ফিচার

অনলাইনে টিন নাম্বার করতে চাইলে (ভিডিও)

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী যে সকল নাগরিক বছরে দুই লাখ বিশ হাজার টাকা বা তার বেশি আয় করেন তাদেরকে অবশ্যই কর দিতে হবে। প্রত্যেক কর দাতার নির্দিষ্ট একটি “টিন (TIN)” নাম্বার রয়েছে। কর প্রদান ও গ্রহণের বিষয়টি সহজ ও সুন্দরভাবে করার জন্য ১০ অঙ্কের এই টিন নাম্বার প্রদান করা হয়। এত দিন টিআইএনের পুরো প্রক্রিয়া কাগুজে নথিভিত্তিক ছিল। আয়কর দেওয়া নিয়ে করদাতাদের ভোগান্তির অবসান এবং নথি সংরক্ষণব্যবস্থা সরল করার লক্ষ্যে ১ জুলাই থেকে ইলেকট্রনিক ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার বা `ই-টিআইএন` ব্যবস্থা চালু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এর ফলে এখন আর রাজস্ব টিন নাম্বারের অফিসে জন্য যেতে হবে না। ঘরে বসেই টিন নম্বর এর জন্য নিবন্ধন করা যাবে। জরুরী প্রয়োজনে যেকোনো স্থান থেকে টিন সনদ প্রিন্ট করে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পাদন করতে পারবেন। অত্যাধুনিক পদ্ধতির ডিজিটাল সিকিউরিটি থাকায় টিআইএন জাল করা যাবে না। বন্ধ হবে ভুয়া টিআইএন ব্যবহার করে নানা অপকর্মের সুযোগ। সব নিবন্ধনকারীর তথ্য ডেটাবেইজে সংরক্ষিত থাকায় একদিকে স্বচ্ছ ও দ্রুত হবে টিআইএন ব্যবস্থাপনা, অন্যদিকে করদাতারা পাবেন সহজ সেবা।সকলকে নিবন্ধন করতে হবে :নতুন বা পুরাতন সকল করদাতাকে এই নিয়মে নতুন করে নিবন্ধন করতে হবে। সকল করদাতাকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নিবন্ধন করতে হবে। এজন্য প্রথমে এনবিআরের ওয়েবসাইট (www.nbr-bd.org) এ গিয়ে ই-টিআইএন লেখার ওপর ক্লিক করতে হবে।www.incometax.gov.bd ঠিকানা থেকেও এ কার্যক্রম শুরু করা যাবে। এখানে Register বাটনে ক্লিক করে প্রাথমিক নিবন্ধন করার পর Login করতে হবে। এরপর মূল নিবন্ধন বা পুনর্নিবন্ধন ফরম আসবে।  এই ফরম পূরণ করার পর একটি নিবন্ধন নাম্বার দেওয়া হবে। নিবন্ধন নম্বর দিয়ে লগ-ইন করে যেকোনো জায়গা থেকে টিআইএন দেখা ও প্রিন্ট করা যাবে। ওয়েবসাইটের User Guide থেকেও পাওয়া যাবে এ পদ্ধতির বিস্তারিত নির্দেশাবলী।ট্যাক্স ক্যালকুলেটর :কর বা ইনকাম ট্যাক্স হিসাব করার জন্য বিশেষ ধরনের ক্যালকুলেটর রয়েছে, এটি ট্যাক্স ক্যালকুলেটর নামে পরিচিত। বাংলাদেশি কর প্রদানকারীদের জন্য অনলাইন সফটওয়্যারের মাধ্যমে এই বিশেষ ক্যালকুলেটরটি তৈরি করা হয়েছে।এই ক্যালকুলেটরের মাধ্যমে খুব সহজেই অনলাইনে আয়কর হিসাব করা যায়। এই ক্যালকুলেটরের কিছু নির্ধারিত বক্সে প্রয়োজনীয় ডাটা বসালেই ক্যালকুলেটরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোট আয় ও আয়ের ওপর প্রদেয় কর জানিয়ে দেয়। এই ক্যালকুলেটরটির মাধ্যমে কোম্পানি আয়কর ও ব্যক্তিগত আয়কর দুই ধরনের করই হিসাব করা যায়। এই ক্যালকুলেটরটির সাহায্য নিতে হলে যেতে হবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ওয়েবসাইট www.nbr-bd.org এ।রাজস্ব বোর্ডের হোমপেজের নিচের দিকে মাঝামাঝি অবস্থানে লাল রঙের ব্র‌্যাকগ্রাউন্ডের মধ্যে “ট্যাক্স ক্যালকুলেটরটি” রয়েছে। অথবা সরাসরি ট্যাক্স ক্যালকুলেটরটি পেতে চাইলে এই লিংকটি www.nbrtaxcalculatorbd.org ব্যবহার করতে পারেন।ট্যাক্স ক্যালকুলেটর পেজটি ওপেন হওয়ার পর “ইনকাম ট্যাক্স ক্যালকুলেটর” ও “ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন প্রিপারেশন” নামে আলাদা আলাদা দুটি অপশন রয়েছে। “ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন প্রিপারেশন” মূলত ক্যালকুলেটরটির একটি বর্ধিত রূপ। এটির মাধ্যমে কর হিসাব করার সাথে সাথে নির্ভুল রিটার্ন তৈরি করা যায়।“ইনকাম ট্যাক্স ক্যালকুলেটর” পেজটিতে কোম্পানি আয়কর ও ব্যক্তিগত আয়কর হিসাব করার আলাদা আলাদা ক্যালকুলেটর রয়েছে। পেজটি ওপেন হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যক্তিগত ট্যাক্স হিসাব করার ক্যালকুলেটরটি সিলেক্ট করা থাকে। পেজটির বাম পাশে কোম্পানি আয়কর হিসাব করার ক্যালকুলেটরের অপশনটি রয়েছে।ব্যক্তি আয়কর হিসাব করতে চাইলে ওIndividual Tax Calculator এবং প্রতিষ্ঠানের আয়কর হিসাব করতে চাইলে Company Tax Calculator নির্বাচন করতে হবে। এরপর প্রাথমিক তথ্য, যেমন- নাম, জন্ম তারিখ, টিআইএন ইত্যাদি ঘর পূরণ করতে হবে।ব্যক্তি আয়করের ক্যালকুলেটরের ছকে ৯টি খাত রয়েছে। এগুলো হলো বেতন, সিকিউরিটি সুদ, বাড়িভাড়া, কৃষি, ব্যবসা বা পেশা, ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রাপ্ত লভ্যাংশ, স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানের আয়, মূলধনী মুনাফা ও অন্যান্য খাতের আয়। প্রতিটি খাতে বার্ষিক আয়ের পরিমাণ বসানোর পর নিচের Total Income ও Tax Leviable Total Income ঘরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোট আয় ও তার ওপর প্রদেয় আয়কর চলে আসবে। এসব আয়ের মধ্যে কোনো কর রেয়াত থাকলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ হয়ে যাবে। যেমন- পেনশনের আয় করমুক্ত হওয়ায় এর ওপর কর দিতে হবে না। এ ছাড়া বিনিয়োগজনিত আয়কর রেয়াতের পরিমাণ জানতে চাইলে Investments ঘরে বিনিয়োগের পরিমাণ উল্লেখ করতে হবে। কোম্পানির বার্ষিক আয় ও আয়কর হিসাব করতে চাইলে এর জন্য নির্ধারিত ফরমটি পূরণ করতে হবে। এরপর সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানিয়ে দেবে মোট আয় ও তার ওপর প্রদেয় কর। হিসাব-নিকাশ শেষ করার পর Print-এ ক্লিক করে নিয়ে রিটার্নের সঙ্গে এটি সংযুক্ত করতে হবে।আয়কর হিসাবের পাশাপাশি যদি অনলাইনে রিটার্নও প্রস্তুত করতে চান, তাহলে আপনাকে নিবন্ধিত ইউজার হতে হবে। এ জন্য সাইটের হোম পেইজ থেকে নিবন্ধন করে লগ-ইন করুন। এবার রিটার্ন প্রিপারেশনের পৃষ্ঠা দেখতে পাবেন। এগুলো পূরণ করে Save বাটনে ক্লিক করে পরবর্তী সময় সংশোধন বা পরিমার্জনের জন্য সংরক্ষণ করে রাখতে পারবেন। করদাতাদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ক্যালকুলেটরটি নিয়মিত আপগ্রেড করা হয়।ই-পেমেন্ট :করদাতারা যাতে সবচেয়ে কম শ্রমে আয়কর দিতে পারেন, তাই ট্যাক্স ক্যালকুলেটরের পাশাপাশি চালু হয়েছে ই-পেমেন্ট। ফলে নিজস্ব ডেবিট কিংবা ক্রেডিট কার্ড দিয়েই কর পরিশোধ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে ফরমে টিআইএন দিয়ে ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের নম্বর দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত টাকা ট্রান্সফার হবে।  অনলাইনে ই-পেমেন্ট পদ্ধতিতে আয়কর, মূসক এবং শুল্ক ঘরে বসে বা যেকোন স্থান থেকে খুব সহজে পরিশোধ করা যাবে। করদাতা নিজে বা তার আইনানুগ প্রতিনিধি, উৎসে কর কর্তনকারী কর্তৃপক্ষসহ সকল ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা নিতে পারবেন।ই-পেমেন্ট পদ্ধতিতে কর পরিশোধের জন্য প্রাথমিকভাবে যা লাগবে: কার্যকর ই-মেইল অ্যাকাউন্ট, TIN, AIN, BIN (যেটি প্রযোজ্য), ডেবিট কার্ড, প্রি-পেইড/ক্যাশ কার্ড (সোনালী ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, জনতা ব্যাংক)।ই-পেমেন্ট পদ্ধতিতে আয়কর জমা :রেজিস্ট্রেশন: প্রথমে www.nbrepayment.org এই ওয়েবসাইটে গিয়ে রেজিস্টেশন করতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হোম পেজের নিচের দিকে ঠিক মাঝামাঝি এই পেজটির আলাদা অপশন রয়েছে। এই পেজটির ঠিক নিচের দিকে রেজিস্ট্রেশন করার অপশন রয়েছে। রেজিস্ট্রেশন ফর্মে আবেদনকারীর নাম, ঠিকানা, ই-মেইল অ্যাড্রেস, ফোন নাম্বার, লগ ইন নাম, পাসওয়ার্ড, জন্ম তারিখ, সিকিউরিটি প্রশ্নের উত্তর প্রভৃতি তথ্য প্রদান করে শর্তসমূহ ভালোমতো পড়ে "I agree and Create accont" এ ক্লিক করলেই রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়ে যাবে।  রেজিস্ট্রেশন শেষে e-payment সিস্টেম থেকে ব্যবহারকারীর ই-মেইল অ্যাকাউন্টে একটি মেইল আসবে। মেইলটিতে একটি নতুন ‘e-Pay Control Panel’ লিংক দেখা যাবে।আয়কর প্র্রদান :  ‘e-Pay Control Panel’ লিংকটিতে ক্লিক করলে যে পাতাটি ওপেন হবে, সেখানে ‘In-come Tax’ বাটনে ক্লিক করে pay Income Online সিলেক্ট করতে হবে। এখানে যে ফরমটি আসবে সেখানে কর অঞ্চল, কর সার্কেল, আয় করের ধরন ও ধারা, সংশ্লিষ্ট কর বছর ইত্যাদি তথ্য  পূরণ করে Submit বাটনে ক্লিক করতে হবে। এটি সংক্রিয়ভাবে সোনালী ব্যাংক Q-Cash পেইজ এ যাবে। এই পেইজ থেকে পেছনে আসা বা ব্যাক করা সম্ভব নয়। তবে চাইলে নতুন করে শুরু করা যাবে।অর্থ প্রদান পদ্ধতি : সোনালী ব্যাংকের পেইজ থেকে ডেবিট কার্ড বা ক্যাশ কার্ডের যে কোনো একটি সিলেক্ট করতে হবে। প্রাথমিক/ড্রাফট ই-চালান দেখতে next এ ক্লিক করতে হবে। চালানে বর্ণিত তথ্য সঠিক হলে পুনরায় next ক্লিক করতে হবে।Q-Cash এর পেইজটিতে কার্ড বা অ্যাকাউন্টের তথ্য প্রদান করতে হবে। কার্ড অনুযায়ী নাম টাইপ করার পর কার্ড এর মেয়াদের তথ্য প্রবেশ করাতে হবে। এই অংশের পুরো কাজটি করতে হবে সাবধানতার সঙ্গে, তবে দ্রুত। কোনো কাজ না করে বসে থাকলে পেইজটি expire করবে বা বাতিল হয়ে যাবে। সব ঠিক থাকলে OK ক্লিক করতে হবে।এর পরবর্তী পেইজ-এ কার্ডের/একাউন্টের গোপন পাসওয়ার্ড প্রবেশ করিয়ে Next ক্লিক করতে হবে। এতে চূড়ান্ত চালান পত্রটি দেখা যাবে। ই-পেমেন্ট সিস্টেম থেকে চালানটি প্রিন্ট, সেভ বা যে কোনো ই-মেইল অ্যাকাউন্টে করা যাবে।পরবর্তীতে যেকোন সময় লগ-ইন করে আয়করের বিস্তারিত রেকর্ড দেখা যাবে। কাজ শেষে করে অনান্য অ্যাকাউন্টের মতো সাইন আউট করতে হবে।চালান যাচাইকরণ : মূলপাতা www.nbrepayment.org থেকে verify challan iBAS থেকে যাচাই করা যাবে। এছাড়া www.nbrepayment.org এই পেইজটি থেকে প্রয়োজনীয় আরো তথ্য জানা যাবে। প্রায় একই রকম পদ্ধতিতে অনলাইনের মাধ্যমে মূসক, অনলাইন কাস্টমস ডিউটি, এবং অনান্য কর প্রদান করা যাবে।ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স/মূল্য সংযোজন কর (মূসক) :মূসক-বিষয়ক পেইটিতে রাজস্ব প্রদানকারীরা মূল্য সংযোজন কর সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য পাবেন যেগুলো তাদেরকে উক্ত খাতে রাজস্ব দিতে বিশেষভাবে সহায়তা করবে। এখানে বিভিন্ন পণ্য এবং সেবার উপর প্রযোজ্য মূসকের হার সম্পর্কে তথ্য রয়েছে। পাশাপাশি কোন কোন পণ্য মূসকের আওতায় পড়বে না সেসব বিষয়েও তথ্য দেয়া রয়েছে।এই ব্যবস্থাটি বিংশ শতাব্দীতে উদ্ভাবিত একটি আধুনিক কর যা যেকোনো ব্যবসায়ের মাধ্যমে সৃষ্ট মূল্য সংযোজনের ওপর আরোপ করা হয়ে থাকে। দেশীয় পণ্য উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রয়, বিদেশী পণ্য আমদানী ও রপ্তানী, দেশের অভ্যন্তরে সেবা বা পরিসেবার উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রয় ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে মূল্য রপ্তানী কর আরোপযোগ্য। এই কর উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রয় পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে আরোপ ও আদায় করা হলেও এর দায়ভার চূড়ান্তভাবে কেবল পণ্য বা সেবার ভোক্তাকে বহন করতে হয়।