দেশজুড়ে

টিপসই দিয়েও মেলেনি ভিজিএফের টাকা

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খন্দকারটোলা গ্রামের বাসিন্দা হতদরিদ্র সাজেদা বেওয়া। ভিজিএফ কর্মসূচির টাকা দেয়ার তালিকায় নাম রয়েছে তার। এমনকি টাকা উত্তোলনের জন্য একটি স্লিপও দেয়া হয়েছিল তাকে। যথারীতি স্লিপটি নিয়ে ওই কর্মসূচির টাকা নিতে শাহবন্দেগী ইউনিয়ন পরিষদেও যান। সেখানে স্লিপটি জমাও দেন।

মাস্টাররোলে স্বাক্ষর (টিপসই) নেয়া হয়। কিন্তু নানা অজুহাত দেখিয়ে টাকা দেয়া হয়নি তাকে। বেশ কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর টাকা না পেয়ে অবশেষে খালি হাতেই বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হন অসচ্ছল ওই বৃদ্ধা নারী।

শুধু সাজেদা বেওয়াই নয়। তার মতো মনোয়ারা বেগম, আছমা বিবি, গোলাপী খাতুন, আয়েশা বেগম, হাসনা বেওয়াসহ শতশত নারী-পুরুষ তাদের নামে দেয়া ঈদুল ফিতর উদযাপনে সরকারিভাবে বরাদ্দ দেয়া ভিজিএফ কর্মসূচির একটি টাকাও পাননি। ভুয়া মাস্টাররোল তৈরির মাধ্যমে কাগজ-কলমে বিতরণ দেখিয়ে ভিজিএফ কর্মসূচির সিংহভাগ টাকাই লোপাট করা হয়েছে।

গত দুইদিন উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় প্রত্যেক অসচ্ছল পরিবারের জন্য ৪৫০ টাকা করে বিতরণে অনিয়ম সংক্রান্ত অভিযোগ সরেজমিন অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে আসে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে পৌরসভাসহ এই উপজেলার দশটি ইউনিয়নে ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং (ভিজিএফ) কর্মসূচির আওতায় মোট একুশ হাজার নয়শ’ তেত্রিশটি পরিবারকে ৪৫০ টাকা দেয়া হয়।

এর মধ্যে শাহবন্দেগী ইউনিয়নে দুই হাজার চারশ’ আটা নব্বইটি হতদরিদ্র পরিবার রয়েছে। যাদেরকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত ওই কর্মসূচির টাকা দেয়া হয়েছে।

এদিকে ওই টাকা বিতরণে পৌরসভাসহ উপজেলার দশটি ইউনিয়নের মধ্যে শাহবন্দেগী ইউনিয়নেই সবচেয়ে বেশি অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দেয়া মাস্টাররোলে বিতরণ দেখানো বেশির ভাগ মানুষই টাকা পাননি।

এছাড়া একই ব্যক্তির একাধিক নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে করা হয়েছে। পাশাপাশি একই ব্যক্তির মাধ্যমে অন্তত দশ থেকে পনেরজনের টিপসই নিয়ে এই মাস্টাররোল তৈরি করা হয়। তাই বিতরণের তালিকায় থাকা অনেকেই জানেন না এই টাকার খবর। অথচ এসব হতদরিদ্র মানুষের মাঝে ভিজিএফের টাকা বিতরণ দেখানো হয়েছে।

আর এভাবেই নয়-ছয় করে টাকা উত্তোলন করে গরিবের টাকা আত্মসাত করেছেন সংঘবদ্ধ একটি চক্র। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মী, ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার ও সচিবের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী চক্রটির কাছে উপজেলা প্রশাসনসহ সবাই অসহায়। তাই প্রতিবারই এসব অনিয়ম করে পার পেয়ে যাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে চান না বলে অভিযোগ ওইসব ভুক্তভোগীদের।

তাদের দাবি, তদন্ত কমিটির মাধ্যমে উপজেলায় জমা দেয়া মাস্টাররোল অনুযায়ী ব্যক্তিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেয়া হোক। প্রকৃতপক্ষে তারা ভিজিএফের টাকা পেয়েছেন কী-না। তাহলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে জানান।

শাহবন্দেগী ইউনিয়নের সচিব ইকবাল হোসেন দুলাল জানান, মোট বরাদ্দ পাওয়া কার্ডের শতকরা ত্রিশটি করে কার্ড দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে বিতরণের জন্য কেটে নেয়া হয়। এসব তালিকা দলীয় নেতারাই করেছেন। আর বাকি তালিকা চেয়ারম্যান-মেম্বাররা করেছেন। তাদের মাঝেই ভিজিএফের এসব টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তাই কারা কারা পেয়েছেন সেটি তারাই বলতে পারবেন। তবে দলীয় কোঠা নিয়ে চেয়ারম্যানের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জের ধরে সামান্য জটিলতা তৈরি হয়েছিল বলে স্বীকার করেন তিনি।

জানতে চাইলে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আল আমিন মন্ডল এ প্রসঙ্গে বলেন, তিনি বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ। তাই ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সরকারিভাবে বরাদ্দ পাওয়া ভিজিএফের টাকা বিতরণ ও সব সুফলভোগী সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়া সম্ভব হয়নি। কাগজ-কলমে স্বাক্ষর করলেও সবকিছুই করেছেন সচিব ও কতিপয় মেম্বার।

এছাড়া দলীয় কোটার নামে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা ভিজিএফের কার্ড কেটে নিয়ে তারাই বিতরণ করেছেন। এহেন কর্মণ্ডের প্রতিবাদ জানালেও কোনো কাজ হয়নি। সবমিলিয়ে তার ইউনিয়নে দুস্থদের জন্য বরাদ্দ দেয়া এসব টাকা কারা পেলেন সেটি অবশ্যই খতিয়ে দেখা দরকার। অনিয়মের মাধ্যমে ভিজিএফের টাকা আত্মসাত করা হলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও জোর দাবি জানান তিনি।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শামসুন্নাহার শিউলি এ প্রসঙ্গে বলেন, ভিজিএফের টাকা বিতরণে অনিয়মের বিষয়টি দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে ট্যাগ অফিসার রয়েছেন। তাই এক্ষেত্রে তার দফতরের তেমন কিছু করার নেই। তারপরও অনিয়মের অভিযোগ পেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ময়নুল ইসলাম বলেন, শাহবন্দেগী ইউনিয়নে ভিজিএফের টাকা বিতরণে অনিয়মের কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এমআরএম/জেআইএম