দেশজুড়ে

ফতুল্লায় ফ্ল্যাট বাসায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ, আশঙ্কাজনক আরও আটজন

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার লাল খাঁ এলাকার একটি ফ্ল্যাট বাসায় জমে থাকা গ্যাসে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (১২ নভেম্বর) সকালে লালখাঁর মোড়ে মোক্তার মিয়ার পাঁচতলা ভবনের নিচতলার ফ্ল্যাট বাসায় এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

বিস্ফোরণে পাশের আরও তিনটি বাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ফ্ল্যাটের পাঁচটি কক্ষ ও পাশের বাসার তিনটি বাড়ির তিনটি কক্ষের দেওয়াল উড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পাশের দোকাদাররা।

এ ঘটনায় দুজন নারী নিহত হয়েছেন। তারা হলেন-মায়া রানী (৪০) ও মঙ্গলী রানী (৩৫)। তারা দুজনেই পাশের বাসার বাসিন্দা। গুরুতর আহত হয়েছেন আরও আটজন। তাদের ঢাকা মেডিকেলের বার্ন উইনিটে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তারা হলেন, মো. নাছির উদ্দিন, মো. হোসেন, ঝুমা, মনি, কুলসি, রুবেল ও হৃদয় দাস। এদের মধ্যে দেড় বছরের একটি শিশুও রয়েছে।

তারা বাদেও অন্তত আরও ১৫ জন আহত হয়েছেন। তারা চিকিৎসা নিয়ে বর্তমানে আশপাশের বাসায় অবস্থান করছেন।

প্রত্যক্ষদর্শী মো. নাসির বলেন, ‘আমি শুনলাম আগুন লাগছে। এসে দেখি আমার বাসা নিচতলায় আগুন লাগছে। নিচতলা পুরাটা ধসে গেছে। দেয়াল পড়ে রয়েছে। আমরা যতটকু জানতে পেরেছি লিকেজ থেকে গ্যাসের জমাট বাধার কারণে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। আমরা এ বিষয়ে আগে অভিযোগও করেছিলাম কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

আহত বিনয় বিশ্বাস বলেন, স্ত্রীসহ বাসায় ঘুমাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে বিকট শব্দে দেওয়াল ভেঙে আমাদের ওপর পড়ে। পরে অন্যরা এসে আমাদের উদ্ধার করেন।

ভবনের দ্বিতীয় তলার ভাড়াটিয়া পিটু চন্দ্র বলেন, বিকট শব্দে ঘুম থেকে উঠে দেখি ধোঁয়ার মতো। মনে হচ্ছিল বিল্ডিং ভেঙে পড়ে যাচ্ছে। পরে দেখি জানালা ভেঙে পড়ে গেছে। এরপর দরজাও ভেঙে পড়ে যায়। আমি তাড়াতাড়ি স্ত্রী সন্তান নিয়ে বের হয়ে দেখি আগুন। আগুন দেখে হতভম্ব হয়ে পড়ি। এরপর দেখি আমার হাত কেটে গেছে।

বিস্ফোরণের সূত্রপাত মালিকপক্ষ ও গ্যাস কর্মকর্তার বক্তব্য

ভবনের মালিক মোক্তার মিয়ার মেজে ছেলে মো. শাকিল মাহমুদ বলেন, আমি তখন ঘুমিয়েছিলাম। বিকট শব্দ শুনে ঘুম থেকে জেগে উঠি। সঙ্গে সঙ্গে নিচে নামার পর দেখি আমার গ্যাসের রাইজারে আগুন। পুরো বিল্ডিং বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। দেখলাম অনেকেই দেওয়ালের নিচে চাপা পড়েছেন। পুরোটাই গ্যাসের লিকেজের কারণে হয়েছে। লিকেজের কারণে যে গ্যাস জমা ছিল সকালে উঠে কেউ চুলা জ্বালাতে গিয়ে এই বিস্ফোরণের সূত্রপাত ঘটে।

ফতুল্লা এলাকার তিতাস গ্যাস কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, আমরা নিয়মিত গ্যাসের লিকেজ চেক করি। আমরা এখান থেকে গ্যাস লিকেজের লিখিত মৌখিক কোনো অভিযোগই পাইনি। তবে জমে থাকা গ্যাস থেকে যদি বিস্ফোরণ হয় তাহলে সেটা রান্না করার চুলা থেকে জমেছে। চুলার গ্যাস বন্ধ না করে কেউ ঘুমিয়ে গেলে সকালে চুলা জ্বালানোর সময় বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে।

তদন্ত কমিটি গঠন

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোস্তাইন বিল্লাহ জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোসাম্মৎ রহিমা আক্তারকে প্রধান করে সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশসহ সাত সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। তারপর কারো কোনো গাফিলতি থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা প্রশাসনের অনুদান

এ ঘটনায় নিহতের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি আরও দুই দগ্ধ ব্যক্তিকে চিকিৎসার জন্য ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দেয়া হয়েছে।

ভবন সিলগালা

ঘটনার পর বেলা সাড়ে ১১টায় নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. তোফাজ্জল হোসেন ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফা জহুরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ভবনটি সিলগালা করে দেন। ভবনে সিলগালাযুক্ত স্টিকার ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন বলেন, ‘রান্না করা গ্যাস কোনো রুমে জমে ছিল। ওই গ্যাস থেকে এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ওই বাড়ির পাঁচটি রুমের দেওয়াল চূর্ণ হয়ে আগুন ধরে গেছে। আমাদের দুটি ইউনিট এসে আগুন নিয়ন্ত্রণ করেছে। আমরা ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই আহতদের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।’

শ্রাবণ/এসআর/এএসএম