দেশজুড়ে

‘আদর্শ কলেজ’র নজরকাড়া প্রবেশদ্বার

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি আলোচিত নাম লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার দইখাওয়া আদর্শ কলেজ। আর এ কারণই হলো কলেজটির প্রধান ফটক। বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যিকদের রচিত পঞ্চাশটি বই দিয়ে দৃষ্টিনন্দন ফটকটি নির্মাণ করা হয়েছে। ফটকটি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে আসছেন বিভিন্ন বয়সী দর্শনার্থীরা।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, হাতীবান্ধা উপজেলার শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে দইখাওয়া আদর্শ কলেজ। হাতীবান্ধার-কাকিনা বাইপাস সড়কের পাশেই চোখে পড়বে বইয়ের আদলে গড়ে তোলা দইখাওয়া আদর্শ কলেজের প্রধান ফটকটি। এমন দৃষ্টিনন্দন ফটকটি মন কাড়ছে সবার। ফটকটির সামনে প্রতিদিনই পথচারী ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের কাউকে সেলফি আবার কাউকে ছবি তুলতে দেখা গেছে।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের জানুয়ারির দিকে দৃষ্টিনন্দন ফটকটি নির্মাণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় কলেজ কমিটি। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কলেজের নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় দশ লাখ টাকা ব্যয়ে বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যিকদের রচিত পঞ্চাশটি বই দিয়ে ফটকের দুইটি পিলার সজ্জিত করা হয়। বই পড়লেই পৃথিবীকে জানা সম্ভব—অধ্যক্ষ মো. মোফাজ্জল হোসেনের এই চিন্তাধারা থেকেই প্রধান ফটকের ওপরে হাতের মুঠোয় পৃথিবীর মানচিত্র (গ্লোব) তৈরি করা হয়েছে।

নির্মিত ফটকের বামে সবার ওপরে স্থান পেয়েছে ‘মা’ বইটি। লিখেছেন রংপুরের সন্তান আনিসুল হক। ফটকের ডানে সবার ওপরে রয়েছে ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মাদার’ বইটি।

প্রধান ফটকের পাশাপাশি কলেজে বইয়ের আদলে ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয়েছে শহীদ মিনার। দূর থেকে শহীদ মিনার লক্ষ্য করলে মনে হয় যেন একটি বই পড়ার জন্য খুলে রাখা হয়েছে। আর সেই বইয়ে ভাষা আন্দোলনের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ১৯৯৯ সালে তিন একর ১০ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত এই কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক এবং বাংলা বিভাগে স্নাতক পাস কোর্সে প্রায় ১৩শ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। ২০০১ সালে ২৩ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে দুইজন কৃতকার্য হয়েছিলেন। ২০০৪ সাল থেকে কলেজের শিক্ষার হার ৯৭ শতাংশে উন্নীত হয়। যা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে।

উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হওয়াতে এখানকার বেশিরভাগ শিক্ষার্থীকে দূরে উপজেলা শহরে শিক্ষার জন্য যেতে হচ্ছে না। কলেজের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী নিম্নবিত্ত পরিবারের, অনেকেই বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসতে পারেন না। তাই কলেজের অধ্যক্ষ ক্যান্টিন তৈরি করে দুপুরে মাত্র ১০ টাকায় খাবার পরিবেশনের সিদ্ধান্ত নেন। গত দুই বছর ধরে কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা দুপুরে ১০ টাকায় খাবার খেতে পারেন।

কলেজ সূত্র জানায়, কলেজের অধ্যক্ষ মো. মোফাজ্জল হোসেনের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রধান ফটক নির্মাণের কাজ করেছেন সাবেক শিক্ষার্থী গৌরাঙ্গ রায়। সার্বিক সহযোগিতা করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নেভাল আর্কিটেক্চার বিভাগের শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান শাকিল। দইখাওয়া আদর্শ কলেজের এইএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মরিয়ম জান্নাত আলো জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি এই কলেজের শিক্ষার্থী হয়ে নিজেকে গর্ববোধ করি। বইয়ের মোড়কে গেট তৈরি হওয়ায় বই পড়া নিয়ে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হয়েছে।’

তিনিও আরও বলেন, ‘এই বইগুলো কলেজে লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়ে অনেক ভালো লাগছে। সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধ, বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্য সম্পর্কে জানতে পারছি।’ কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য আফজাল হোসেন বলেন, ‘প্রত্যন্ত এই অঞ্চলে কলেজটি নির্মাণের পর থেকে সুনামের সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। এলাকার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় উজ্জীবিত করতে বইয়ের ফটকটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।’ দইখাওয়া আদর্শ কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও হাতীবান্ধা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত হোসেন বাচ্চু বলেন, ‘প্রধান ফটকটি বইয়ের আদলে গড়ার প্রধান লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীসহ সব শ্রেণির মানুষকে বই পড়ায় আগ্রহী করে তোলা।’

কথা হয় দইখাওয়া আদর্শ কলেজের অধ্যক্ষ মো. মোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করতে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় বইয়ের আদলে প্রধান ফটক নির্মাণের করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ফটকটি নির্মাণের পর থেকে এলাকায় ব্যাপক সাড়া পেয়ে আশার আলো জাগিয়েছে। মূলত বই পড়ায় আগ্রহ সৃষ্টির জন্যই বই দিয়েই ফটকটি তৈরি করা হয়েছে।’ হাতীবান্ধা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সামিউল আমিন বলেন, ‘দইখাওয়া আদর্শ কলেজের বইয়ে আদলে ফটক নির্মাণ হয়েছে বিষয়টি লোকমুখে শুনেছি। খুব শিগগরিই দেখতে যাব।’

রবিউল হাসান/এসআর/এমকেএইচ