বাগেরহাট সদর উপজেলার বারুইপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. আবুল হোসেন শেখ। পেশায় চিংড়ি রেনু পোনা ব্যবসায়ী। সংসারের বাড়তি আয়ের জন্য নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় ছোট পরিসরে করেছেন গরুর খামার।
কয়েক বছর ধরে ছোট্ট এই খামারে বিশেষ করে কোরবানির জন্য লালন-পালন করেছেন দুইটি অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান ও একটি আমেরিকান ব্রাহমা জাতের ষাড়। আদর করে ষাড়ের নাম দিয়েছেন ভৈরব, মধুমতি ও সুখী। তবে বিদেশি জাতের এই ষাড় আকারে বড় হওয়ায় খামারি হোসেনের বাড়িতে প্রতিদিন আসছেন উৎসুক জনতা।
দেশীয় পদ্ধতিতে কোনো প্রকার ওষুধ ছাড়াই ষাড় তিনটি মোটাতাজাকরণ করছেন হোসেন শেখ। আর এ কাজে তাকে সহযোগিতা করছেন তার ছোট ভাই ইমরান শেখ। যদিও গত বছর করোনার কারণে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় হোসেন গরু ৩টি বিক্রি করেননি। এবারও ঠিক একই কারণে শঙ্কায় রয়েছেন তিনি।
প্রতিদিন ভৈরব, মধুমতি ও সুখীর শুকনা খাবার খড়, কুড়া, ভূষিসহ অন্যান্য উপাদান যোগাতে তাকে গুনতে হয় প্রায় তিন হাজার টাকা।
হোসেন শেখ জানান, এ বছরও তার ষাড় কেনার জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামের ব্যাপারীরা যোগাযোগ করেছেন, তাদের সঙ্গে বিক্রির বিষয়ে কথাবার্তা চলছে। উপযুক্ত মূল্য পেলে এ বছর ষাড় তিনটি বিক্রি করতে পারবো।
বারুইপাড়ার এই খামারি বলেন, তার খামারে অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান জাতের ষাড়ের (ভৈরর) ওজন (১৮ শ কেজি) ৪৫ মণ । ৯ ফুট লম্বা ও ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার ভৈরব ৪৫ লাখ টাকায় বিক্রির ইচ্ছা রয়েছে তার। একই জাতের ৯ ফুট লম্বা ও ৫ ফিট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার মধুমতির ওজন (১৫শ কেজি) ৩৫ মণ। এই ষাড়টি ২০ লাখ টাকা বিক্রির আশা করছেন তিনি। আর ভৈরবের থেকে একট ছোট হলেও সব থেকে আকর্ষণীয় আমেরিকান ব্রাহমা জাতের সুখী দর চেয়েছেন ৪০ লাখ টাকা। সুখী লম্বায় ৯ ফুট ও উচ্চতা ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি। সুখীর ওজন (১৭শ কেজি) ৪০ মণ।
গরু পরিচর্যার কাজে নিয়োজিত আবুল হোসেনের ছোট ভাই ইমরান শেখ বলেন, এই ষাড় ৩টি কোনো প্রকার ক্ষতিকর ওষুধ ও কেমিকেল প্রয়োগ ছাড়াই দেশীয় পদ্ধতিতে তিন বছর ধরে লালন-পালন করছেন। খাবার হিসেবে প্রতিদিন ঘাস, খড়-কুটার পাশাপাশি ভূষি, খৈল, ভুট্টার গুড়া, কুড়ার পালিশ ও চিটাগুড় খাওয়ানো হয়।
খামারে গরু দেখতে আসা বশির শেখ বলেন, যাত্রাপুর এলাকায় হোসেনের গরুর মতো এত বড় গরু এই এলাকায় আর নেই। কোরবানির জন্য প্রতিদিন সকাল-বিকেল তার বাড়িতে অনেক লোকজন আসেন। গত বছর এই গরু বিক্রি করতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারেনি।
স্থানীয় সালাম শেখ বলেন, ‘আমাগো এই অঞ্চলে এত বড় গরু, আর একটাও নেই। অনেকে আবার দামদরও করতিছে। করোনায় হাট এবার হবে কিনা বলা মুশকিল।’
তবে হোসেনের মতো অনেক খামারিও চিন্তিত। কারণ কোরবানির ঈদের আর কিছু দিন বাকি। প্রাণঘাতি করোনাভাইরাসের কারণে জেলায় এবার পশুর হাট বসবে কি-না। খামারের গরুর ন্যায্যমূল্যে বিক্রি হবে কি-না, তা নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন অনেকে।
যদিও বাগেরহাট প্রাণি সম্পদ বিভাগ ও বাগেরহাট সদর উপজেলা প্রশাসন বলছে, করোনাকালে কোরবানির গরু বিক্রি নিয়ে জেলার খামারিদের শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
এ বিষয়ে বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মুছাব্বেরুল ইসলাম বলেন, বাগেরহাটে করোনার প্রকোপ বেশি হওয়ায় এখন পর্যন্ত কোরবানির হাটের পরিবর্তে, আমরা অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছি।
ইতোমধ্যেই আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ফেসবুকে) সদর উপজেলার পক্ষ থেকে ‘কোরবানির পশুর হাট’ নামে একটি পেজ খুলেছি। যেখানে সদর উপজেলার খামারিরা তাদের গরুর ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে ছবি আপলোড করতে পারবেন।
এছাড়াও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি ওয়োবসাইট নির্মাণের কাজ চলমান। যেটি হয়ে গেলে অনলাইনে গরু বিক্রি বাড়বে। পাশাপাশি কোরবানি দিতে আগ্রহীরাও সহজে তার পছন্দের গরুটি ক্রয় করতে পারবেন।
বাগেরহাট জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. লুৎফর রহমান বলেন, হোসেন শেখের মত বেশ কিছু খামারি প্রাণিসম্পদ বিভাগের সহায়তা নিয়ে সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে বেশ কিছু গরু মোটাতাজাকরণ করেছেন। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ খামারিদের বিভিন্ন সহায়তার পাশাপাশি পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কোরবানির ঈদ উপলক্ষে বাগেরহাট জেলায় পশুর চাহিদা রয়েছে ৩২ হাজার ৫২০টি। এ চাহিদার বিপরীতে জেলার ৬ হাজার ৪১টি খামারে বিক্রির জন্য প্রস্তুত রয়েছে ৩৬ হাজার ৯৮৫টি পশু। যার মধ্যে ২৫ হাজার ২৫৮টি গরু, ৫৭৩টি মহিষ এবং ১১ হাজার ১৫৪টি ছাগল-ভেড়া ।
শওকত আলী বাবু/এমএসএম/এএসএম