দেশজুড়ে

ঘর নির্মাণে টাকা না দেয়ায় বাবা-ছেলে-শ্যালকের নামে মামলা

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার বাঁশতৈল ইউনিয়নের গায়রাবেতিল সোনালিয়া গ্রামের দিনমজুর আজিজুল ইসলাম (৫০)। মাটির তৈরি ঘরে বৃষ্টির পানি পড়তে থাকে। তাই দুই মাস আগে ঘরটি ভেঙে ধারদেনা করে ওই স্থানে টিনের একটি ঘর নির্মাণ করেছেন।

কিন্তু ঘর নির্মাণের পর এক বন কর্মকর্তা আজিজুলের কাছে টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে না পারায় আজিজুল, তার ছেলে ও শ্যালক শামীমের বিরুদ্ধে বন কর্মকর্তা মামলা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে তার পরিবার।

আজিজুল ইসলামের তিন কন্যা ও এক পুত্রসন্তান রয়েছে। বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। তিন সন্তান এখনো স্কুলে পড়াশোনা করছে। ছেলে নবম ও দুই কন্যা সপ্তম ও তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। আজিজুল দিনমজুরি করে ছেলে মেয়ের পড়াশোনার খরচ মিটিয়ে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে অতি কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। এর মধ্যে মামলায় আরও অসহায় হয়ে পড়েছেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ১২০ শতাংশ জমির ওপর বাড়ি বানিয়ে যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছেন আজিজুল। মাটির তৈরি ঘরে বৃষ্টির পানি পড়ায় দুই মাস আগে ঘরটি ভেঙে একই জায়গায় নতুন একটি টিনের ঘর নির্মাণ করেন।

খবর পেয়ে অফিসের লোকজন নিয়ে বাঁশতৈল বিটের বিট কর্মকর্তা মো. জাহেদ হোসেন আজিজুলের বাড়িতে যান। তার কাছে ৪০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকার করায় বন কর্মকর্তা টিনের মধ্যে দা দিয়ে কোপ দেন। এ সময় আজিজুলের স্কুলপড়ুয়া ছেলে স্কুলছাত্র আল-আমিন এবং শ্যালক মো. শামীম ঘটনাস্থলে গিয়ে এর প্রতিবাদ জানান।

বিট কর্মকর্তা জাহেদ হোসেন গত ৫ এপ্রিল আজিজুল ও তার ছেলে আল-আমিনের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সরকারি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে প্রবেশ করে দখলের মাধ্যমে ঘর নির্মাণের প্রচেষ্টার অভিযোগ এনে মামলা করেন। পরে ৪ এপ্রিল আরেকটি মামলায় আজিজুলের শ্যালক শামীম (৪০) ও গায়রাবেতিল চকবাজার এলাকার বাসিন্দা হযরত আলীকে (৪৫) অভিযুক্ত করেন।

আজিজুল অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি গরীব মানুষ। দিন মজুরি করে কোনোমতে সংসার চালাই। কিছু টাকা জমিয়ে ও ধার-দেনা করে একটি ঘর করেছি। এতেই মামলার আসামি হতে হয়েছে। বন কর্মকর্তার চাহিদামতো টাকা দিলে ঘর করতে টাকা পেতাম কোথাই। টাকা দিতে পারিনাই বলে বন কর্মকর্তা আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। শুধু আমার বিরুদ্ধে না ছেলে ও শ্যালকের নামেও মামলা করেছেন বন কর্মকর্তা জাহেদ। আশপাশে অনেকেই ঘর করছে, তারা বন কর্মকর্তার চাহিদামতো টাকা দিতে পারছে বলেই তাদের নামে মামলা হয় না।’

হযরত আলী বলেন, ‘আমার বাড়ির পাশে অসহায় ব্যক্তি (সম্পর্কে ফুপা) ছোট একটি ঘর নির্মাণ করেছেন। বিট কর্মকর্তা জাহেদ ঘরটি আমার মনে করে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। আমি তাকে ঘরটি আমার না জানালে ক্ষুব্ধ হন। টাকা না দেয়ায় আমার বিরুদ্ধে মিথ্যে মামলা করেছেন। মামলায় নয়াপাড়া মৌজা উল্লেখ করলেও ওই মৌজায় আমার কোনো স্থাপনা নেই।’

আজিজুলের স্ত্রী সালেহা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী দিনমজুর। তার আয়ের টাকা দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হয়। বন কর্মকর্তার চাহিদামত টাকা না দেয়ায় আমার ঘরের টিন কেটেছেন। আমার স্কুল পড়ুয়া ছেলে ও ভাইকেও আসামি করা হয়েছে।

অভিযোগে বিষয়ে জানতে চাইলে বাঁশতৈল বিট কর্মকর্তা জাহেদ হোসেন বলেন, ‘ঘর নির্মাণের খবর পেয়ে বাধা দেয়া হয়েছিল। এতে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের ওপর তেড়ে আসে।’

টাকা চাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় কারও বিরুদ্ধে মামলা হলে আসামিরা বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে টাকা চাওয়ার মিথ্যে অভিযোগ আনে।’

এ বিষয়ে বাঁশতৈল ইউপি চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান মিল্টন বলেন, ‘আজিজুল একজন দিনমজুর। যুগ যুগ ধরে বসবাস করা বাড়িতে ঘর নির্মাণ অথবা সংস্কার না করলে বসবাস করবে কীভাবে। বন কর্মকর্তা মামলা করতে পারেন, কিন্তু ঘর কোপানোর বিষয়টি অমানবিক কাজ।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এস এম এরশাদ/এসজে/জিকেএস