সদর উপজেলার ১২৫নং কেজি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৬নং আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শহরের প্রাণকেন্দ্র চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালে ঠিক উল্টোদিকে অবস্থিত। দুই স্কুলের খেলার মাঠ একটি। সেটি খুব বেশি বড় না হলেও একেবারে ছোট নয়। কিন্তু পুরো মাঠের কোথাও ভাষা শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ শহীদ মিনার নেই। হয়তো এতদিনে এ স্কুল থেকে পড়ালেখা শেষে কেউ সচিব কেউবা সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন।
যে ভাষায় তারা কথা বলতে শিখেছেন, সেই ভাষার জন্য ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন বীর ভাষাসৈনিকেরা, তাদের শ্রদ্ধা নিবেদনের ন্যূনতম স্মৃতিস্তম্ভটিও নেই এ দুই বিদ্যালয়ে।
শুধু এ দুটিতেই নয় চাঁদপুর জেলার এক হাজারেরও বেশি বিদ্যালয়ে নেই শহীদদের স্মৃতির স্মারক শহীদ মিনার। ফলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে দূরে অন্য শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে হয়।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, আট উপজেলায় মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে এক হাজার ১৫৬টি। এরমধ্যে এক হাজার ৯ বিদ্যালয়েই নেই শহীদ মিনার।
সূত্র জানায়, চাঁদপুর সদর উপজেলার ১৭২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৬৬, হাইমচর উপজেলার ৭২ বিদ্যালয়ের ৬১, কচুয়ার ১৭১টির মধ্যে ১৪০, হাজীগঞ্জের ১৫৭টির মধ্যে ১২৫, শাহারাস্তির ১০১টির মধ্যে ৯০, ফরিদগঞ্জের ১৯০টির মধ্যে ১৬২, মতলব দক্ষিণে ১১৩টির মধ্যে ১০৭ এবং মতলব উত্তরের ১৮০ বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৫৮ প্রাথমিক বিদ্যালয়েই নেই শহীদ মিনার।
এদিকে শহীদ মিনার স্থাপন না করার বিষয়কে সদিচ্ছার অভাব বলে মন্তব্য করেন জেলার সচেতন মহল। অনেকে বলেন বিদ্যালয়ের সভাপতি এবং প্রধান শিক্ষিকের যৌথ উদ্যোগেও নির্মাণ করা যায় শহীদ মিনার। কিন্তু উদ্যোগ না নেয়ায় বেশিরভাগ বিদ্যালয় তা নির্মাণ সম্ভব হয়নি।
৩নং বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গীতা রাণী রায় জাগো নিউজকে বলেন, জায়গা সঙ্কটের কারণে বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ করতে পারিনি। তবে এ বছর নির্মাণ করব।
শহীদ মিনার না থাকায় বিষয়ে ৬নং আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহজাদী সাবিহা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, স্কুল প্রাঙ্গণে শহীদ মিনার থাকলে কৌতূহলবশত অনেক কিছুই শিক্ষার্থীরা জানতে পারে। এতে ভাষাশহীদদের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ও সম্মান বাড়ে। শিক্ষার্থীদের পাঠ্যগতভাবে ঐতিহ্য এবং ইতিহাস সম্পর্কে শিখাচ্ছি কিন্তু এরপরও একটি শহীদ মিনার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে থাকলে ভাষা শহীদদের অজানা সব তথ্য জানার আগ্রহ বাড়বে।
ধানুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান জানান, শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য এলাকার বিত্তবানদের কাছেও আবেদন করেছি। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। তাই প্রতি বছর বছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে অস্থায়ীভাবে শহীদ মিনার স্থাপন করে ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান জানানো হয়।
১২৫নং কেজি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফাতেমা বেগম জাগো নিউজকে জানান, শহীদ মিনার নির্মাণের আবেদন করেছি। বর্তমানে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করি।
কবি ও প্রাবন্ধিক মুহাম্মদ ফরিদ হাসান জাগো নিউজকে বলেন, হাজার বছরের ইতিহাসের মধ্যে ভাষা আন্দোলন অন্যতম। এ আন্দোলনের যে গৌরবগাথা সেই ত্যাগ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে শহীদ মিনার বড় ভূমিকা পালন করে। জেলার এক হাজার ৯ বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নেই বিষয়টি বিস্ময়কর। তবে প্রত্যাশা করি একটি বিদ্যালয়ও যেন শহীদ মিনার ব্যতীত না থাকে।
তিনি আরও বলেন, যে জাতি তাদের ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে ধরে রাখে না সে জাতির অগ্রগতি কতটুকু সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
সচেতন নাগরিক কমিটি চাঁদপুর জেলা শাখার সভাপতি অধ্যক্ষ মো. মোশাররফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, একটি স্মৃতিস্তম্ভ যখন চোখের সামনে থাকে তখন আবেগ ও অনুভূতি জাগ্রত থাকে। তাই প্রতিটি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার থাকা জরুরি এবং সরকারি উদ্যোগে সেগুলো নির্মাণ হবে বলে আশা করি।
চাঁদপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. সাহাব উদ্দিন বলেন, চাঁদপুরের অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই নেই শহীদ মিনার। তবে সরকার ইতিমধ্যে প্রত্যেক স্কুলে সৌন্দর্য বর্ধিত স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে প্রকল্প হাতে নিয়েছে। আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যালয়ের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। আশা করছি খুব শিগগিরই শহীদ মিনার নির্মাণ কাজ শুরু হবে।
নজরুল ইসলাম আতিক/এএইচ/এএসএম