খাদ্যশস্য উৎপাদনে উত্তরের জেলা হিসেবে পরিচিত নওগাঁ। ধান-চাল উৎপাদনের জেলা হয়েও এখানে দফায় দফায় বাড়ছে চালের দাম। আমনেও যেন সুখ নেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। এখনো বাড়তি দামেই কিনতে হচ্ছে চাল। গত ১৫ দিনের ব্যবধানে সরু চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ২-৩ টাকা। চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় মিল মালিকদের দুষছেন ব্যবসায়ীরা। তবে মিল মালিকরা বলছেন বাজারে ধানের দাম বেশি। এছাড়া মিলের অন্যান্য খরচ ধরে চাল বিক্রি করায় কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের।
চালের দাম বাড়লে বিপাকে পড়েন খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষ। তবে চালের বাজার স্বাভাবিক রাখতে ও মিল মালিকদের লাগাম টেনে ধরতে চাল আমদানি করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতনরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত বোরো মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৮৭ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছিল। এ পরিমাণ জমি থেকে চালের উৎপাদন হয় ৮ লাখ ১৮ হাজার ২৩৬ মেট্রিক টন। চিকন জাতের ধানের উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৩০ হেক্টর জমিতে। এ পরিমাণ জমি থেকে ধান উৎপাদন হয় ৬ লাখ ২৮ হাজার মেট্রিক টন এবং চাল ৪ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন।
জেলার পাইকারি চাল বাজার সূত্রে জানা যায়, প্রতি কেজি সরু চালে ২-৩ টাকা বেড়ে কাটারিভোগ ৫৮-৬০ টাকা ও নাজিরশাইল ৬০-৬১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া মোটা চাল স্বর্ণা-৫ বিক্রি হচ্ছে ৩৯-৪০ টাকা কেজি।
পৌর খুচরা চাল বাজার সূত্রে জানা যায়, সরু চালের মধ্যে রনজিত ৫০-৫২ টাকা, ব্রি-২৮-৫০-৫৫ টাকা, জিরাশাইল ৬০-৬৫ টাকা, কাটারি ৬৫-৬৬ টাকা। মোটা চাল স্বর্ণা-৫-৪২-৪৫ টাকা। সুগন্ধি চাল আতব ৮৫-৯০ টাকা। গত ১৫ দিনের ব্যবধানে সরু জাতের চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ২-৩ টাকা।
সরু ও মাঝারি চাল হিসেবে পরিচিত জিরাশাইল ও কাটারিভোগ ধান। প্রতি বছর ইরি-বোরো মৌসুমে এ জাতের ধান উৎপাদন হয় যা সারা বছর যোগান দিতে হয়। এ ধান থেকে বছরে ৮ থেকে ৯ মাস চাহিদা পূরণের পর শেষ সময় এসে দাম বাড়তে থাকে।
মানুষের খাদ্যভাস পরিবর্তন হওয়ায় সরু জাতের চালের ভাত খেয়ে অভ্যস্ত হয়েছে। এখন দিনমজুর থেকে শুরু করে সব শ্রেণিপেশার মানুষ সরু জাতের চালের ভাত খেতে অভ্যস্ত। বছরের শেষ সময় এসে সরু ধানের সংকট হওয়ায় চালেরও সংকট পড়ে। এতে স্বাভাবিকভাবেই সরু চালের দাম বেড়ে যায় বলে জানিয়েছেন ধান-চাল ব্যবসায়ীরা।
শহরের আনন্দনগর মহল্লার শ্রমজীবী আলী কবিরাজ বলেন, ট্রাক ও ট্রাক্টরে মাল ওঠা-নামানোর কাজ করি। আগে শ্রমিকদের হাতে প্রচুর কাজ ছিল। কিন্তু এখন কাজ কমে গেছে। বর্তমান সময়ে কখনো ৩০০ টাকা, আবার কখনো ৫০-১০০ টাকা দিনে কাজ হয়। আবার কোনোদিন কাজ হয় না। ভ্যান-রিকশাও চালাতে পারিনা। বাড়িতে তিন সদস্য। প্রতিদিন এক কেজি চাল লাগে সঙ্গে তরকারি। নিয়মিত কাজ না হওয়ায় আয় কমে গেছে। কিন্তু খরচ বেড়েছে। কাজ না হলে দোকানে বাকিতে জিনিসপত্র নিতে হয়। চাল ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমলে আমাদের মতো শ্রমজীবীদের জন্য সুবিধা হবে।
খুচরা বাজারের ভাই ভাই খাদ্য ভান্ডারের প্রোপাইটর রাশিদুল ইসলাম বলেন, সরু চালের আদমানি কম থাকায় দাম বেড়েছে। বাজারে এসে ভ্যানচালক ও দিনমজুররাও সরু চালের খোঁজ করছেন। দাম বেশি হলেও তারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তবে আগের তুলনায় বেঁচাকেনা কমছে। মোটা চাল বিক্রি হয় তবে তুলনামূলক কম।
পাইকারি ব্যবসায়ী আয়েন উদ্দিন মোল্লা অ্যান্ড সন্স’র ম্যানেজার নিতাই সাহা বলেন, গত ১৫ দিনের ব্যবধানে সরু চালের কেজি ২-৩ টাকা বেড়েছে। তবে মোটা চালের দাম স্বাভাবিক রয়েছে।
ধান ব্যবসায়ী রিপন বলেন, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিমণ ধানে ৩০-৪০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে প্রতিমণ ধান পাইজাম ১৩৮০-১৪০০ টাকা, কাটারি ১৫০০-১৫৫০ টাকা, মিনিকেট ১৪০০-১৪২০ টাকা এবং স্বর্ণা-৫-১০৫০-১০৭০ টাকা।
নওগাঁ শহরের পৌর খুচরা চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক উত্তম কুমার সরকার বলেন, চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী। আমরা খুচরা বিক্রেতারা পাইকারি দামে কিনে সামান্য লাভে বিক্রি করে থাকি। বাজার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় আমাদের পুঁজিও বেশি লাগছে। সবমহল যদি বাজার মনিটরিং করে তাহলে বাজার স্থিতিশীল হবে বলে আশাবাদী।
চাল আমদানিতে সমহত পোষণ করে তিনি বলেন, এতে করে বাজারে স্বস্তি ফিরে আসবে এবং সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয় ক্ষমতার নাগালে চলে আসবে।
নওগাঁ জেলা চাউলকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ইরি-বোরো মৌসুমে বছরে একবার সরু জাতের ধানের আবাদ হয়ে থাকে। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হয়ে সকল শ্রেণি পেশার মানুষ এখন সরু চালের ভাত খাওয়া শুরু করেছে। মোটা চালের ভাত খেতে অভ্যস্ত না। এ কারণে বছরের শেষ সময়ে এসে সরু ধানের সংকট হয়ে পড়েছে। বেশি দামে ধান কিনে বেশি দামে চাল বিক্রি করতে হচ্ছে। এছাড়া সরু চালের উৎপাদন কমে যাওয়ায় চালের দামও বেড়ে গেছে।
তবে চাল আমদানিতে অনীহা জানিয়ে এ নেতা বলেন, দেশে প্রচুর পরিমাণে ধান-চাল মজুত আছে। শুধু সরু চালের দাম বেড়েছে। কিন্তু মোটা জাতের চালের বাজার স্বাভাবিক আছে।
আব্বাস আলী/এফএ/জেআইএম