২০১৬ সালে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর অধীনে উপজেলা প্রোগ্রাম অফিসার পদে ২০ জনকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে উচ্চ আদালতের রায় প্রতিপালন করেনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আদালত। রায় বাস্তবায়ন না করায় হাইকোর্ট বলেছেন, আদেশ পালনে আদালত অবমাননাকারীরা উচ্চ আদালতের প্রতি সস্পূর্ণ অবহেলা ও অবাধ্যতা করেছেন।
একই সঙ্গে আদেশ হাতে পাওয়ার সাতদিনের মধ্যে উচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়ন করে হলফনামা আকারে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্যও বলেছেন আদালত।
বরিশাল সদর থানার বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সফিজ উদ্দিনের সন্তান মো. বাবুল হাওলাদারসহ ২০ জনের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে গত ১৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের বিচারপতি মামনুন রহমান ও বিচারপতি খন্দকার দিলিরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
সর্বশেষ হাইকোর্টের ওই আদেশে বলা হয়, আদেশ হাতে পাওয়ার সাতদিনের মধ্যে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আদালতকে জানানোর জন্যে। সেই আদেশের লিখিত অনুলিপি (সার্টিফাইট কপি) গত ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশ পেয়েছে। প্রকাশ পাওয়ার পরে ওই দিনই হাইকোর্টের এ আদেশের কপি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় বলে জানান রিট আবেদনকারীদের আইনজীবী। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দপ্তর ওই আদেশের বিষয়ে এখনো কোনো সাড়া দেয়নি বলে দাবি করছেন আইনজীবী ও চাকরিপ্রার্থীরা।
এ বিষয়ে মঙ্গলবার (১২অক্টোবর) রিটকারী আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মাহমুদ হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ১৯৯৬ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত চলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রকল্প-২ সমাপ্ত হওয়ার পর উপজেলা প্রোগ্রাম অফিসার পদে চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের জন্য ২০০৫ সালে একটি বিধিমালা করে। ওই বিধিমালা অনুযায়ী এরপর সংশ্লিষ্টরা শিক্ষা অধিদপ্তরে পদায়ন করার জন্য আবেদন করেন। ওই সময় চাকরিপ্রার্থীরা বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দেয়। কিন্তু তাদের রাজস্ব খাতে পদায়ন করা হয়নি।
মন্ত্রণালয় ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোতে ঘুরে-ফিরে চাকরিপ্রার্থীদের রাজস্বখাতে স্থানান্তর না করায় ২০১১ সালে উপজেলা প্রোগ্রাম কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে বাবুল হাওলাদারসহ ২২ জনের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মাহমুদ হাসান রিট করেন।
ওই রিটের শুনানি নিয়ে ২০১১ সালের ১০ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করেন। ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০১৬ সালের ১৪ জুন রায় ঘোষণা করেন। রায়ে তাদের চাকরি রাজস্ব খাতে পদায়ন করার জন্যে নির্দেশ দেন। ছয় মাসের মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবকে এ রায় বাস্তবায়ন করার জন্য বলেন আদালত।
কিন্তু ওই রায় বাস্তবায়ন না করে ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর আপিল আবেদন করার জন্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে পরামর্শ চান।
২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর অনুবিভাগ, রিট শাখা-১ থেকে সিনিয়র সহকারী সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সই করা পত্রে বলেন, হাইকোর্টের প্রদত্ত রায় সঠিক ও আইনানুগ। আপিল করলে ফলাফল লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই। উল্টো সময় ও আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি, বিধায় সরকার ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল দায়ের না করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এরপরে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে আপিলও করা হয়নি। আবার তাদের চাকরিও রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করা হয়নি। এরমধ্যে কেটে গেছে দুই বছর। আদেশ বাস্তবায়ন না করায় এরপরে ২০১৮ সালে আদালত অবমাননার আবেদন করা হয়। ওই আবেদন শুনানি নিয়ে ২০১৮ সালের ৩ জুলাই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেন হাইকোর্ট। আদালত অবমাননার রুল জারি করার পরেও আদেশ প্রতিপালন না করায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালককে তলব করেন হাইকোর্ট।
ব্যুরোর মহাপরিচালক (ডিজি) উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর তপন কুমার ঘোষ আদালতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে রায় বাস্তবায়ন না করার কারণ ব্যাখ্যা করেন। হাইকোর্টে সশরীরে উপস্থিত হয়ে আদালত অবমাননার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, উচ্চ আদালতের দেওয়া এ রায় বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের। তাই আমরা নিয়োগের কোনো উদ্যোগ নিইনি। পরে তাকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেন।
এরপরে চলতি বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর এসে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের প্রতি নির্দেশনা চেয়ে রিটকারীদের আইনজীবী হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়নের জন্য আবারও আবেদন করেন। ওই আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে হাইকোর্টে ওইদিন তার নির্দেশে বলেন, সাত কার্যদিবসের মধ্যে ২০১৬ সালের রায় বাস্তবায়ন করে হলফনামা আকারে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য। কিন্তু সাতদিনের বেশি সময় অতিবাহতি হলেও সেই আদেশ বাস্তবায়ন করেনি মন্ত্রণালয়।
এফএইচ/এএএইচ/এএসএম