হাজার হাজার পরিযাযী পাখির জলকেলি, শত শত দেশীয় পাখির কিচিরমিচির আর ঝাঁক বেঁধে ফসলের মাঠে পাখির বিচরণ এখন আর দেখা মিলছে না পটুয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চল কলাপাড়া-কুয়াকাটার কোনো বনে কিংবা সৈকততীরে। উপকূলীয় এ বনাঞ্চলে একসময় প্রতিনিয়ত ৫০-৬০ প্রজাতির পাখির দেখা মিললেও এখন মাত্র ১০-১৫ প্রজাতির পাখি চোখে পড়ে। শুধু তাই নয়, সংখ্যায়ও এরা খুবই নগণ্য।
কুয়াকাটা সৈকতের লেম্বুরবন সৈকত এলাকার ষাটোর্ধ্ব তৈমুর আলী জাগো নিউজকে জানান, একসময় লেম্বুরবনের জঙ্গলে ঢুকলে ভয় লাগতো। ৩০ থেকে ৪০ মিনিট হেঁটে জঙ্গলের এপাশ থেকে ওপাশে যেতে হতো। কত পাখি আর পাখির বাসা ছিল! বিভিন্ন রংয়ের-সাইজের সব পাখি চিনতামও না। এখন পাখিতো দূরের কথা, জঙ্গলও নেই।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বনের আয়তন কমে যাওয়া, বন উজাড় হওয়া, বন সংরক্ষণ না থাকা, কিছু স্থানে বন থাকলেও লোকালয় তৈরি হওয়া, ফসলের জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করাসহ বেশকিছু কারণে পাখি কমতে শুরু করছে।
আব্দুল খালেক (৭০) পেশায় একজন কৃষক। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা কৃষিকাজ করছি বিগত ৪০ বছর ধরে। তখন গরু দিয়ে হাল চাষ করতাম। জমিতে চাষ করলে জমির নিচ থেকে বিভিন্ন পোকামাকড় উঠে আসতো। এগুলো হেঁটে হেঁটে খাওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠতো পাখি। যে জমিতে চাষ করতাম সেখানে, ফসলের ক্ষেতে সবসময় পাখিদের উপস্থিতি থাকতো। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে আগের মতো আর পাখি দেখা যাচ্ছে না।’
স্থানীয় ও পাখি নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চল কলাপাড়া-কুয়াকাটার বনগুলোতে দোয়েল, কাক, বন মোরগ, চড়ুই, পায়রা, রাজ, ধনসে, টিয়া, হাঁস, প্যারা শুমচা, ছাতারে, নাইটিংগেল, ময়ূর, মৌটুসি, দর্জি পাখি, রাঙা মানকিজোড়, কালো মাথা কাস্তচের, ময়না, বুলবুল, টুনটুনি, চিল, পানকৌড়ি, ডাহুক, বালিহাঁস, কোকিল, বক, শালিক, ঘুঘু, বাবুই, কাঠঠোকরা, কোকিল, ডাহুক, ঘুঘু, বাবুই, শালিক, টুনটুনি, মাছরাঙা, টেইটেরা, গোমড়া ও প্যাঁচাসহ নাম জানা না জানা বিভিন্ন প্রজাতির পাখির দেখা মিলতো অনায়াসে। কিন্তু বসবাসের স্থান, খাবারের সংকট ও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে এখন অনেক প্রজাতির পাখি বিলীন হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কলাপাড়া জোনের সাধারণ সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘পাখির অন্যতম খাবার নদী, জলাশয় ও কূপের পানি। অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে জায়গাগুলোতে অতিরিক্ত পলি জমে যাচ্ছে। যা পাখি বিলীনের অন্যতম কারণ।’
উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের উপ-সহকারী কর্মকর্তা সুভাষিত মজুমদার জাগো নিউজকে জানান, পাখির অভয়াশ্রম যেখানেই কম সেখানেই পাখি কমতে থাকবে। এই অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কিছু কিছু বনাঞ্চল লবণাক্ত হয়ে গেছে। আর লবণাক্ত এলাকায় পাখির খাবার সংকট দেখা দেয়। যে কারণে পাখি কমছে এমনটা বলা যেতে পারে।
পাখির টিকে থাকার জন্য উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে অভয়াশ্রম দরকার বলে মনে করেন বরিশাল সরকারি বিএম কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাজমাতুস সাকিবা।
তিনি বলেন, ‘পাখির প্রজননের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ও অভয়াশ্রম দরকার। তবে এই অঞ্চলগুলোতো এখন অভয়াশ্রম নেই। যে কারণে প্রজননের জন্য বড় বাঁধা। এজন্য দিন দিন পাখি কমে যাচ্ছে।’
জানতে চাইলে পটুয়াখালী বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল-মামুন জাগো নিউজকে বলেন, বনভূমি হলো পাখিদের আসল আবাসস্থল। কিন্তু এ পর্যন্ত উপকূলীয় এই অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রায় দুই হাজার একর বনভূমি সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়েছে। পাখি কমে যাওয়ার এটা অন্যতম করণ।
‘পাখির খাদ্য তালিকায় যেসব গাছের ফল-ফলাদি রয়েছে সেগুলোও অনেকটা নেই। এটাও অনেক বড় একটা সমস্যা। তাই আমরা কুয়াকাটার অদূরবর্তী সমুদ্রে গড়ে ওঠা চরবিজয়ে ৫০ হেক্টর জমিতে বট, কেওড়া, বাইনগাছসহ বিভিন্ন গাছের চারা রোপণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অল্পদিনের মধ্যেই কাজ শুরু করবো। আশা করছি ধীরে ধীরে কিছুটা হলেও পাখির অভয়াশ্রম বাড়বে। সেই সঙ্গে পাখির সংখ্যাও বাড়বে।’
আসাদুজ্জামান মিরাজ/এসআর/জেআইএম