দেশজুড়ে

বাংলার সব ইতিহাস বলে দেয় ভাস্কর্য ‘শেকড় থেকে শিখরে’

দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ আর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দক্ষ নেতৃত্বের ফসল আমাদের স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ঘটনার সম্মিলন ঘটিয়ে অনন্য স্মৃতিভাস্কর্য শেকড় থেকে শিখরে নির্মাণ করেছেন পাবনার বেড়া উপজেলার চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর বিপ্লব দত্ত।

উপজেলার নাটিয়াবাড়ীতে ধোবাকোলা করোনেশন উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়েছে। আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা করেন সাবেক সংসদ সদস্য আজিজুল হক আরজু। স্মৃতিভাস্কর্যটির দিকে একবার তাকালেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্বাপর ঘটনা সম্পর্কে ধারণা পাবে তরুণ প্রজন্ম।

শেকড় থেকে শিখরের শিল্পী বিপ্লব দত্ত পাবনার বেড়া উপজেলার সোনাপদ্মা গ্রামের সন্তান। বাবা প্রয়াত মনোরঞ্জন দত্ত ও মা সন্ধ্যারাণী দত্ত। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ‘অঙ্কন ও চিত্রায়ন’ বিভাগ থেকে বিএফএ এবং এমএফএ দুটিতেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন।

ভাস্কর বিপ্লব দত্ত জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা বাঙালি জাতির আছে আন্দোলন সংগ্রামের এক দীর্ঘ এবং সমৃদ্ধ ইতিহাস। যার শেকড়ে প্রোথিত রয়েছে বৃটিশবিরোধী আন্দোলন। এক সময় সেই আন্দোলন সফল হলো। আমরা ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বেরিয়ে এলাম। এরপর দেশ ভাগ হলো। আমরা আবার পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হলাম। মুখের ভাষাও কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র হলো। ফলাফল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। এরপর ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান আর তারপরেই সেই মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বর্ণালী ইতিহাস।’

তিনি বলেন, “দীর্ঘ নয়মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা পেলাম স্বাধীন বাংলাদেশ। আর পেলাম এক মহানায়ককে। যিনি তার প্রজ্ঞা, চিন্তা-চেতনা ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়ে বাঙালি জাতিকে শেকড় থেকে তুলে আনলেন শিখরে। এর পুরো চিত্রকল্প ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে এই স্মৃতিভাস্কর্যে। তাই নামটি ‘শেকড় থেকে শিখরে’ দেওয়া হয়েছে।”

১০ ফুট উচ্চতার কংক্রিটের স্তম্ভের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে ১৮ ফুট উচ্চতার বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ ভাস্কর্য। এটি স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি। দেশের মধ্যে স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি এটিই বঙ্গবন্ধুর সর্ববৃহৎ আবক্ষ ভাস্কর্য।

আবক্ষ ভাস্কর্যের দুপাশে রয়েছে তিনটি করে অতিরিক্ত স্তম্ভ। যাতে সিমেন্ট কেটে অঙ্কিত হয়েছে ’৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির উত্থান-পতন এবং উন্নয়নের ধারা।

মূল ভাস্কর্যের একপাশে ২৬টি কলামের একটি সীমানা বেষ্টনী রয়েছে, যার প্রত্যেকটি কলামে টাইলসে খোদাই করা হয়েছে বাংলার ইতিহাস। সেখানে সংক্ষিপ্ত আকারে সিরাজউদ্দৌলা থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭৫-এ জাতির জনকের পরিবারের নির্মম হত্যাকাণ্ডের সচিত্র ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে ।

পাবনা-২ আসনের (বেড়া-সুজানগর) সাবেক সংসদ সদস্য খন্দকার আজিজুল হক আরজু জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্বাধীনতা অর্জনের গৌরব ও বীরত্বের দাবিদার পাবনাবাসী। মুক্তিযুদ্ধে পাবনাবাসীর যেমন বীরত্বের ইতিহাস রয়েছে তেমনি রয়েছে বেদনাহত হত্যাযজ্ঞের করুণ কাহিনী। পাবনায় ১৭টি খণ্ড যুদ্ধ হয়। প্রথম ১৩ দিনে শত্রমুক্ত ছিল পাবনা জেলা।’

তিনি বলেন, ‘পাবনার সঙ্গে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুগভীর সম্পর্ক এবং প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল। ১৯৫৩ থেকে ১৯৭৩ সাল—এই ২০ বছরে প্রায় ১০ বার বঙ্গবন্ধু পাবনায় এসেছেন। তিনি আরও কয়েকবার পাবনা এসেছেন। মোট মিলিয়ে ১৫ বারের মতো। যেটা গোপালগঞ্জের চেয়ে কোনো জেলা শহরে বেশি। কখনো সাংগঠনিক সফরে, কখনো নির্বাচনী সফরে। কখনো এসেছেন রাষ্ট্রীয় সফরে।’

চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর বিপ্লব দত্ত

‘এসব বিষয় স্মরণ করে শিল্পী বিপ্লব দত্ত চেয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ওপর পাবনায় একটি পরিপূর্ণ ভাস্কর্য নির্মাণ করতে। তার আন্তরিকতা ও পরিশ্রমেই মূলত শেকড় থেকে শিখরে নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে’, যোগ করেন খন্দকার আজিজুল হক আরজু।

এলাকার বাসিন্দা ও প্রভাষক আলাউল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভাস্কর্যটি জাতীয় জীবনে নান্দনিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহন করবে বলে বিশ্বাস করি।’

স্থানীয় বাসিন্দা ডা. আমিরুল ইসলাম শানু বলেন, ‘ভাস্কর্যটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো ছাত্রছাত্রীসহ যেকোনো মানুষ ভাস্কর্যটি একবার ঘুরে দেখলে বাংলার ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাবেন।’

ধোবাখোলা করোনেশন হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের সভাপতি ও জাতসাকিনী ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ মানিক বলেন, আমাদের ছাত্রছাত্রীরা এখান থেকে ইতিহাসের সঠিক পাঠ নিতে পারবেন।

আমিন ইসলাম জুয়েল/এসআর/জেআইএম