যশোরে ‘সেকেন্ড চান্স এডুকেশন কর্মসূচি’ নিয়ে অভিযোগ তদন্তের প্রেক্ষিতে টাকা ছাড় না হলেও থেমে নেই প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত এনজিওর অর্থবাণিজ্য। সুপারভাইজার এবং শিক্ষক নিয়োগের নামে গোপন অর্থবাণিজ্য অব্যাহত রেখেছে ‘দিশা সমাজ কল্যাণ সংস্থা’টি। এমনকি ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের জরিপেও অনিয়মের তথ্য মিলেছে। ইতোপূর্বে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে সত্যতাও পেয়েছে তদন্ত কমিটি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গোটা দেশের ঝরে পড়া শিশু কিশোরদের শিক্ষার আওতায় আনতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদফতর উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো’র আওতায় সেকেন্ড চান্স এডুকেশন (সাব-কম্পোনেন্ট ২.৫’ আউট অব স্কুল চিল্ড্রেন-(ওওএসসি) প্রোগ্রাম, পিইডিপি-৪) কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রত্যেক জেলা থেকে একটি লিড এনজিও নির্বাচন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় নির্ধারিত এনজিও এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। এনজিওগুলোর আবেদনের প্রেক্ষিতে যশোরে কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ২০১৯ সালে ৭টি এনজিওকে প্রাথমিকভাবে শর্টলিস্ট তালিকায় রাখা হয়। সাতটির মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থান ছিল দিশা সমাজকল্যাণ সংস্থার। যশোর জেলায় এই প্রকল্প ব্যয় অন্তত অর্ধশত কোটি টাকা।
সূত্র মতে, যশোরে কর্মসূচি বাস্তবায়নে দিশা সমাজ কল্যাণ সংস্থাকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হলেও সংস্থার প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ সক্ষমতা বিচারে সাতটি ক্রায়টেরিয়া নির্ধারণ করা হলেও এর অধিকাংশেই দিশা নেই।
পাশাপাশি অভিযোগ ওঠে, দিশা সমাজ কল্যাণ সংস্থা চূড়ান্ত অনুমোদনের আগেই কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। অনুমোদনের আগেই একাধিক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সুপারভাইজার ও শিক্ষক নিয়োগের নামে বিস্তর অর্থ বাণিজ্যেরও অভিযোগ পাওয়া যায়।
‘অযোগ্যতা ও অনিয়মের’ অভিযোগ তুলে ধরে একাধিক সংস্থা ও ব্যক্তি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। এ নিয়ে গত ২৯ নভেম্বর জাগো নিউজে সংবাদও প্রকাশিত হয়।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ৫ ডিসেম্বর উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সহকারী পরিচালক মো. শাহারুজ্জামান তদন্তে যশোরে আসেন। অভিযোগ তদন্তের পর তিনি ঢাকায় ফিরে প্রতিবেদনও দাখিল করেছেন।
উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সহকারী পরিচালক মো. শাহারুজ্জামান জানান, অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে কথা বলেছেন। চাকরি দেয়ার কথা বলে টাকা নেয়ার প্রমাণও মিলেছে। এছাড়া সক্ষমতার ঘাটতি নিয়েও তদন্ত হয়েছে। পুরো প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দফতরে জমা দেয়া হয়েছে। এরপর দিশা সমাজকল্যাণ সংস্থাকে শো’কজও করা হয়েছে।
এদিকে দেশের বিভিন্ন জেলায় এই প্রকল্পের অর্থ ছাড় হলেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় যশোরে তা আটকে আছে। এতকিছুর পরও দিশা সমাজকল্যাণ সংস্থার অর্থবাণিজ্য থেমে নেই।
অভিযোগ উঠেছে, জেলায় শতাধিক সুপারভাইজার ও ৫ শতাধিক শিক্ষক নিয়োগের জন্য তারা প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, শিক্ষক প্রতি ১০ থেকে ২০ হাজার এবং সুপারভাইজার প্রতি ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে। সবমিলিয়ে অন্তত অর্ধকোটি টাকা বাণিজ্যের প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে সংস্থাটি। অর্থবাণিজ্যের বিষয়টি আলোচনায় থাকায় সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাদের লোক নিয়োগের জন্য দিশা সমাজকল্যাণ সংস্থাকে চিঠিও দিয়েছে। এসব চিঠির একাধিক কপিও এই প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।
সূত্র আরও জানিয়েছে, সেকেন্ড চান্স এডুকেশন কর্মসূচির জন্য জেলায় জরিপ কার্যক্রমও চালিয়েছে দিশা সংস্থা। জরিপে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের তালিকা করার কথা থাকলেও অনেক এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও এই তালিকায় রাখা হয়েছে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে ‘দিশা সমাজ কল্যাণ সংস্থা’র নির্বাহী পরিচালক রাহিমা সুলতানাকে বারবার ফোন দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। বক্তব্য চেয়ে মুঠোফোনে এসএমএস পাঠালেও তিনি প্রতিউত্তর করেননি।
তবে এর আগে অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেছিলেন, যারা নিয়োগ পাচ্ছেন না তারাই এ ধরনের অভিযোগ করছেন। কর্মসূচি বাস্তবায়নে তাদের সক্ষমতা আছে।
সেকেন্ড চান্স এডুকেশন নিয়ে কথা হয় যশোর জেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো’র সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ বজলুর রশিদের সঙ্গে।
তিনি জানান, কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিকভাবে দিশা সমাজকল্যাণ সংস্থা নির্বাচিত হয়। যদিও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায় মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত হয়েছে। তবে তদন্তের পর কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা তিনি জানেন না। আর যশোরের জন্য প্রকল্পের অর্থ ছাড় হয়নি বলেও তিনি নিশ্চিত করেছেন। দিশা সমাজকল্যাণ সংস্থা’র অনিয়ম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার কাছে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ যাওয়ায় মন্ত্রণালয় থেকেই তদন্ত হয়েছে। আর এনজিও নির্ধারণের ক্ষেত্রেও তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ঢাকা থেকেই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে।
মিলন রহমান/এফএ/জিকেএস