আবু নাইম। গাজীপুরের শ্রীপুরের বিধায় বাতেনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন ৯ বৎসর ধরে। চাকরিকালীন এই সময়ের মধ্যে তিনি দুই বছর বিদ্যালয়ে যাননি, নেননি কোনো ছুটিও। এত দীর্ঘসময় তিনি কোথায় ছিলেন তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জাগো নিউজের অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাকরিতে আনসার-ভিডিপি কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে ২০১০ সালেল ১৯ অক্টোবর শ্রীপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসে যোগদান করেন আবু নাইম। যোগদানের পর কাগজপত্র জমা দিলে তার কোটার সনদে অসামাঞ্জস্যতা উঠে আসে। তৈরি হয় নানা ধরনের জটিলতা। এমনকি মামলাও হয় দুর্নীতি দমন কমিশনে।
অভিযোগ রয়েছে, গাজীপর জেলা শিক্ষা অফিসে কর্মরত তৎকালীন অফিস সহকারী হারুন মল্লিকের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে আবার চাকরি ফিরে পান নাইম। এরপরই উঠেপড়ে লাগেন চাকরি টিকিয়ে রাখতে। অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে টাকার বিনিময়ে আরেকটি সনদের ব্যবস্থা করেন।
এভাবেই চলে যায় দুই বৎসর। একটা সময় এসে রহস্যজনকভাবে দুর্নীতির মামলাও প্রত্যাহার হয়। পরে ২০১২ সালের ২ জানুয়ারি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের এক আদেশে উত্তর পেলাইদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন আবু নাইম। সেখান থেকেই তিনি বেতনভাতা উত্তোলন শুরু করেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, চাকরিতে নিয়োগ লাভের পর নানা জটিলতায় দুই বছর কোনো বিদ্যালয়ে যোগদান করতে পারেননি আবু নাইম। অথচ শিক্ষা বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে দুই বছর আগেই তার চাকরি স্থায়ী করেন। দীর্ঘদিন পর এসে সেই দুই বছরের বেতনভাতার জন্য ও উচ্চতার স্কেলের জন্য আবেদনও করেছেন তিনি। এ বিষয়ে শিক্ষা বিভাগও প্রস্তুতি নিয়েছি বলে জানা গেছে।
২০১০-২০১২ এই দুই বছর তিনি কোনো বিদ্যালয়ে যোগদানের সুযোগ না পেলেও সার্ভিস বুকে উল্লেখ রয়েছে, ওই সময় তিনি শ্রীপুর মমতাজিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। যদিও ওই বিদ্যালয়ে তার চাকরির বিষয়ে তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, শ্রীপুরে সবাই জানেন চাকরির জটিলতা তৈরি হওয়ায় দুই বছর বাড়িতেই ছিলেন আবু নাইম।
শ্রীপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, চাকরির আবেদনের সময় আবু নাইম ভুয়া আনসার-ভিডিপি সনদ দিয়ে আবেদন করেন। চাকরি লাভের পর কাগজপত্র জমা দিতে এসে এ বিষয়টি ধরা পড়ে। এসময় তার নিয়োগ বাতিল হওয়ার কথা থাকলেও তিনি পুরো বিষয়টি ম্যানেজ করেন। বহু টাকা খরচ করে আসল সনদ জোগাড় করেন। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে তার দুই বছর লেগে যায়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আবু নাইম এ বিষয়ে বলেন, পুরো বিষয়টি মীমাংসিত। দীর্ঘদিন পর এটা নিয়ে হইচই করার কোনো মানে হয় না। তিনি বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার অনুরোধ করেন।
এ বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, শিক্ষক নাইম উচ্চতর স্কেল ও বকেয়া বেতনের জন্য আবেদন করেছেন। তবে কাজ না করেও বেতন নেয়া যায় কি-না, এমন প্রশ্নে তিনি কোন জবাব দিতে পারেননি। ২০১২সালে বিদ্যালয়ে যোগদান করলেও তার চাকরি ২০১০ সাল থেকে কীভাবে স্থায়ী দেখানো হয়েছে, সে বিষয়ে তার কিছু জানা নেই বলে জানান। তিনি বলেন, যেহেতু এখন এই শিক্ষককে নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তাই তার কাছে নিয়োগ সংক্রান্ত ব্যাখ্যা ও কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে।
গাজীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ঘটনাটি ২০১০সালের দিকের। আর শিক্ষক নিয়োগের পুরো বিষয়টি নির্ভর করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের ওপর। দীর্ঘ দুই বছর ওই শিক্ষক কোথায় ছিলেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষক আবু নাইমের বক্তব্য, কোটায় নিয়োগধারীদের সনদ যাচাই-বাছাই করতে দুই বছর সময় লেগেছে। সেখান থেকেই নির্দেশনা পাওয়ার পরই তাকে বিদ্যালয়ে যোগদানের আদেশ হয়েছিল। তবে সার্ভিস বুকে নিয়োগলাভের প্রথম থেকেই বিদ্যালয়ে যোগদানের বিষয়ে তার কিছু জানা নেই বলে তিনি জানান।
এসআর/এমএস