দেশজুড়ে

নওগাঁয় কমেছে গমের আবাদ, বেড়েছে আম-সরিষা

কম পরিশ্রম ও স্বল্প সময়ের আবাদে আগ্রহী হচ্ছেন এখনকার চাষিরা। যে কারণে নওগাঁ জেলায় গমের আবাদ কমে সরিষা চাষ ও আম বাগান বাড়ছে। জেলার কয়েকজন কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গমে খরচ ও পরিশ্রম বেশি হওয়ায় বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকছেন চাষিরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এ বছর জেলায় ২০ হাজার ৩৭৫ হেক্টর জমিতে গমের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার ৬৫০ হেক্টর, রানীনগরে ৫৩০, আত্রাইয়ে ৩৯৫, বদলগাছীতে ৯০০, মহাদেবপুরে ৪২০, পত্নীতলায় ১ হাজার ৭৬০, ধামইরহাটে ১ হাজার ৩৯৫ এবং মান্দায় ২ হাজার ৮০ হেক্টর।

এছাড়া বরেন্দ্র এলাকা হিসেবে খ্যাত সাপাহারে ৪ হাজার ২৭৫ হেক্টর, পোরশায় ৪ হাজার ৫৫০ এবং নিয়ামতপুরে ৩ হাজার ৪২০ হেক্টর জমিতে চলতি বছর গমের চাষ হয়েছে। যেখানে ২০২১ সালে জেলায় গমের আবাদ হয়েছিল ২২ হাজার ৬১০ হেক্টর এবং ২০২০ সালে হয়েছিল ২২ হাজার ৫৫০ হেক্টর।

চলতি মৌসুমে জেলার ১১টি উপজেলায় ৩৪ হাজার ৭৪৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে, যা গত বছর ছিল ৩২ হাজার ১০০ হেক্টর। এছাড়া বর্তমানে জেলায় ২৯ হাজার ৪৭৫ হেক্টর জমিতে আমের বাগান গড়ে উঠেছে। গত বছর আম বাগানের পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার ৮৫০ হেক্টর।

চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো জমিতে আবাদ হয়েছিল।

কৃষি বিভাগ থেকে চাষিদের গম চাষে উদ্বুদ্ধ করতে প্রণোদনা হিসেবে সার ও বীজ দেওয়া হয়েছে। মৌসুম শেষের দিকে এসে কৃষকরা গমের ফলন বৃদ্ধির লক্ষ্যে দানা পরিপুষ্ট করতে জিংকজাতীয় কীটনাশক স্প্রে করছেন। এছাড়া উড়ানি পোকা ও রোগ বালাই-দমনে বালাইনাশক ব্যবহারে তৎপরতা দেখা গেছে।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গমের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে জানিয়ে সাপাহার উপজেলার কাশিতাড়া গ্রামের গম চাষি ইসাহাক আলী বলেন, শুরুতেই বৃষ্টির কারণে গমের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। তবে পরবর্তীসময়ে আবহাওয়া ভালো হয়। গমের দানা পরিপুষ্ট হতে শুরু করেছে। কিছুদিনের মধ্যেই গম কাটা-মাড়াইয়ের কাজ শুরু হবে। শেষ সময়ে এসে আমরা বুকভরা আশা নিয়ে গমের পরিচর্যা করছি। এ বছর গমের বাম্পার ফলনের আশা করছি।

পোরশা উপজেলার জালুয়া গ্রামের মোহাব্বত আলী বলেন, তিন বিঘা জমিতে দেশি জাতের গমের আবাদ করেছি। যেখানে বিঘাপ্রতি বীজ, সার, কীটনাশক, হাল চাষ, সেচ, শ্রমিক ও কাটা-মাড়াই পর্যন্ত প্রায় ৬-৭ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। ওই জমিতে আবার বোরো আবাদ করবো। তখন খরচ কিছুটা কম পড়বে। যদি সরকার থেকে প্রণোদনা পেতাম খরচ অনেকটা বেঁচে যেত। দেড় বিঘা জমিতে আম বাগান আছে জানিয়ে তিনি বলেন, এলাকায় গমের আবাদ কমেছে। গমের পরিবর্তে এখন সরিষার আবাদ করা হচ্ছে। এছাড়া আম বাগানও গড়ে উঠছে।

বদলগাছী উপজেলার হলুদ বিহার গ্রামের গম চাষি শহীদুল ইসলাম বলেন, এ বছর এক বিঘা জমিতে গমের আবাদ করেছি। কৃষি অফিস থেকে প্রণোদনা হিসেবে ২০ কেজি বীজ, ২০ কেজি ডিএপি সার এবং ১০ কেজি পটাশ সার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হাল চাষে খরচ হয়েছে ২ হাজার এবং পানি সেচ ১ হাজার টাকা। গত বছর এক বিঘায় ১২ মণ ফলন হয়েছিল। বাজারে দাম ছিল প্রতি মণ ১ হাজার ১০০ টাকা। গম চাষে প্রণোদনা পাওয়ায় অনেক খরচ থেকে বেঁচে গেছি। এতে সুবিধা হয়েছে। গম তুলে ওই জমিতে পাটের আবাদ করবো।

সাপাহার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাপলা খাতুন বলেন, চলতি বছর উপজেলায় ৪ হাজার ২৭৫ হেক্টর জমিতে গম চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ দশমিক ৬০ মেট্রিক টন। প্রতি বিঘায় গড়ে ১৪-১৫ মণ হারে গম উৎপাদন হতে পারে। এই বছর সরকারিভাবে ১ হাজার ৬০০ জন কৃষককে গমের প্রণোদনার আওতায় আনা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গমের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. শামছুল ওয়াদুদ বলেন, গমের আবাদ কমে চাষিরা আম বাগান ও সরিষা চাষের দিকে ঝুঁকেছেন। গমের তুলনায় সরিষা আবাদ হতে সময়ও কম লাগে। সরিষা তুলে ওই জমিতে ইরি-বোরো আবাদ হচ্ছে। আবার সরিষা ও তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় চাষিরা সরিষা আবাদের দিকে ঝুঁকছে।

তিনি আরও বলেন, গমের আবাদে দু-তিনটা সেচ দিতে হয়। মাড়াই করতে গিয়ে সমস্যা হয়। তারপরও কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় এনে গম চাষে উৎসাহ বাড়ানো হচ্ছে।

এমআরআর/জিকেএস