলে অনেকে বলবে পেলে, অনেকে বলবে ম্যারাডোনা, নতুন প্রজন্ম বলবে রোনাল্ডো, ইব্রাহিমোবিস বা মেসি। তবে যেই যা বলুক ম্যারাডোনাকে সেই পুরস্কারের উষ্ণ প্রার্থী হিসাবে উপেক্ষা করা অসম্ভব।

Advertisement

বিভিন্ন যুগের খেলোয়াড়দের মধ্যে তুলনা করা কঠিন। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার মতো আর কোনো খেলোয়াড় আধিপত্য বিস্তার করতে পারেননি এখন পর্যন্ত। ম্যারাডোনা না থাকলে আর্জেন্টিনা সে বছর বিশ্বকাপ জিততে পারতো না।

ম্যারাডোনার শক্তি ও তার কৌশল ছিল অবিশ্বাস্য। যেভাবে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বলটি নিয়ে সামনে উত্তীর্ণ হয়ে গোলটি করেছিলেন তা হবে সম্ভবত সর্বকালের সেরা ড্রিবলিং এবং সেরা গোল। পেলে, মেসি, রোনাল্ডো এবং ইব্রাহিমোবিসও অনেক গোল করেছেন। সেক্ষেত্রে একের সঙ্গে অন্যের তুলনা করা ঠিক হবে না। যেমন ম্যারাডোনা একজন মিডফিল্ডার এবং পেলে একজন স্ট্রাইকার ছিলেন। ম্যারাডোনা বুয়েনস আইরেসের একটি দরিদ্র পরিবারে ১৯৬০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার কৈশোরেই ফুটবল প্রতিভার বিকাশ ঘটে। মাত্র ১৬ বছর বয়সী ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনার বোকা জুনিয়ার্সে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন।

ম্যারাডোনা ১৯৮১ সাল অবধি বোকা জুনিয়ার্সে খেলেছেন এবং ১১৬ খেলায় ১৬৬ গোল করেছেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তার জাতীয় দলে অভিষেক ঘটে। শেষ মুহূর্তে জাতীয় দলের অধিনায়ক ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপের দল থেকে বাদ দিয়েছিলেন।

Advertisement

আর্জেন্টিনা ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জিতলেও ম্যারাডোনা খুব তিক্ত ছিলেন। ম্যারাডোনা তখন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমিও পেলের মতো ১৭ বছর বয়সী হিসেবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে পারতাম। তিনি আরও বলেছিলেন যে, তিনি আর কখনো জাতীয় দলে খেলবেন না। রাগ উধাও হয়ে যায় ফুটবলের প্রতি তার অনুরাগের ছোঁয়ায়। তিনি সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন।

পরের বছর আর্জেন্টিনা জুনিয়র বিশ্বকাপ জিতেছিল এবং ম্যারাডোনা টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন। তখন ইউরোপের বড় ক্লাবগুলো এই সুপার ফুটবলারের দিকে গুরুত্ব সহকারে তাদের চোখ মেলে।

১৯৮২ বিশ্বকাপের আগে ম্যারাডোনা বার্সেলোনার হয়ে সই করেছিলেন। ১৯৭৮ বিশ্বকাপে দল থেকে বাদ যাবার হতাশার প্রতিশোধ নিয়েছিলেন ১৯৮৬ সালে। আর্জেন্টিনা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতেছিল এবং ম্যারাডোনা অতিমানবীয় ফুটবল খেলেছিলেন। প্রায় একাই তিনি আর্জেন্টিনাকে জয়ের দিকে নিয়ে যান।

গোটা বিশ্ব তখন ম্যারাডোনাকে সেরা খেলোয়াড় হিসাবে প্রশংসা করেছে। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার আশা ছিল জয়ী হবার। কিন্তু জার্মানির সেই দুর্দান্ত গোলকিপার ওলিভার খানের কারণে ফাইনালে হেরে যায় পশ্চিম জার্মানির কাছে। বিশ্বকাপ ১৯৯০ সালের পরে ম্যারাডোনার ক্যারিয়ার ধূসর হতে শুরু করে। ১৯৯১ সালে তিনি প্রথমবার ডোপিং-এ ধরা পড়েন এবং ১৫ মাসের জন্য খেলা থেকে স্থগিত হন। অতিরিক্ত নেশার পাশাপাশি অন্যান্য শারীরিক সমস্যাতেও পড়েছিলেন ম্যারাডোনা। তবে ডোপিং কেলেঙ্কারির আগেই ম্যারাডোনাকে ঘিরে নেতিবাচক প্রচার (মাদকের অপব্যবহার ইত্যাদি) ছাড়াও আইনি ঝামেলায় জড়ান।

Advertisement

১৯৯৪ বিশ্বকাপের আগে ৩৩ বছর বয়সী ম্যারাডোনা জাতীয় দলে ফিরেছিলেন। আর্জেন্টিনা প্রথম দুটি ম্যাচে দুর্দান্ত পারফর্ম করেছিল এবং ম্যারাডোনা এমন একটি খেলা দেখিয়েছিলেন যা চমকে দিয়েছিল বিশ্বকে। কিন্তু তারপরে তিনি নতুন ডোপিং ঝামেলায় আটকে গেলেন এবং আবার খেলা থেকে স্থগিত হন। সুতরাং তার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়, যা ছিল অতুলনীয় এক ফুটবল খেলোয়াড়ের জন্য একটি করুণ পরিণতি। ১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপ থেকে নাটকীয় এবং লজ্জাজনক বিদায়ের পর ম্যারাডোনা আবার ফিরেছিলেন এই প্রতিযোগিতায়। ২০০০ সালের পর থেকেই অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধির জন্য তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকেন। ২০০৪ সালে একবার হৃদরোগেও আক্রান্ত হন। ২০১০ সালে তিনি কোচ ছিলেন আর্জেন্টিনার। আরও একবার তার জাদু দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন সারা পৃথিবীর ভক্তরা।

কিন্তু এবারও অপ্রাপ্তিই সঙ্গী হয় তার। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ৪-০ গোলে চূর্ণ করে জার্মানি। এরপরে তিনি বিশ্বকাপে হাজির থেকেছেন আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়ে। কিন্তু ১৯৮৬ সালের জাদু আর ফিরে আসেনি। বিশ্বকাপের ট্রফি ওঠেনি বুয়েনাস আইরেসগামী বিমানে।

ম্যারাডোনার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে একাধিক নেতিবাচক মতামত রয়েছে বিশেষত তার ক্যারিয়ারের শেষের দিকে। একটি ঘটনা যা খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল ১৯৮৬ সালে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম গোল যা ম্যারাডোনা হাত দিয়ে করেছিলেন। অন্যদিকে সমস্ত ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির শিকারে পরিণত হয় তার সকল সাফল্য।

তবে তার সকল সমালোচনা তাকে বড় তারকা হয়ে উঠতেও সাহায্য করেছে। যুগে যুগে নানা বিষয়ের ওপর বিশ্ব তারকার আগমন হয়েছে। শুরুটা কঠিন, মাঝখানে খ্যাতি, শেষ সময়টা করুণ। বেশিরভাগই মাদকাসক্ত হয়ে অন্ধকারে ডুবে যায়। আইনি ঝামেলার পাশাপাশি মাদকাসক্তি পিছু ছাড়ে না এই তারকাদের।

মাদকের ওপর ম্যারাডোনার নির্ভরতা কেবল তার স্বাস্থ্যের ওপরই প্রভাব ফেলেনি, তার ক্যারিয়ার এবং আর্থিক অবস্থানকেও প্রভাবিত করেছিল। কলম্বিয়ার কুখ্যাত মাদক মাফিয়া পাবলো এসকোবারের সঙ্গেও হয়েছে তার মেলামেশা, করেছেন পার্টি জেলের ভিতরে সঙ্গিনীদের নিয়ে।

অনেক ফুটবল খেলোয়াড়, অভিনেতা, বেশিরভাগ শিল্পপতি, অনেক গায়ক, লেখক, দরিদ্র অর্থনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আগত অনেক নব্য ধনী নানা ধরনের মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। সাফল্য, অর্থ, বন্ধুবান্ধব এসবের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে না, যা শেষে দুর্দশায় পরিণত হয় এবং নিজের ও নিজের পরিবারের জন্য হয় ট্র্যাজেডি।

দুঃখের বিষয়, ধনী বাবা-মায়ের বাচ্চাদের মধ্যেও একই ধরনের আসক্তি দেখা যায়। মাইকেল জ্যাকসন, ম্যারাডোনা সেই দলের মধ্যেই পড়ে। পৃথিবীর সব মানুষের ভালোবাসা পাওয়া সত্ত্বেও মাদকাসক্তি, কিন্তু কেন? বড় জানতে ইচ্ছে করে। আমাদের সবাইকেই এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে।

ম্যারাডোনাও চলে গেলেন। তবে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন এবং যুগে যুগে তার ক্রীড়া নৈপুণ্য ভবিষ্যৎ ফুটবল খেলোয়াড়দের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।

এমআরএম/পিআর