মাঘের শেষে আকস্মিক বৃষ্টিতে নওগাঁয় ইটভাটার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাতের বৃষ্টিতে জেলার ১৫৭টি ইটভাটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ভাটার খলিয়ানে থাকা বেশিরভাগ কাঁচা ইট নষ্ট হয়ে গেছে। বৃষ্টিতে প্রায় ৬০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভাটার মালিকরা।
নওগাঁ জেলা ইটভাটা মালিক সমিতি সূত্রে জানা যায়, জেলায় বর্তমানে পরিবেশবান্ধব ও স্থায়ী চিমনির ১৫৭টি ইটভাটা রয়েছে। প্রতি বছর ভাটাপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ ইট পোড়ানো হয়। এসব ইটভাটায় পোড়ানোর অপেক্ষায় তৈরি প্রায় ১৫ কোটি কাঁচা ইট বৃষ্টির পানিতে গলে গেছে। প্রতিটি ইট তৈরিতে খরচ হয় চার টাকা। সে হিসাবে ৬০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
জেলায় বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হয়ে শুক্রবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেল পর্যন্ত দফায় দফায় বৃষ্টি হয়। এছাড়া শনিবার ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দফা বৃষ্টি হয়। বৃষ্টিতে ইটভাটায় পোড়ানোর অপেক্ষায় খলিয়ানে থাকা কাঁচা ইট গলে নষ্ট হয়েছে। অনেক আধা শুকনা ইটে বৃষ্টির পানিতে দাগ পড়েছে। ভাটাগুলোতে কোনো পূর্ব প্রস্তুতি না থাকায় খলিয়ানে থাকায় এসব ইট রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তবে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখায় কিছু ইট ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছে।
ভাটা মালিকরা বলছেন, বৃষ্টির পানিতে কাঁচা ইট নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন তাদের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হবে। নষ্ট ইটগুলো আঙিনা থেকে সরিয়ে পুনরায় পানি দিয়ে নরম করে ইট তৈরি করতে হবে। এতে সময়, শ্রম ও অর্থ—সবদিক থেকেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
সরেজমিন শনিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সদর উপজেলার বরুনকান্দি, শিবপুর, বোয়ালিয়া পাহাড়পুর, কীর্তিপুর ও শশীর মোড় এলাকার বিভিন্ন ইটভাটায় গিয়ে দেখা যায়, খলিয়ানে শুকানোর জন্য প্রস্তুত করে রাখা কাঁচা ইট বৃষ্টির পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। ইটগুলো গলে কাদা হয়ে গেছে। কিছু কাঁচা ইট খামাল (জড়ো করে) করে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। এছাড়া চুল্লিতে পোড়ানোর জন্য সাজানো ইটও গলে গেছে।
সদর উপজেলার শশীর মোড় এলাকায় মেসার্স ভাই ভাই ব্রিকস (বিবিসি) ইটভাটার মালিক মাজেদুর রহমান বলেন, ‘আমার পাঁচটি ইটভাটা আছে। হঠাৎ বৃষ্টিতে খলিয়ানে থাকা কাঁচা ইট পলিথিন দিয়ে ঢাকা সম্ভব হয়নি। বৃষ্টিতে খলিয়ানে থাকা প্রায় এক কোটি কাঁচা ইট নষ্ট হয়ে কাদা হয়ে গেছে। এতে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এসব মাটি খলিয়ান থেকে সরিয়ে আবারও শোধন করে ইট তৈরি করতে বাড়তি টাকা খরচ হবে।’
সদর উপজেলার পাহাড়পুর এলাকায় অবস্থিত মেসার্স ডলি ব্রিকস ফিল্ড (ডিবিএফ)। ভাটার ম্যানেজার তসলিম উদ্দিন বলেন, ভাটায় চুল্লিতে প্রতি রাউন্ডে প্রায় ছয় লাখ ইট পোড়ানো যায়। প্রতি বছর পোড়ানো হয় প্রায় ৫০ লাখ পিস ইট। গত বছর বৃষ্টিতে সামান্য পরিমাণ কাঁচা ইট নষ্ট হয়েছিল। তবে এ বছর হঠাৎ বৃষ্টিতে চারটি খলিয়ানে থাকা প্রায় ১৬ লাখ পিস কাঁচা ইট কাদা হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, গত দুদিন থেকে শ্রমিকদের বসে বসে মজুরি ও খেতে দিতে হচ্ছে। প্রতিদিন ১২ হাজার টাকা মজুরিসহ খরচ হচ্ছে। সে হিসাবে ১০ দিনে (খলিয়ান শুকাতে আরও আটদিন লাগবে হিসাবে ধরে) মজুরিসহ খরচ হবে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। হঠাৎ বৃষ্টিতে এ মৌসুমে প্রায় এক কোটি টাকা লোকসান হবে বলে জানান তিনি।
বদলগাছী কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, শুক্রবার ভোর ৬টা থেকে শনিবার ভোর ৬টা পর্যন্ত জেলায় ৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
নওগাঁ জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি কাঁচা ইটের উৎপাদন খরচ চার টাকা ধরা হলেও ভাটার মালিকদের প্রায় ৬০ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হবে। বৃষ্টিতে প্রত্যেক ইটভাটা মালিকের সর্বনিম্ন ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি।
আব্বাস আলী/এসআর/জেআইএম