প্রখর খরা আর পোকার আক্রমণ। তাই ঝুঁকিতে পড়েছে ফরিদপুরের পাট চাষিরা। স্যালো মেশিনের সাহায্যে সেচে দিয়ে অনেক কৃষক পাট আবাদ করলেও হঠাৎ অনেক স্থানে পানিও উঠছে না, আবার কিছু কিছু এলাকায় বড় হওয়া পাট খেতে দেখা দিয়েছে ঘোড়া পোকা, বিছা পোকার আক্রমণ।
পোকারা পাটের পাতা খেয়ে ফেলছে। বৃষ্টির অভাবে, সেচের অভাবে পাট খেতের মাটি ফেটে চৌরির হয়ে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় যেখানে সেচ ব্যবস্থা নেই একমাত্র বৃষ্টির পানির উপর নির্ভরশীল এমন জমিতে এখনও পাট বুনতে পারেননি কৃষক। সব মিলিয়ে পাটের আবাদ ফরিদপুরে এবার অনেকটাই ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা।
অনেক স্থানে বৃষ্টির জন্য কৃষকেরা জমিতে নামাজ পড়ে কান্নাকাটি করছে। মোনাজাত করছেন, মানত করছেন। মন্দিরে, গাছ তলায় প্রার্থনা করছেন।
জানাগেছে, দেশের মধ্যে সিংহভাগ ও ভালোমানের পাটের আবাদ হয় একমাত্র ফরিদপুর জেলায়। মাটি, পানি, আবহাওয়া সবকিছুতেই পাট আবাদের জন্যও সেরা ফরিদপুর অঞ্চল। গত বছর ফরিদপুরে প্রায় ৮৫ হাজার হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল। এ বছর আরো বেশি জমিতে পাটের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। চলতি বছরে প্রায় ৯০ ভাগ জমিতে পাটের আবাদ সম্পন্ন হয়েছে, কৃষি অফিস এ তথ্য জানিয়েছে।
বোয়ালমারী উপজেলার টোংরাইল গ্রামের পাটচাষি মহানন্দ বিশ্বাস, কালি কুমার বিশ্বাস, জয়দেব বিশ্বাস জানান, শ্যালো মেশিনে সেচ দিয়ে পাট বপণ করেছিলাম, কয়েক দফা সেচ দেয়া হয়েছে, বৃষ্টির পানি না হলে পাট ভালো হয় না। তারা আরও জানান এখন যে খরা তাতে সেচ দিয়েও কুলানো যায় না, তাই চিন্তায় আছি এবার পাট চাষের কি অবস্থা হয়।
সালথা এলাকার মজিবর, সিদ্দিক মাতুব্বর, মান্নান মাতুব্বর জানান, আমাদের এলাকার অনেক কৃষকের পাট বেশ বড় হয়ে উঠেছে। প্রখর রোদ্দুর আর পোকার আক্রমণে পাটের আবাদ নিয়ে বেশ চিন্তায় আছি।
মধুখালী উপজেলার কামারখালী-আড়পাড়া এলাকার হেলাল উদ্দিন, শামসুল আলম, মেকচামী ইউনিয়নের উত্তম রায়, মনোজিৎ বিশ্বাস জানান, বৃষ্টির দেখা নেই, প্রখর রোদে পুরছে বসতি, মাটি ফেটে চৌচির ফলে পাটের আবাদ নিয়ে সংশয়ে আছি। তবে এখনও যদি বৃষ্টি হয় তাহলে অনেক পাট খেত রক্ষা পাবে।
গত কয়েকদিনে জেলার সালথার আটঘর ইউনিয়নের মাঠে, কাগদী মাঠে, ভাঙ্গার খাটরা মাঠে, নগরকান্দা পুকুরিয়া এলাকার মাঠে স্থানীয় কৃষকদের আয়োজনে বৃষ্টির জন্য নামাজ আদায় করা হয়। এ ছাড়াও বোয়ালমারী উপজেলার টোংরাইল, সুতালীয়া, মোড়া এলাকায় বৃষ্টির জন্য মন্দিরে প্রার্থনা করার সংবাদ পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে শিশুরা মেঘা রানীকে স্বরণ করে গ্রামে গ্রামে কুলা মাথায় নিয়ে ঘুরার খবর পাওয়া গেছে।
ফরিদপুর পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের কৃষিবিদ রণজিৎ কুমার ঘোষ বলেন, প্রচণ্ড এই তাপদাহ পাটের জন্য ক্ষতিকর। এতে পোকার আক্রমণ দেখা দিচ্ছে। মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। পোকারা পাটের কচি পাতা ও ডগা কেটে দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে করণীয় হিসেবে তিনি বলেন, পোকাগুলো দিনে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকে। সন্ধ্যায় বেরিয়ে আসে। নিড়ানি দিলে উপকার মিলবে। তাছাড়া কয়েক দফা সেচ দিলে কিছুটা পরিত্রাণ পাওয়া যাবে।
জেলার সালথা, নগরকান্দা, বোয়ালমারী, মধুখালী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কয়েকটি মাঠে গিয়ে দেখা গেছে, চাষিরা খেতে যত্ন নিচ্ছেন। কোথাও কোথাও মাটি ফেটে গেছে। কেউ সেচ দিচ্ছেন। কেউ অপেক্ষার প্রহর গুণছে বৃষ্টির জন্য। এসব এলাকার পাট চাষিরা তাদের দুশ্চিন্তা কথা জানিয়েছেন।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. হয়রত আলী বলেন, চলতি মৌসুমে ফরিদপুর জেলার ৯টি উপজেলায় ৮৬ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে পাটে আবাদ হচ্ছে।
তার মধ্যে লক্ষ্যমাত্রার ৯০ শতাংশ পাট চাষ হয়েছে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে বোরো ধান কাটা হয়ে গেলে বাকিটায় শুরু হবে। বৃষ্টিতে তো মানুষের হাত নেই, অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না, অনেকেই সাধ্য মতো সেচ দিচ্ছেন আবার অনেক জায়গায় সেচের ব্যবস্থা নেই তারা সমস্যায় পড়েছেন।
এন কে বি নয়ন /এমএমএফ/এমকেএইচ