দেশজুড়ে

সবজি বিক্রির পাইকারি মার্কেট এখন ধানের আড়ৎ

সবজিখ্যাত এলাকা হিসেবে পরিচিত উত্তরের জেলা নওগাঁ। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যায় এ জেলার সবজি।কৃষকের উৎপাদিত সবজির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং বিপণনে মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা হ্রাসে সদর উপজেলার বর্ষাইল ইউনিয়নে সোমবাড়ী গ্রামে পাইকার মার্কেট মার্কেট তৈরি করা হয়। তবে অপরিপল্পিত নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকা ও সংশ্লিষ্টদের অবহেলায় সেটি এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে।ফলে কৃষক  উৎপাদিত সবজির ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মার্কেটটি সবচি চাষিদের জন্য তৈরি হলেও বর্তমানে তা ধানের আড়ৎ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

জানা গেছে, সদর উপজেলার বর্ষাইল, কীর্ত্তিপুর ও হাঁপানিয়া ইউনিয়ন সবজির জন্য বিখ্যাত। বর্ষাইল ইউনিয়নে সোমবাড়ি গ্রামে সপ্তাহে সোমবার হাট বসে।যা সোমবাড়ি হাট নামে পরিচিত। কৃষকের উৎপাদিত ফসলকে কেন্দ্র করে এক সময় এ হাট গড়ে ওঠে। তবে আশপাশে হাট-বাজার গড়ে ওঠায় বর্তমানে এ হাটে বেচাকেনা কমেছে।

তবে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং বিপণনে মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা হ্রাসে ২০০৬-০৭ অর্থবছরে সোমবাড়ি গ্রামে উত্তর-পশ্চিমে শস্য বহুমূখী প্রকল্পের (এনসিডিপি) আওতায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় চার বিঘা জমির ওপর হোলসেল মার্কেট নির্মাণ করা হয়। এ মার্কেটে প্যাকিং হাউস, স্টোরেজ গোডাউন, ওয়াশিং, গ্রেডিং, ড্রাইং ইউনিট, শর্টিং, লোডিং, আনলোডিং, ট্রেনিং সেন্টার, ল্যাট্রিন ও ডাস্টবিন নির্মাণ করা হয়। অর্থায়ন করে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক।

জেলা কৃষি বিপণন অধিদফতরের পরিচালনায় বাস্তবায়ন করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)। প্রথম দিকে এসব মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ ছিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের। দেখভাল করত কৃষি বিপণন অধিদফতর।

এ মার্কেটের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য কৃষক সরাসরি পাইকারদের কাছে বিক্রি করবেন। চাইলে এসব পণ্য ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রির জন্য নিয়ে যাবেন। পণ্যের ন্যায্য মূল্য কৃষক যেন পায়-এটিই ছিল বাজারের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের উদাসিনতায় এটি কাজে আসছে না।

কয়েকজন কৃষক জানান, যেদিন সবজির দাম কম যাবে সেদিন হিমাগারে রেখে পরদিন সবজি বিক্রি করার কথা ছিল। কিন্তু সে সুবিধা এখানে নেই। এজন্য জেলা বাজার মনিটরিং কর্মকর্তার তদারকির অভাব দায়ী।

বর্ষাইল গ্রামের কৃষক ফিরোজ হোসেন, শহীদ ও ফারুক হোসেন বলেন, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাওয়াই এ মার্কেটের মূল উদ্যেশ্য ছিল। সবজি মৌসুমে প্রতি হাটে ৬-৭ ট্রাক সবজি ওঠে।যা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীসহ কয়েকটি জেলায় সরবরাহ করেন ব্যবসায়ীরা। এখানে সবজি রেখে কৃষকরা বিক্রি করবে ভালো দাম পাওয়ার আশায়। কিন্তু কোনো ধরনের সুবিধা পাওয়া যায় না। ভবন তৈরির পর চালুর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। সবজি রাখার যে হিমাগার দরকার সেটিও নেই। তাই সবজির দাম পেতে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে জেলা শহরের গিয়ে বিক্রি করতে হয়। এতে খরচও বেশি পড়ে।

বর্ষাইল গ্রামের কৃষক হামিদুল বলেন, বছরজুড়েই প্রায় এক বিঘা জমিতে মৌসুম সবজি চাষ করি।হাটে নেয়ার পর ব্যবসায়ীরা যে দাম রাখে সে দামেই বিক্রি করতে হয়। এটা তাদের একটা সিন্ডিকেট। সরকার লাখ লাখ টাকা খরচ করে ভবন তৈরি করেছে। কিন্তু সেটি কোনো কাজেই আসছে না। পাইকারি বাজার (হোলসেল মার্কেট) থেকে কোনো ধরনের সুবিধা পাই না। সেটি এখন ভাড়ায় ধানের আড়ৎ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।

মার্কেট ভাড়া নেয়া ধান ব্যবসায়ী উজ্জ্বল কুমার মন্ডল বলেন, পাইকারি বাজারে (হোলসেল মার্কেট) কৃষকের সবজি রাখার কথা। কিন্তু মার্কেটে এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়নি। এছাড়া কৃষক তেমন সুবিধা পেত না। সেজন্য মার্কেটটি গত কয়েক বছর থেকে ভাড়া নিয়েছি। গত দুই বছর থেকে বছরে ১২ হাজার টাকায় মার্কেটটি ভাড়া নিয়ে ধানের আড়ৎ করেছি।

তিনি আরও বলেন, এক সময় সবজি ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এখানে জাকজমকপূর্ণ বাজার গড়ে উঠেছিল। তবে এখন ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনা কমেছে।

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. সামশুল ওয়াদুদ বলেন, কৃষকের সুবিধার জন্য মার্কেটটি তৈরি হয়েছিল। যা কৃষি অফিস তদারকি করতো। প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে ওই মার্কেটটি পরিচালনা করছেন জেলা বাজার মনিটরিং কর্মকর্তা।

নওগাঁ জেলা বাজার মনিটরিং কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, কৃষিপণ্য বা কৃষির সঙ্গে জড়িত যা সবকিছুই ওই মার্কেটে করতে পারবে। মাকের্টের ভেতরে বাজার বসাতে কৃষকদের নিয়ে অনেকবার বৈঠক করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। মার্কেট ভাড়ার অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়।

এছাড়া মার্কেটে বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে কয়েকবার চিঠি দেয়া হয়েছে। আবারও  চিঠি দিয়ে অবগত করা হবে বলে জানান তিনি।  

আব্বাস আলী/এএইচ