“মানুষ চিরদিন বাঁচতে পারে না। আমিও বাঁচব না। তবে মানুষ মানুষের মাঝে বেঁচে থাকে তার কর্মের মাধ্যমে। কর্মের মাধ্যমে মানুষের মাঝে বেঁচে থাকার জন্য ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছি। ‘একটি শিশু, দুটি গাছ’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে যে পরিবারে শিশু জন্মগ্রহণ করবে সে পরিবারে দুটি করে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছি। শিশুর সঙ্গে গাছও বেড়ে উঠবে। পর্যায়ক্রমে সবুজে ভরা গাছে ছেয়ে যাবে পুরো এলাকা। সে এক অন্যরকম অনুভূতি!”
কথাগুলো বলেছিলেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. বাদশা মিয়া।
মহেড়া ইউনিয়নে নতুন শিশুর জন্ম হওয়ার খবর পেলেই একটি ফলদ ও একটি বনজ বৃক্ষের চারাগাছ নিয়ে হাজির হন এই চেয়ারম্যান। তবে প্রতি পরিবারে দুটি সন্তানের বেশি হলে ওই পরিবারে আর গাছ লাগান না তিনি। তার এই মহতী কাজে স্ত্রী রাজিয়া বেগম পাশে থেকে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।
গাছ লাগানোর পাশাপাশি প্রতিটি শিশুকে ২০০-৫০০ টাকা উপহার হিসেবে দেন চেয়ারম্যান বাদশা মিয়া। পাশাপাশি প্রতিটি শিশুর জন্মনিবন্ধন ফ্রি করে দেন তিনি।
২০১৯ সালের জুন মাস থেকে তিনি এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ পর্যন্ত তিনি ২১২ শিশুর বাড়িতে গিয়ে দুটি করে ৪২৪টি গাছ লাগিয়েছেন। ২০১৬ সালের ২৮ মে ইউপি নির্বাচনে বাদশা মিয়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। দায়িত্ব নেন ৭ আগস্ট। তিনি জানান, ইউপির বিভিন্ন গ্রামে অনুষ্ঠিত সভা কিংবা উঠান বৈঠকে তার উদ্যোগের কথা প্রচার করেন।
গত ১ জুন হিলড়া গ্রামের নুর আলমের স্ত্রী যমজ কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। তাদের নাম রাখা হয় সামিয়া আক্তার ও লামিয়া আক্তার।
৮ জুন আদাবাড়ি গ্রামের হুমায়ুন রেজার স্ত্রী হোমাইরা মাইশা নামের এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। ২২ জুলাই একই গ্রামের তারেক আল মামুনের স্ত্রী পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। তার নাম রাখা হয় রতন মিয়া। ২৪ জুলাই হিলড়া গ্রামের জয়নাল শিকদারের স্ত্রী পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। তার নাম রাখা হয় রিহান শিকদার।
তাদের বাড়িতে গিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান বাদশা মিয়া প্রতিটি শিশুর জন্য একটি করে আম্রপালি ও একটি করে বনজ গাছের চারা রোপণ করেন। শুধু তাই নয়, প্রতিটি শিশুকে ২০০-৫০০ টাকা উপহার দেন। এছাড়া তাদের জন্মনিবন্ধন ফ্রি করে দেন। জন্মনিবন্ধনের সরকারি ফিস চেয়ারম্যান নিজেই পরিষদে জমা দেন বলে জানা গেছে।
তেঘুরি গ্রামের দিপু সরকারের স্ত্রী দীপ্তি সরকার একসঙ্গে দুই ছেলে ও এক মেয়েসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। ১ আগস্ট চেয়ারম্যান বাদশা মিয়া ওই বাড়িতে গিয়ে তিন নবজাতক অঙ্কন সরকার, অর্পণ সরকার ও অরিত্রি সরকারের নামে বাড়ির পাশে ছয়টি গাছের চারা লাগান। নবজাতকদের মা দীপ্তি বলেন, ‘বাবুরা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছও বড় হবে।’
স্বল্প মহেড়া গ্রামের প্রবাসী ফিরোজ মিয়ার স্ত্রী আরিফা আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলেসন্তানের জন্ম হওয়ার খবর পেয়ে চেয়ারম্যান সাব আমার বাড়িতে এসে গাছ লাগিয়েছেন। একটা আম, আরেকটা কাঠ (ইউক্যালিপটাস) গাছ। টাকাও উপহার দিয়েছেন। কি যে খুশি হইছি! বলা পারুম না।’
বিল মহেড়া গ্রামের জুলহাস মিয়া বলেন, ‘মেয়ে হওয়ার খবরে চেয়ারম্যান বাড়িতে আম ও ইউক্যালিপটাস গাছ লাগিয়েছেন। এটি নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। কারণ, গাছের দেয়া অক্সিজেন নিয়ে আমরা বাঁচি।’
হোমাইরার বাবা হুমায়ুন রেজা বলেন, ‘মেয়ের জন্ম হওয়ার খবর পেয়ে ইউপি চেয়ারম্যান বাড়িতে এসেছিলেন। বাচ্চা তখন আত্মীয় বাড়িতে ছিল। চেয়ারম্যান বাড়ির পাশে দুটি গাছ লাগিয়েছেন।’
ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) আগছাওয়ালী গ্রামের বাসিন্দা দেওয়ান পারভেজ বলেন, কর্মসূচিটি গ্রহণের আগে চেয়ারম্যান পরিষদের সবাইকে নিয়ে আলোচনা করেন। সবাই তাকে সাহায্য করছেন।
তিনি বলেন, তাদের গ্রামে নতুন বাচ্চা হলে বাচ্চার হাতে টাকা উপহার দেয়ার রেওয়াজ আছে। চেয়ারম্যান গাছ লাগানোর পর বাচ্চার হাতে কিছু টাকাও দিচ্ছেন। এই টাকা বিশেষ করে যারা দরিদ্র, তাদের একটু উপকারে আসে। এছাড়া তিনি বাচ্চা হওয়ার পর মায়েরা কিভাবে নিজেদের ও বাচ্চার যত্ন নেবেন, তা-ও বলে আসেন যা খুবই উপকারী।
চেয়ারম্যান বাদশা মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, প্রতিটি নবজাতক গাছের সবুজ শ্যামল ছায়ায় বেড়ে উঠুক আর ইউনিয়নবাসী কাজের মাধ্যমে আমাকে মনে রাখুক এটাই আমার লক্ষ্য। কাজটি করার মাধ্যমে এলাকার জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমার ক্ষুদ্র এ প্রয়াসের কারণে মানুষ আমাকে মনে রাখবে বিশ্বাস করি।
এস এম এরশাদ/এসআর/এএসএম