স্বাস্থ্য

এক দশকে যক্ষ্মায় মৃত্যু অর্ধেকে নেমেছে

যক্ষ্মা বাংলাদেশের অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রতিবেদন অনুসারে বিশ্বের ৩০টি দেশে এই রোগের প্রকোপ বেশি। এর মধ্যে যক্ষ্মা শনাক্ত ও মৃত্যুর দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। এ অবস্থায় গত বছর (২০২১ সালে) সারাদেশে ২৮ লাখ রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা হয়। যাতে ৩ লাখ ৭ হাজার ৪৪৪ জনের শনাক্ত হয় যক্ষ্মা।

তবে ২০২১ সালে যক্ষ্মায় দেশে কতো জনের মৃত্যু হয়েছে তার পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। এর আগে ২০২০ সালে প্রতি লাখে ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছিলো। অথচ এক দশক আগে প্রতি লাখে যক্ষ্মায় মৃতের সংখ্যা ছিল ৫৪ জন। অর্থাৎ এই সময়ে মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ কমেছে।

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (এনটিসিপি) থেকে এসব তথ্য জানা যায়। তথ্যানুযায়ী, দেশে গত বছর যক্ষ্মা শনাক্তের দিক দিয়ে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা। আর সর্বনিম্ন ময়মনসিংহ।

বিভাগীয় পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকায় ৮০ হাজার ১৩৭, চট্টগ্রামে ৬০ হাজার ২২, খুলনায় ৩৯ হাজার ৭৯৬, রংপুরে ৩১ হাজার ৭০৮, রাজশাহীতে ২৯ হাজার ৩৩৫, সিলেটে ২৫ হাজার ৯১৮, বরিশালে ২১ হাজার ৪৮১ জন এবং ময়মনসিংহে ১৯ হাজার ৪৭ জনের যক্ষ্মা শনাক্ত হয়।

১৯৯৩ সালে যক্ষ্মাকে গ্লোবাল হেলথ ইমার্জেন্সি ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এরপর থেকেই বাংলাদেশ সরকার যক্ষ্মার প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে শুরু করে কাজ। যার ধারাবাহিকতা রয়েছে এখনও। যদিও করোনা মহামারির সময় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে ছন্দপতন হয়। তবে সংক্রমণ কমে আসায় ফের গতি ফিরেছে কার্যক্রমে।

এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার (২৪ মার্চ) বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস পালিত হচ্ছে। এবার এর প্রতিপাদ্য হলো- ‘বিনিয়োগ করি যক্ষ্মা নির্মূলে, জীবন বাঁচাই সবাই মিলে’।

জাতীয় যক্ষা নিয়ন্ত্রন কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. খুরশীদ আলম জানান, যক্ষ্মা নির্ণয়ের জন্য বর্তমানে দেশে উন্নত ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জিন এক্সপার্ট মেশিন, এলইডি মাইক্রোস্কোপি, লিকুইড কালচার, এলপিএ এবং ডিজিটাল এক্সরে রয়েছে।

তিনি জানান, সারাদেশে ৪৯০টি জিন এক্সপার্ট মেশিনের মধ্যে করোনার সময়ে ২৩০টি স্থাপন করা হয়। আর মাইক্রোস্কোপ বসানো হয় ১ হাজার ১১৯টি। ১৭৮টি ডিজিটাল মেশিন স্থাপন করা হয়।

ডা. খুরশীদ আলম বলেন, এসব পদ্ধতিতে ড্রাগ সেনসিটিভ ও ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স উভয় প্রকার যক্ষ্মার ৮৩ শতাংশ রোগী শনাক্ত হয়। এছাড়া একটি ন্যাশনাল রেফারেন্স ল্যাবরেটরি ও ৫টি আঞ্চলিক রেফারেন্স ল্যাবরেটরির মাধ্যমে শনাক্ত হয় যক্ষ্মা।

যক্ষ্মা রোগে দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, ৪৪টি সরকারি বক্ষব্যাধি ক্লিনিক, ৭টি বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সদর হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইনডোর-আউটডোর এবং এনজিও ক্লিনিকে যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়।

ডা. খুরশীদ আলম আরও জানান, যক্ষ্মা রোগ নির্ণয়ের পর বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহের পাশাপাশি নিয়মিত ওষুধ সেবনের জন্য একজন ডটস প্রোভাইডার নিশ্চিত করা হয়। ফলে কমে এসেছে রোগী মৃত্যুহার।

বাংলাদেশে যক্ষ্মা থেকে সুস্থতার হারও বিশ্বে প্রশংসিত বলে উল্লেখ করেন এনটিসিপির এই কর্মকর্তা। তিনি জানান, এই রোগে নিরাময়ের হার ২০০৫ সাল থেকে ৯৫ শতাংশের বেশি। বর্তমানে যা ৯৫ দশমিক ২৮ শতাংশ।

ডা. খুরশীদ বলেন, ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার চিকিৎসায় সংক্ষিপ্ত সময়ে নয় মাসের রেজিমেন বাংলাদেশে শুরু হয়েছে। ফলে চিকিৎসা ব্যয় কমে এসেছে এক চতুর্থাংশ। সম্প্রতি বাংলাদেশে ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার চিকিৎসায় বেডাকুইলিন ও ডেলামানিড ব্যবহার হচ্ছে। এছাড়া ইনজেকশনের পরিবর্তে মুখে খাওয়ার ওষুধ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে বছরে ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরামর্শ

২০২৫ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ৪৫ লাখ মানুষকে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়া ও ১৫ লাখ মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষায় প্রতি বছর তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহবান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে, বিশ্বে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন চার হাজার ১০০ জনের মৃত্যু হচ্ছে। এছাড়া প্রতিদিন যক্ষ্মাজনিত কারণে অসুস্থ হচ্ছে ২৮ হাজার মানুষ।

২০২০ সালে করোনার সময় বিশ্বে যক্ষ্মায় ১৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এর আগে ২০১৯ সালে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ। অর্থাৎ ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে এক লাখ বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।

এমইউ/জেডএইচ/এএসএম