দেশজুড়ে

দুর্ভোগে অতিষ্ঠ বগুড়া পৌরসভার মানুষ

প্রথম শ্রেণির বগুড়া পৌরসভার ৭০ বর্গকিলোমিটারে অনেক সড়কই এখনও কাঁচা। সন্ধ্যার পর অন্ধকারে ডুবে যায় ৭০ শতাংশ এলাকা। নেই পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা। পৌরসভার ২১টি ওয়ার্ডে সমস্যার শেষ নেই। কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে প্রতিনিয়ত জনদুর্ভোগ শুধু বাড়ছেই। প্রয়োজনীয় ডাস্টবিন না থাকায় শহরের বিভিন্ন এলাকা পরিণত হয়েছে আবর্জনার ভাগাড়ে। শহরে বৈদ্যুতিক বাতির স্বল্পতা, অবৈধ রিকশা, ব্যাটারি অটো ও সিএনজি টেম্পো চলাচলে নিয়মনীতি না থাকা এখন একটা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে।

১৫ বছর আগে পৌরসভায় অন্তর্ভুক্ত প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ কাগজে-কলমে শহরের বাসিন্দা হলেও ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা তারা পাচ্ছে না। অন্তর্ভুক্তির পর থেকে বর্ধিত এলাকার বসতবাড়িতে হোল্ডিং কর আদায় শুরু করে কর্তৃপক্ষ। অকৃষি জমিও আনা হয় করের আওতায়। বিনিময়ে বাড়েনি নাগরিক সেবা। পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস কোনো সুবিধাই দিতে পারছে না পৌর কর্তৃপক্ষ।

সড়ক পাকা করা, সড়কবাতি সংযোজন এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বর্ধিত এলাকার বাসিন্দাদের দাবি দীর্ঘদিনের। তারা একাধিকবার আন্দোলনও করেছে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। অর্থ সংকটের অজুহাতে পৌর কর্তৃপক্ষ হাত গুটিয়ে বসে আছে। তারা বলছে, বর্ধিত এলাকার ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক পাকা করা, সড়ক বাতি সংযোজন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রচুর টাকা দরকার। সরকারি অনুদান ছাড়া বিপুল অংকের এই ব্যয় কোনোভাবেই পৌরসভার একার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। ফলে বর্ধিত এলাকার দুই লাখ বাসিন্দার ভোগান্তি কবে শেষ হবে, তা কেউই বলতে পারছেন না।

১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বগুড়া পৌরসভার আয়তন ১৪ বর্গকিলোমিটার থেকে হঠাৎ করেই পাঁচগুণ বাড়িয়ে ২০০৬ সালে ৭০ বর্গকিলোমিটার করা হয়। তখন বগুড়া সদর ও শাজাহানপুর উপজেলার দুটি ইউনিয়নের পুরোপুরি এবং আরও ছয় ইউনিয়নের আংশিক এলাকা যুক্ত করে ওয়ার্ডের সংখ্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে ২১টি করা হয়। পৌরসভার মোট জনসংখ্যা ১০ লাখের মধ্যে প্রায় ৬ লাখ বসবাস করে মূল শহরে। আর বর্ধিত অংশে বাস করে আরও ৪ লাখ মানুষ।

প্রকৌশল শাখার তথ্য অনুযায়ী, পৌরসভায় মোট ৮৪৮ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে মাত্র ৩২৯ কিলোমিটার পাকা। বাকি ৫১৯ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৩০০ কিলোমিটার পুরোপুরি কাঁচা। আরসিসি ঢালাই ও ইট বিছিয়ে আরও ২৬৯ কিলোমিটার সড়ক কোনো রকমে চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে।

কর্মকর্তারা জানান, কাঁচা ও ইট বিছানো সব সড়কই বর্ধিত এলাকার মধ্যে।

বর্ধিত এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিয়মিত পৌরকর দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ ১৫ বছরেও ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেনি। অধিকাংশ সড়ক কাঁচা হওয়ায় নিত্য যাতায়াতে, বিশেষ করে বর্ষাকালে তাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। সড়কগুলোতে কোনো বাতি না থাকায় রাত নামলেই ছিনতাইকারীদের তৎপরতা বেড়ে যায়।

বগুড়া শহরে বের হলেই পাওয়া যাবে কারখানা ও গাড়ির বিকট শব্দ, গাড়ির কালো ধোঁয়া, বিভিন্ন মহল্লায় বস্তিবাসী ছেলেমেয়েদের যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ, জলাবদ্ধতা, যত্রতত্র মাংসের দোকান, জবাই করা গরু ছাগলের উচ্ছিষ্টাংশ রাস্তায় ফেলা, রাস্তায় বাস ও বেবি ট্যাক্সিস্ট্যান্ড করে অরাজক পরিস্থিতি।

শহরের অধিকাংশ এলাকায় ময়লা আবর্জনা ফেলার জন্য কোনো ডাস্টবিন নেই। গৃহস্থালির বর্জ্য ফেলা হয় রাস্তার পাশে ড্রেন কিংবা সড়কের উপরেই। আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠেছে লাইসেন্সবিহীন অবৈধ ক্লিনিক। এগুলোর বর্জ্যও ফেলা হচ্ছে যেখানে সেখানে। বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা আবর্জনা অনেক সময় ২/৩ দিনেও পরিষ্কার করা হয় না। অর্থের বিনিময়ে পৌরসভা থেকে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান বাড়ি বাড়ি গিয়ে আবর্জনা সংগ্রহ করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা একেবারেই নগণ্য।

শহরের ব্যস্ততম এলাকা সাতমাথা, জজকোর্ট এলাকা, নিউমার্কেট এলাকা, কাঁঠালতলা, রাজাবাজারমোড়, ফতেহআলী মোড়, শেরপুর ও গোহাইল রোডের সংযোগ মুখে দেখা যায় আবর্জনার স্তূপ। ময়লা আবর্জনার গন্ধে শহরবাসীর পথচলা দায় হয়ে যায়। ড্রেন দীর্ঘদিনেও পরিষ্কার করা হয়না। এখন কিছু কিছু ড্রেনের ময়লা তোলার ফলে উৎকট গন্ধ পরিবেশ দূষিত করছে। শহরে দিনে রাতে শোনা যায় মাইকের উচ্চ শব্দ। বিভিন্ন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের হয়ে প্রচারণা চালানো হয় মাইকের উচ্চ শব্দে। কেন্দ্রস্থল সাতমাথার পাশের এলাকায় শত শত বেবি ট্যাক্সি চলাচল করে উচ্চ শব্দে। পুরো শহর ঢেকে ফেলা হয় অননুমোদিত ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ডে।

কোনো লজিস্টিক সাপোর্ট না বাড়িয়ে হঠাৎ করেই সীমানা বর্ধিত করার মাশুল দিতে হচ্ছে পৌরবাসীকে। নতুন এই বর্ধিত এলাকা এখন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের চেয়েও বেশি। মূল শহরকে কেন্দ্রবিন্দু করে এর চারপাশে বর্ধিত করা হয়েছে। শহরের সিলিমপুর, মালগ্রাম, কৈগাড়ি, হরিগাড়ি ইসলামপুর, ছোট বেলাইল, বড় বেলাইলসহ ৪৮টি মৌজা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বর্ধিত এলাকায়।

পৌরসভার ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের নবনির্বাচিত কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন রাজু বলেন, আমার এলাকার অনেক রাস্তা এখনো কাঁচা, আধাপাকা ও গর্তে ভরা। অনেক জায়গায় ড্রেন নেই। নতুন অর্থ বছরে এসব উন্নয়ন কাজ শুরু করার কথা রয়েছে। কোনো প্রকার নাগরিক সুবিধা দিতে পারছি না এলাকার মানুষকে। কিন্তু জমি রেজিস্ট্রি থেকে শুরু করে সবকিছুই পৌরসভার নির্ধারিত ফি দিয়ে করতে হচ্ছে।

সাবগ্রাম এলাকার বাসিন্দা আকরাম হোসেন অভিযোগ করেন, আমাদের দুর্ভোগের খবর কেউ রাখে না। আমাদের এলাকায় পৌরসভার কোনো বৈদ্যুতিক বাতি নেই। সন্ধ্যা নামলেই ভুঁতুড়ে এলাকায় পরিণত হয় রাস্তাঘাট। পানির কোনো লাইন নেই। নেই ময়লা আবর্জনা ফেলার ডাস্টবিন। শিশুদের বিনোদনের কোনো ব্যবস্থা নেই। এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকার কারণে অল্প বৃষ্টিতেই হাঁটু পানি দেখা দেয় রাস্তা ঘাটে।

নিশিন্দারা মধ্যপাড়ার বাসিন্দা আবু সালেহ মোহাম্মদ জানান, বর্ধিত এলাকা হবার কারণে যথারীতি পৌরকর দিতে হচ্ছে। জমি রেজিস্ট্রি করতেও ফি দিতে হচ্ছে চারগুণ বেশি। কিন্তু আমাদের লাভ কি? আমরা কেন সব সুযোগ সুবিধা পাবো না?

তিনি বলেন, চলতি বাজেটেও পৌরসভা এলাকায় প্রায় দেড়গুণ পৌরকর বৃদ্ধি করা হয়েছে। পৌরসভার বাসিন্দা হবার কারণে কোনো সুযোগ-সুবিধা না পেলেও আমাদের এটা মেনে নিতে হবে।

গন্ডগ্রাম এলাকার আলফাজ হাজি বলেন, গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ কিছুই নাই। অনেক রাস্তা এখনও মাটির। তারপরও আমরা পৌরসভার নাগরিক।

বগুড়া পৌর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ফুটপাত দখল করে দোকানঘর নির্মাণ করা হয়েছে। বাড়িঘর করা হচ্ছে রাস্তা সংকুচিত করে। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে নির্মাণ করার কারণে ভেঙে বন্ধ হয়ে গেছে ড্রেনের পানি চলাচল। শহরের অভ্যন্তরে সিএনজি ও ব্যাটারি গাড়ি চলাচলে নির্ধারিত কোনো স্ট্যান্ড নেই। যার কারণে সারা শহরই এখন সিএনজি স্ট্যান্ড। হাজার হাজার অবৈধ রিক্সা, অটো ও সিএনজির কারণে সড়কে চলাচল করার উপায় নেই।

পৌরসভার যান্ত্রিক বিভাগের তথ্য মতে, এখন ৮টি হাইড্রোলিক ট্রাক ও একটি বিম লিস্ট ট্রাক রয়েছে। যেগুলো চালু রয়েছে তার মধ্যে একটি দিয়ে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি মেরামত করা হয়। যার কারণে অনেক এলাকায় সেবা দিতে না পারায় অন্ধকারে থাকে।

যান্ত্রিক বিভাগ দেখাশুনা করে একটি কমিটি। সেই কমিটির সভাপতি ও পৌর কাউন্সিলর আরিফুর রহমান বলেন, এখন শহর পরিষ্কার রাখতে ১৭টি ট্রাক ভাড়া করে চালানো হচ্ছে।

বর্ধিত এলাকার সড়ক উন্নয়নে পৃথক কোনো বরাদ্দ রয়েছে কিনা জানতে চাইলে বগুড়া পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, পৌরসভার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বরাদ্দগুলো সব ওয়ার্ডের জন্য সমান। সাধ্যমতো চেষ্টা করা হচ্ছে বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার করতে।

বগুড়া পৌরসভার মেয়র রেজাউল করিম বাদশা বলেন, সমস্যা সম্পর্কে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া দাতা সংস্থা, উন্নয়ন সংস্থাসহ বিভিন্ন মহলের অর্থায়নের জন্য যোগাযোগ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সকল সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

এসএইচএস/জেআইএম