অমর একুশে গ্রন্থমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান চত্বরে একটি প্রকাশনীতে বই দেখছিলেন আশরাফুল ইসলাম। এই তরুণ গাজীপুর থেকে এসেছেন মেলায়। কয়েকটা বই ঘেঁটে পরে তিনি এক বিক্রয়কর্মীকে জিজ্ঞেস করেন, ‘ভাই, হুমায়ূন আহমেদের কোনো নতুন বই বের হয় নাই?’ বিক্রয়কর্মীর উত্তর, ‘না ভাই’। শুনে আর দু-একটা বই ঘেঁটে অন্য স্টলের দিকে হাঁটা ধরেন আশরাফুল।
পরে আশরাফুলের সঙ্গে কথা বলে জাগো নিউজ। পড়াশোনা শেষ করে চাকরিজীবনে ঢুকেছেন। এমনিতে সারাবছর তেমন একটা বই কেনা হয় না। তাই গাজীপুর থেকে প্রতি বইমেলাতেই দু-একবার করে আসেন। একসঙ্গে বেশ কিছু বই কিনে সারাবছর পড়েন।
তার পছন্দের লেখকের তালিকায় শীর্ষে হুমায়ূন আহমেদ। উপন্যাস, গল্প মিলিয়ে হুমায়ূন আহমেদের শতাধিক বই তার পড়া হয়েছে। করোনার কারণে ও চাকরির পরীক্ষার কারণে গত তিন-চারটি মেলায় আসতে পারেননি। এবার এসেছেন, হুমায়ূন আহমেদের পাঁচটা বই একসঙ্গে কিনেছেন তিনি।
এত বছর পরও হুমায়ূন আহমেদের নতুন বই খুঁজছেন কেন, প্রশ্ন করলে তার উত্তর, ‘আসলে অন্য কারও বই পড়া হয় না। যা পড়ি হুমায়ূন আহমদে স্যারের বইটাই পড়ি। অনার্সে থাকাবস্থায় তার পঞ্চাশটার মতো বই পড়েছি। কোনো বই দুইবার করেও পড়েছি। তার সব বই পড়ে শেষ করবো ইচ্ছে আছে। যেহেতু কয়েক বছর গল্প-উপন্যাসের বাইরে ছিলম, ভাবলাম তার কোনো অপ্রকাশিত বই থাকতে পারে, যা বইমেলা উপলক্ষে বের হতেও পারে।’
হুমায়ূন আহমেদ একাধারে কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, গীতিকার, শিক্ষাবিদ খ্যাতিলাভ করেছিলেন। বইসহ সৃষ্টিশীল রচনায় হিমু, মিসির আলি, শুভ্র প্রভৃতি জনপ্রিয় চরিত্র নির্মাণের মাধ্যমে তিনি ঠাঁই পেয়েছেন পাঠকের হৃদয়ে। তার রচিত বইয়ের সংখ্যা তিন শতাধিক। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই নিউইয়র্কে মারা যান তিনি। সে হিসাবে নন্দিত কথাসাহিত্যিকের প্রয়াণের এক দশক পূরণ হবে আগামী ১৯ জুলাই।
প্রতি বছরের মতো এবারও গ্রন্থমেলায়ও প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের বই যে স্টলে বিক্রি হয়, সেখানে মানুষের ভিড় বেশি দেখা গেছে। প্রতিটি স্টলে গিয়েই হুমায়ূন আহমেদের বই খুঁজছেন পাঠক। যে স্টলের ওপরে হুমায়ূন আহমেদের ছবি টানানো, সেখানেই মানুষের জটলা। অনেকেই হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের নতুন পাঠক। কেউ আবার তার লেখা গল্পের নাটক, সিনেমা, টেলিফিল্ম দেখেছেন, কিন্তু বই পড়েননি। তাদের অনেকেও বই কিনতে এসেছেন। অনেকেই শতাধিক বই পড়েছেন, আবার সব বইও শেষ করেছেন অনেকে। প্রিয়জনকে হুমায়ূন আহমেদের নতুন বই উপহারও দিচ্ছেন অনেকেই।
নাম প্রকাশ করতে চাননি এমন এক নতুন বিবাহিত দম্পতির সঙ্গে কথা হচ্ছিল জাগো নিউজের। স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী, তিনি হুমায়ূন ভক্ত। কিন্তু স্বামীর বই পড়ার তেমন অভ্যেস নেই। বিয়ের পর প্রথম মেলায় ঘুরতে এসেছেন। উপহার হিসেবে স্বামীকে হুমায়ূন আহমেদের বই কিনে দিলেন স্ত্রী। তিনি বলেন, ‘হুমায়ূন স্যারের নতুন একজন পাঠক তৈরি করলাম’।
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রথমার স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে হুমায়ূন আহমেদের নতুন বই খুঁজছিলেন আরেক পাঠক। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার বই পড়ার অভ্যাস কম। আমার বন্ধু আমাকে বলেছে, যে বই পছন্দ করবো সেই বইই গিফট করবে। তাই ভাবলাম সবাই যেহেতু হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ে, আমিও একটা কিনি।’
প্রয়াণের এক দশক পরেও হুমায়ূনের প্রতি পাঠকের এই টান অনেক বইপ্রেমীকেই আন্দোলিত করে।
পরিবার নিয়ে মেলায় ঘুরতে এসেছেন মধ্য বয়সী আকরাম হোসেন। দুই ছেলে মেয়ের জন্য বই কিনেছেন। একাধিক স্টলে ‘হুমায়ূন আহমেদের নতুন কোনো বই আছে কি না’ জানতে চেয়ে ঘুরেছেন।
পরে প্রথমার স্টলে আসেন। সেখানে জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘ভার্সিটিতে থাকতে হুমায়ূন সারের অনেক বই পড়েছি। তিনি মারা গেছেন, কিন্তু তার সৃষ্টি রেখে গেছেন। ব্যস্ততার কারণে বেশ কয়েক বছর বইমেলায় আসি না। টিভিতে দেখলাম ছোট ছোট বাচ্চাদের জন্য সুন্দর জায়গা করা হয়েছে। সেটা দেখেই আসা। পরে ভাবলাম এখন তো অফিস শেষে বাসাতেই থাকি। তাই হুমায়ূন আহমেদের দু-একটা বই কিনে নিয়ে যাই।’
হুমায়ূন আহমেদের বই প্রকাশ করেছে এমন একাধিক প্রকাশনীর স্টলের কর্মীদের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। তারা জানান, প্রতিদিনই এমন দু-চারজন কিংবা তার বেশিও থাকেন, যারা হুমায়ূন আহমেদের নতুন বই বের হয়েছে কি না জানতে চান।
জ্ঞানকোষ প্রকাশনীর পরিচালক ওয়াইস তরফদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের কাছে অনেকেই হুমায়ূন আহমেদের নতুন বইয়ের জন্য আসেন।’ এমন আগ্রহীদের মধ্যে মধ্যবয়সী লোকই বেশি বলে জানান তিনি।
কাকলী প্রকাশনীর এক বিক্রয়কর্মী জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতি দিনই দু-একজন আসেন। বলে আপনারা তো হুমায়ূন আহমেদের বই প্রকাশ করেন। নতুন কোনো বই আছে কি না।এই আগ্রহীদের মধ্যে মধ্যবয়সী বা নতুন বিয়ে করছেন, ছোট ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে আসেন এমন মানুষই বেশি।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রথমা প্রকাশনীর পরিচালক সিরজুল হক চৌধুরী কমল বলেন, ‘এখনো কিছু মানুষ আসেন (হুমায়ূন আহমেদের নতুন বইয়ের খোঁজে)। প্রতিদিনই কিছু লোক আসেন। এসে বলে আপনারা তো হুমায়ূন আহমেদের বই বের করেছেন, নতুন কোনো বই আছে কি না’।
প্রথমা প্রকাশনীর পরিচালক বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর খবর বাংলাদেশের সবাই জানে। এরপরও কিছু মানুষ আসে। অনেকেই আছেন ছাত্রজীবনে বই পড়েছেন। কিন্তু অনেক দিন খবর নেই। নতুন বই খুঁজতে আসেন। আবার অনেকেই আছেন তার সব বই পড়া শেষ। তাই এসে খোঁজ নেন, যদি বের হয়ে থাকে। আমরা তো এমন না যে, অন্য কোনো বই হুমায়ূন আহমেদের নামে চালিয়ে দেবো। তাই আমরা না করে দেই আর কি।’
হুমায়ূনভক্তদের পক্ষ থেকে বলা হয়ে থাকে, বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন একটি নিজস্ব ধারা তৈরি করেছেন। তিনি একটি প্রজন্মকে বইমুখী করেছেন। তারা সৃষ্টি এই ধারাকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দেবে।
হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিকর্মের জন্য ভক্তদের ভালোবাসা প্রসঙ্গে প্রয়াত এ কথাসাহিত্যিকের সহধর্মিণী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মেহের আফরোজ শাওন জাগো নিউজকে বলেন, হুমায়ূন আহমেদ যা করে গেছেন, যা লিখে গেছেন তা নিয়ে নতুন করে বলার কিছুই নেই। অনেকেই বলেছেন, হুমায়ূন আহমেদ একজন জনপ্রিয় ধারার লেখক। আসলে সময়ই বলে দেবে, উনি কোন ধারার লেখক। উনি চলে গেছেন, এরপরও মানুষ তাকে খুঁজছে। আমি জানি, আমি বিশ্বাস করি, এমনকি উনার ভক্তরাও বিশ্বাস করেন যে, আগামী ১০০ বছর উনার জায়গা কেউ নিতে পারবে না। ১০০ বছর তো ভুল বললাম, আসলে উনার কালজয়ী লেখাগুলো মানুষ সব সময়ই গ্রহণ করবে।
এমআইএস/এইচএ/এমএস