মতামত

তিরিশে নির্মূল কমিটি ও প্রজন্মের প্রত্যাশা

নির্মূল কমিটির সর্বশেষ জাতীয় সম্মেলনে আমাকে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদকীয় পদে নির্বাচিত করা হয়। সেই থেকে নির্মূল কমিটির সাথে আমার সাংগঠনিক যোগাযোগের শুরু। তবে সংগঠনটির সাথে আমার চেনা-জানা বহু বছরের, বলতে গেলে বৈবাহিক সূত্রে।

Advertisement

৯৬’এ বিয়ের পর থেকেই দেখে আসছি আমার শাশুড়ি শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধূরী কি প্রচণ্ড আবেগ নিয়ে এই সংগঠনটি করে আসছেন। আমার স্ত্রী অধ্যাপক ডা. নুজহাত চৌধুরীও নির্মূল কমিটিতে সক্রিয় দীর্ঘদিন ধরে। দুজনই এখন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। কাজেই সংগঠনটিকে খুব কাছ থেকে দেখার, চেনার বিস্তর সুযোগ আমার হয়েছে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সেই কবে থেকে সোচ্চার নির্মূল কমিটি। আশির দশকের শেষের দিকে আর নব্বইয়ের গনঅভ্যুত্থান পরবর্তী বিএনপি সরকারের তথাকথিত গণতান্ত্রিক শাসনামালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে নির্মূল কমিটির আন্দোলন আর গণআদালত ছিল আমাদের জন্য আশা জাগানিয়া। আশির দশকের শেষের দিকে আরো অনেকের মতই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মাধ্যমে আমার প্রগতিশীল রাজনীতিতে হাতেখড়ি।

বঙ্গবন্ধু আর একাত্তরকে আরো ভারো করে চেনার, বোঝার সেই থেকে শুরু। সেই সময়টা ছিল জয় বাংলার নিষিদ্ধকাল। আর নিষিদ্ধ সেই সময়ে আমরা শ্লোগান দিতাম, ‘সাঈদী-নিজামী ভাই ভাই, এক রশিতে ফাঁসি চাই’। শ্লোগান দিতাম এই বিশ্বাস থেকে যে লাখো শহীদের রক্তে সিক্ত এই বাংলায় যুদ্ধাপরাধের বিচার হতেই হবে। জানতাম না কবে? কিভাবে? আর এই বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখায় নির্মূল কমিটি আমাদের অসম্ভব শক্তি যুগিয়েছে, আশা জাগিয়েছে।

Advertisement

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের রশিতে ঝুলেছে একের পর এক যুদ্ধাপরাধী। আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে দাবিতে জনমত সংগঠিত করা ও ধরে রাখায় আর একের পর এক নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি বিজয় ছিনিয়ে আনায় নির্মূল কমিটির অবদান ছিল প্রণিধানযোগ্য।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া আরম্ভ হবার পর অনেককেই বলতে শুনেছি এখন আর নির্মূল কমিটির কি দরকার? আর কি-ই বা প্রয়োজন আন্দোলনটিকে জিইয়ে রাখার? মুক্তিযুদ্ধে চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় নির্মূল কমিটির প্রয়োজনীয়তা যে কত বেশি তার উদাহরণ আছে আরো ভূরি-ভূরি। ডাক্তারি করার সুবিধাটা হচ্ছে এই যে প্রতিদিন চেম্বারে নানা পেশার অনেক মানুষকে চেনার, জানার সুযোগ হয়।

আমি প্রাত্যহিকই এই সুযোগটাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করি আমাদের সমাজটাকে আরেকটু ভালো করে বোঝার জন্য। ইদানিং অবাক হয়ে দেখি এদেশে মৌলবাদ মাঝে-সাঝেই মাথাচাড়া দেয়ার দুঃসাহস দেখায়। একই কথা প্রযোজ্য প্রবাসে আমাদের ডায়াস্পোরার বেলায়ও। আমার পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের একটা অংশ লন্ডনে। বিলেতে থাকার সময় আমি প্রায় দু’বছর কাজ করেছি হোয়াইট চ্যাপেলের রয়েল লন্ডন হাসপাতালে। হাসপাতালটা লন্ডনের বাংলা টাউনের ঠিক বিপরীতে। ’৯৯-এ লন্ডন থেকে পাকাপাকিভাবে দেশে ফেরার পর লন্ডনে যাওয়া পড়েছে বেশ ক’বারই, কিন্তু কেন যেন যাওয়া হয়ে উঠেনি স্মৃতি বিজড়িত ইস্ট লন্ডনে।

গেলাম আবার ২০১৫-তে। সেবারে আমার লন্ডন যাওয়া নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় ও ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দের সাথে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য, ব্রিটিশ রাজনীতিবীদ আর সিভিল সোসাইটির কাছে বাংলাদেশে চলমান যুদ্ধাপরাধের বিচারের স্বচ্ছতা আর যৌক্তিকতা তুলে ধরা। পাশাপাশি সে দেশে বসবাসরত বাঙালি বংশোদ্ভূতদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশকে পরিচিত করে তোলাও। অবাক হয়ে সেবার ব্রিকলেনে দেখেছি ‘আলবদর রেস্টুরেন্ট’।

Advertisement

ইস্ট লন্ডন মস্কের প্রভাবে আর মসজিদে মসজিদে পাকিস্তানী আর আফগান ইমামদের কাছ থেকে ইউকে প্রবাসী বাঙালিদের অনেকেরই প্রথমবারেরমত ইসলামের সাথে পরিচয়। তাদের অনেকের হৃদয়েই তাই রক্তক্ষরণ হয় সিরীয় শরণার্থীদের দুদর্শায় আর তাদের জাকাত চলে যায় গাজায় কিংবা সানায়। এতে দোষের কিছুই নেই। শুধু খারাপ লাগে যখন দেখি বাংলাদেশ আর বাঙালির ভালো-মন্দগুলো তাদের সেভাবে আন্দোলিত করে না।

তাদের অনেকেই বাংলাদেশটাকে বাংলাদেশের মত করে চেনেন না। আর এই চেনানোর-শেখানোর জায়গাটাতে ইউরোপসহ সাড়া পৃথিবীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নির্মূল কমিটির শাখাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। সত্যি বলতে কি আমার ধারণা আওয়ামী লীগের শাখাগুলোকে বাদ দিলে, দেশের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির এমন সরব উপস্থিতি আর নেই।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নির্মূল কমিটির আরো নানামুখী কর্মকাণ্ড রয়েছে। অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে নির্মূল কমিটির শাখা আছে পাকিস্তান আর ভারতেও। পাকিস্তানের সাথে আমাদের অমিমাংসিত ইস্যু ইয়ত্তাহীন। একাত্তর পরবর্তী পাকিস্তানের একের পর এক সরকার বাংলাদেশের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো নির্লজ্জভাবে বরখেলাপ করেছে।

বিচার হয়নি যুদ্ধাপরাধী পাক সেনাসদস্যদের, ক্ষতিপূরণও পায়নি বাংলাদেশ। আটকে পড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়া তো দূরে থাক, একাত্তরের কৃতকর্মের জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনার উদারতাটুকুও এখন পর্যন্ত দেখাতে পারেনি পাকিস্তান। আর এসব বিষয়ে পাকিস্তানের সিভিল সোসাইটিতে বাংলাদেশের পক্ষে সবচেয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর নির্মূল কমিটি পাকিস্তান শাখাটিই।

অন্যদিকে নির্মূল কমিটির ভারতীয় শাখার ভূমিকাটি একেবারেই ভিন্নধর্মী। একথা সর্বজনবিদিত যে বাংলাদেশে যেমন রয়েছে ভারত বিরোধী প্রচারণা, তেমনি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কথা বলার লোক সেদেশেও কম নেই। একথা অস্বীকার করার উপায় নাই যে, ’৪৭-এ দেশ ভাগের পর থেকে এ দেশে হিন্দু জনসংখ্যা শুধুই কমেছে। বিশেষ করে যখনই আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোন সরকার এদেশে ক্ষমতায় এসেছে তখনই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আমরা খুলনার সরকার পাড়া আর যশোরের মালো পাড়ার মতন ঘটনাগুলো ঘটতে দেখেছি।

সঙ্গত কারণেই গত বিএনপি সরকারের সময় এদেশে হিন্দু জনসংখ্যা সর্বকালের সর্বনিন্ম আট শতাংশের তলানীতে এসে ঠেকেছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আবারো ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করে। ভারত ভাগের পর প্রথমবারের মত এদেশে হিন্দু জনসংখ্যার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণাতা লক্ষ করা যায়, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে বারো শতাংশের আশে-পাশে। কিন্তু বাংলাদেশের আজকের এই যে পরিবর্তিত পরিস্থিতি এ নিয়ে সঠিক ধারণা নেই ভারতে অনেকেরই। বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পরিক সহযোগিতা আর দু’দেশের প্রায় ১৫০ কোটি মানুষের যে বিশাল বাজার, পরস্পরের স্বার্থে তার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের উন্নতির পারদ যে আরো ঊর্ধ্বমুখী হবে এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নাই।

তাছাড়া এ দু’দেশের পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা, মৌলবাদ দমন আর বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। সঙ্গত কারণেই এ বিষয়গুলো অনেকেরই অপছন্দের। সীমান্তের এপারের মত ওপারেও অপপ্রচারে সক্রিয় এরা। আর এসব অপপ্রচারে জবাব দেয়া আর পাশাপাশি ভারতের জনগণ আর সুশীল সমাজের সামনে বাংলাদেশ সম্বন্ধে স্বচ্ছ ও সঠিক ধারণা তুলে ধরায় নির্মূল কমিটি ভারতীয় শাখাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ঠিক একইভাবে এদেশে নির্মূল কমিটি সক্রিয় আমাদের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে। এদেশে যখনই সংখ্যালঘুদের প্রতি কোন অন্যায় করা হয়েছে তখনই পাশে থেকেছে নির্মূল কমিটি। থেকেছে মালো পাড়ায়, সরকার পাড়ায়, নাসিরনগরে আর বোরহানউদ্দিনেও। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনোত্তর যে হিন্দু নিপীড়ন আমরা বিএনপি সরকারগুলোর সময়ে এদেশে দেখেছি তা যে কোন বর্বরতাকে হার মানাতে বাধ্য।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকায় এমন সংখ্যালঘু নির্যাতন আধুনিক সমাজে বিরল। এই সময়গুলোতে আর পাশাপাশি সারা বছর ধরে সংখ্যালঘু আর প্রয়োজনে নিপীড়িত সংখ্যাগুরুর পাশে দাঁড়ানোর জন্য নির্মূল কমিটি উদ্যোগে গঠিত হয়েছে স্থায়ী চিকিৎসা ও আইন সহায়তা কমিটি। পাশাপাশি যে কোন জাতীয় ইস্যুতে সিভিল সোসাইটিকে মোবিলাইজ করার গুরু দায়িত্বটিও বরাবরই পালন করে আসছে নির্মূল কমিটি।

২০২০-এর শেষে যখন অর্বাচিন মামুনুল মাওলানা বঙ্গবন্ধুর ভার্স্কযকে বুড়িগঙ্গায় ছুঁড়ে ফেলার ঔদ্ধত্য দেখিয়েছিল, তখন তার বিরুদ্ধে সিভিল সোসাইটির প্রথম প্রতিরোধ নির্মূল কমিটির হাত ধরেই। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে কেন্দ্র করে ২০২০-এর ডিসেম্বরের শুরুতে নির্মূল কমিটির যে লক্ষ্যাধিক লোকের মানববন্ধন তারপরই বাংলাদেশের জেগে উঠা আর পিছু হটা মৌলবাদী চক্রের।

দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠিকে নিয়েও কাজ করছে সংগঠনটি। আগামীর সুন্দর ও বসবাসযোগ্য বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় নির্মূল কমিটির রয়েছে বহুমাত্রিক উদ্যোগ। মানবতাবিরোধী অপরাধে বিরুদ্ধেই যে শুধু সক্রিয় থেকেছে নির্মূল কমিটি তাই নয়, এগিয়ে এসেছে পরিবেশ সংরক্ষণেও। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি বড় অর্জন পরিবেশ বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক আন্দোলনে নেতৃত্বে প্রদান। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগের সমর্থনে দেশে-বিদেশে নির্মূল কমিটির আছে নানামুখী আয়োজন। দেশে ত্রিশ লাখ শহীদের স্মরণে নির্মূল কমিটির ত্রিশ লাখ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবন চত্বরে চত্বরে নিজ হাতে গাছ লাগিয়ে।

এই কোভিডকালেও বসে ছিল না নির্মূল কমিটি। প্যান্ডেমিক শুরুর আগেই সারা দেশে নির্মূল কমিটির পক্ষ থেকে বিতরণ করা হয়েছিল সচেতনতামূলক লিফলেট। আর প্রথম ওয়েভের ধাক্কায় যখন নড়বড়ে প্রচলিত স্বাস্থ্যখাত, নির্মূল কমিটির চিকিৎসা সহায়ক কমিটির উদ্যোগে সে সময় প্রায় শতাধিক চিকিৎসক অনলাইনে সারা দেশের মানুষের চিকিৎসার চাহিদা পূরণে সচেষ্ট ছিলেন। নির্মূল কমিটির সদস্যরা সারা দেশে তাদের সীমিত সামর্থ্য নিয়ে কোভিডের ধাক্কায় পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে কখনো খাদ্য বা অর্থ সহায়তা তো কখনো পিপিই নিয়ে।

অন্যদিকে রোহিঙ্গা সমস্যার একটি অর্থবহ সমাধান খুঁজে বের করায়ও নির্মূল কমিটির উদ্যোগ লক্ষণীয়। মিয়ানমারের সিভিল সোসাইটির সাথে সংযোগস্থাপন ও রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের বিষয়ে সে দেশের ইতিবাচক জনমত গড়ে তোলায়ও ভূমিকা রাখছে সংগঠনটি। অন্যদিকে নির্মূল কমিটির উদ্যোগে গঠিত গণতদন্ত কমিশন এবারের রোহিঙ্গা সমস্যা শুরু হওয়ার পরপরই কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে সরেজমিনে তদন্ত কাজ চালায়।

আমার নিজরেও সুযোগ হয়েছিল এই কমিশনের সাথে কুতুপালং আর বালুখালির শিবিরগুলোতে যাওয়ার। ১০ হাজারেরও বেশি নির্যাতিত রোহিঙ্গার যে সাক্ষ্য এখন নির্মূল কমিটির হেফাজতে আছে তা আন্তর্জাতিক আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে দোষী সাবস্ত্য করায় গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে।

রোহিঙ্গা সমস্যার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হচ্ছে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ‘আরসা’সহ নানা মৌলবাদী গোষ্ঠীর সক্রিয় উপস্থিতি। ‘আইএস’-যে এই ইস্যুকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু অংশ নিয়ে একটি নতুন খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছে এনিয়ে তারা অন্তত কোন রাখ-ঢাক করেনি। এই বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়কে সচেতন করে তোলায় নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে নির্মূল কমিটি।

পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে যে হোম গ্রোন ও ইমপোর্টেড মৌলবাদ, তার কার্যকরণও খুঁচিয়ে-খুটিয়ে উদঘাটনে সচেষ্ট নির্মূল কমিটি। আমরা অনেকেই বিস্মৃত হয়েছি যে একাত্তরে বাঙালির রক্তে লাল হয়নি শুধু জামায়াতিদের হাত, বাঙালি নিধনের মহাযজ্ঞে সেদিন মেতেছিল নেজামী ইসলাম, মুসলিম লীগসহ আরো অনেকেই। সেদিনের জামায়াত আর তাদের আজকের ছানা-পোনাদের মুখোশ আজ আমাদের সামনে উন্মোচিত।

আমরা রাজাকার, আলবদর আর আলশামস আর আজকের জামায়াতী ইসলাম-ছাত্র শিবির-ইসলামী ছাত্রী সংস্থা-আমার বাংলাদেশ পার্টির ইত্যাদি সম্বন্ধে সম্মকভাবে ওয়াকিবহাল। কিন্তু কজনের মনে আছে মুজাহিদ বাহিনীর কথা যারা একাত্তরে রাজাকার-আলবদর-আলশামসের মতই বাঙালির বিরুদ্ধে নির্বিচারে মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হয়েছিল?

কজনই বা আমরা জানি যে সেদিনের সেই নেজামী ইসলাম আর মুজাহিদ বাহিনীর উত্তরসূরিই মূলত আজকের হেফাজতে ইসলাম? এদেশে গত প্রায় দু’দশকের মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার পোস্টমর্টেমের উদ্যোগ নিয়েছে নির্মূল কমিটি। সামনেই দুইটি বৃহৎ খণ্ডে প্রকাশিত হবে জঙ্গি, মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস তদন্তে নির্মূল কমিটি ও জাতীয় সংসদের আদিবাসী ও সংখ্যালঘু ককাসের উদ্যোগে গঠিত গণতদন্ত কমিশনের শ্বেতপত্রটি যা অতীত ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য একটি অসম্ভব প্রয়োজনীয় দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে।

একইভাবে একাত্তরে নিজেদের অপকীর্তিগুলো ভুলিয়ে দেয়ায় পাকিস্তানিদের যে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ তার বিরুদ্ধেও বিশ্ব অঙ্গনে জনমত সংগঠিত করায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে নির্মূল কমিটির সদস্যরা ঢাকায় আর ইউরোপের দেশে দেশে। এদেশে একাত্তরে সংগঠিত গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়ের নির্মূল কমিটির যে চলমান উদ্যোগ শুধু তা নিয়েই একটি বৃহৎ প্রবন্ধ রচনার সুযোগ রয়েছে।

একাত্তরে পাকিস্তানের বিপর্যয়ে যাদের আশাভঙ্গ হয়েছিল গুটিকয় ফাঁসি আর জামায়াতে ইসলামের নিবন্ধন বাতিলে তারা বিলুপ্ত হয়েছে এমনটি মনে করারও কোন কারণ নেই। আমরা যদি মনে করে থাকি যে একাত্তরে বাংলাদেশ আর আমাদের মিত্রশক্তি ভারতের সাথে যুদ্ধটা হয়েছিল শুধুই পাকিস্তানের তাহলে আমাদের চেয়ে বোকার স্বর্গে বেশি বোধহয় আর কেউ বাস করছে না।

একাত্তরে পাকিস্তানের সক্রিয় সহযোগী ছিল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঙালিও। শুধু রাজাকার বাহিনীতেই সক্রিয় সদস্যের সংখ্যা ছিল পঞ্চাশ হাজারের মত। এইসব বাঙালি দালালদের সহযোগিতা ছাড়া তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বড়-বড় ক্যান্টনমেন্টগুলোতে ‘ফোর্ট ফরমেশনে’ থাকা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে কখনোই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেয়ে গণহত্যা আর মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটানো সম্ভব হত না।

মনে রাখতে হবে একাত্তরে এদেশে যুদ্ধরত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ এদেশে এসেছিল যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে-আগে। আর মুক্তিযুদ্ধের শেষভাগে যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড তার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যেকোন সদস্যের চেয়ে তাদের এদেশীয় দালালদের দায়-দায়িত্ব বহুগুণ বেশি।

স্বাধীন বাংলাদেশের এই যে প্রায় পঞ্চাশ বছরের পথ চলা, হিসেব করলে দেখবেন আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতার টানা তেরটি বছর বিবেচনায় নিলেও এই পঞ্চাশটি বছরের মধ্যে বেশিরভাগ সময়ই এদেশে ক্ষমতায় ছিল স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি। এরা যখনই সুযোগ পেয়েছে চেষ্টা করেছে একাত্তরে তাদের বিপর্যয়ের প্রতিশোধ নেয়ার। রোহিঙ্গা সমস্যার মত ইস্যুগুলো তাদের জন্য পোয়াবারো। কাজেই ঘরের কাছে খেলাফত প্রতিষ্ঠা শুধু ’আইএস-আইএসআই’-এরই স্বপ্ন নয়, এ স্বপ্নে বিভোর বাংলাদেশীর সংখ্যাও একেবারে কম নয়।

তারচেয়ে বড় কথা, সংখ্যায় এরা যাই হোক না কেন এরা এদেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নাদুস-নুদুস হওয়ার সুযোগ পেয়েছে দীর্ঘদিন। কাজেই শুধুমাত্র সিটিটিবি আর র‌্যাবের ভরসায় বসে থাকাটা হবে আত্মঘাতী। এ ব্যাপারে পূর্ণমাত্রায় সচেতন নির্মূল কমিটি আর সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা সংগঠনটির শতাধিক শাখা আর লক্ষাধিক কর্মী সমর্থক।

বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে শেখ হাসিনার হাত ধরে একাত্তরের চেতনায় একটি উন্নত কিন্তু অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় শাহরিয়ার কবির-শ্যামলী নাসরিন চৌধূরী-কাজী মুকুলদের প্রয়াস অব্যাহত থাক - মুজিববর্ষ, বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্মবার্ষিকীর প্লাটিনাম জুবিলী উদযাপন শেষে যে নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হবে, সেই বাংলাদেশ হোক পাকিস্তানী প্রেতাত্মা মুক্ত, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক- নির্মূল কমিটির ৩০ বছরে এতটুকুই প্রত্যাশা।

লেখক : ডিভিশন প্রধান, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশনবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও অর্থ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

এইচআর/এমএস