সুগন্ধি ধান ও লিচুর জন্য বিখ্যাত দিনাজপুর জেলা। তবে নতুন করে মধুময় জেলা হিসেবে পরিচিতি লাভের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। জেলায় গত বছর লিচুর উৎপাদন হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪০০ কোটি টাকার। বেড়েছে সরিষার উৎপাদনও। এছাড়া মাটির উর্বরতার কারণে বছরের বেশিরভাগ সময়ই এ জেলায় উৎপাদিত হয় বিভিন্ন ধরনের শস্য ও ফল। ফলে এখান থেকে বিপুল পরিমাণ মধু আহরণের সম্ভাবনা দেখছেন মৌ-চাষি ও গবেষকরা। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে মধু উৎপাদনে অভাবনীয় সাফল্য দেখা দেবে দিনাজপুরে।
এজন্য কাজ করে যাচ্ছেন দিনাজপুরের তরুণ উদ্যোক্তা মোসাদ্দেক হোসেন। এরই মধ্যে তিনি প্রায় দেড় শতাধিক তরুণকে এ বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। নিজের উপার্জনের ১০ শতাংশ অর্থ দিয়ে প্রশিক্ষণ দেন তরুণদের। নিজ খরচে তাদের দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, বগুড়া, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার মাঠ পরিদর্শন ও মধু আহরণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করিয়েছেন।
মোসাদ্দেক হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘চলতি বছরে মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছি ৩ থেকে ৪ টন। খুচরা বাজারে যার মূল্য ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা। আর পাইকারি বাজারে এর মূল্য ৫ লাখ টাকার কম না। দিনাজপুরে প্রচুর লিচুর বাগান রয়েছে। সরিষার আবাদও হয়। এ জেলাকে মধুর জেলা হিসেবে রূপান্তর করা যাবে সহজেই। এজন্য প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা। প্রয়োজন তরুণদের প্রশিক্ষণ। তরুণদের জনশক্তিতে রূপান্তর করা গেলে এবং লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া গেলে এসব তরুণরা স্বাবলম্বী হতে পারবেন।’
দিনাজপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং করা ইফাদুজ্জামান কাজ করছেন মৌমাছি নিয়ে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমানে চাকরির বাজার মন্দা। আমার মতো অনেকেই রয়েছেন যারা চাকরির পেছনে ছোটাছুটি করছেন। এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। হয়তো চাকরি করে প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা উপার্জন করা যাবে। কিন্তু আমি চেয়েছি নিজে কিছু করতে। এরপর থেকেই মোসাদ্দেক ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ শুরু করি। বর্তমানে আমার চারটি মৌ-বাক্স রয়েছে। সেগুলো থেকে প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা করে আয় হয়।’
ইফাদুজ্জামানের মতো রাকিব হাসান রিফাতও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন মৌমাছি পালনে। গত সাড়ে চারমাস ধরে মৌমাছি নিয়ে কাজ করছেন তিনি। রিফাত জাগো নিউজকে বলেন, এ থেকে যে আয় হয় তাতে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে বাড়িতেও টাকা পাঠাই।
কী পরিমাণ মধু উৎপাদন হবে দিনাজপুরে
দিনাজপুরে সবচেয়ে বেশি মধু আহরণ করা হয় লিচুর মুকুল থেকে। মৌখামারিদের হিসাব মতে, প্রতি বছরই জেলার লিচু বাগানগুলো থেকে প্রায় ২০ থেকে ২১ কোটি টাকার মধু আহরণ হয়। তবে খামারি স্বল্পতার কারণে সম্ভাবনার চেয়ে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মধু আহরণ হয়। অর্থাৎ, প্রতি বছর শুধু লিচুর মুকুল থেকে এ জেলায় কমপক্ষে ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকার মধু আহরণ করা যেতে পারে।
এক হিসাবে দেখা যায়, এবার দিনাজপুরে ৫ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হচ্ছে। এক হেক্টর সমান সাড়ে ৭ বিঘা জমি। হেক্টরে ২৪৭টি লিচু গাছ আছে। প্রতি হেক্টরে ১০০ মৌ বক্স বসানো যায়। ১০০ বক্স থেকে দুই টন করে মধু উৎপাদন করা যায়। সেই হিসাব অনুযায়ী দিনাজপুরে লিচুর মুকুল থেকে সাড়ে ১০ হাজার থেকে ১১ হাজার টন মধু উৎপাদন সম্ভব।
মধু আহরণের আরেকটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে সরিষার ফুল থেকে। খামারিদের হিসাব মতে, জেলায় যে পরিমাণ সরিষার আবাদ হয়, তা থেকে কমপক্ষে ২১০ কোটি টাকার মধু আহরণ করা সম্ভব। অর্থাৎ, বছরে কেবল লিচু ও সরিষার ফুল থেকেই মধু আহরণ হতে পারে ৪০০ কোটি টাকার। আর এ হিসাবের সঙ্গে পাইকারি ও খুচরা হিসাব যোগ করলে দাঁড়ায় কমপক্ষে এক হাজার কোটি টাকা।
মৌ খামারি ও গবেষকরা যা বলছেন
দিনাজপুরে ক্রমাগত বাড়ছে সরিষার আবাদ। চলতি বছরে এ জেলায় সরিষার আবাদ হয়েছে ১৬ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে। আর এ সরিষা ক্ষেতেই প্রচুর পরিমাণে মধু উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে আবাদের একটি বাড়তি লাভ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে মধু।
মৌ খামারিদের দেওয়া তথ্যমতে, এক একর জমির সরিষা ক্ষেত থেকে কমপক্ষে ৩৫০ কেজি মধু সংগ্রহ করা যায়। সেই হিসাবে জেলায় আবাদ হওয়া ১৬ হাজার ১০০ হেক্টর বা ৩৯ হাজার ৭৮৪ একর জমির সরিষা ক্ষেত থেকে মধু সংগ্রহ করা যাবে ১ কোটি ৩৯ লাখ ২৪ হাজার ৪০০ কেজি। পাইকারি বাজারে যার মূল্য কমপক্ষে ২১০ কোটি টাকা। আর খুচরা বাজারে এ মূল্য দ্বিগুণের বেশি।
১৬ জেলা নিয়ে গঠিত মৌ খামারিদের সংগঠন উত্তরবঙ্গ মৌচাষি সমিতির সহ-সভাপতি আব্দুর রশিদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ে ৩৫০ থেকে ৩৭৫টি খামার মধু উৎপাদন করে। এসব খামার মূলত লিচুর সময়ই মধু সংগ্রহ করে। এর মধ্যে দিনাজপুরে ৩০০ থেকে ৩২৫টি খামার। পাশাপাশি সাতক্ষীরা, নড়াইল ও যশোরেরও ২০ থেকে ২৫টি খামার রয়েছে। প্রত্যেক খামারে সর্বনিম্ন ২ টন করে মধু সংগ্রহ হলে শুধু দিনাজপুর থেকেই ৭০০ টন মধু সংগ্রহ করা যাবে। আর ঠাকুরগাঁও থেকে সংগ্রহ করা যাবে ১০০ টন মধু। প্রতি টন মধুর ন্যূনতম দাম ৩ লাখ টাকা।’
তিনি আরও বলেন, ‘দিনাজপুরে ব্যাপকহারে সরিষার চাষ হওয়ায় এখান থেকেও মধু আহরণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এক একর জমির সরিষা ক্ষেতে ৯ মণ মধু সংগ্রহ করা যায়। প্রথমে কৃষকরা সরিষা ক্ষেত থেকে মধু সংগ্রহে বাধা দিলেও এখন তারা বুঝতে পেরেছেন, মৌমাছির মাধ্যমেই ফুলে পরাগায়ন ঘটে। ফলে ফসল উৎপাদন হয় বেশি।
মধু উৎপাদনে একটি সমস্যা হলো উত্তরবঙ্গে কোনো মধুর প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট নেই। যদি প্ল্যান্ট থাকতো তাহলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে পর্যন্ত মধু রপ্তানি করা সম্ভব হতো বলে মনে করেন গবেষকরা।
উত্তরঙ্গের কৃষকরা জানান, বর্তমানে দেশ থেকে বিভিন্ন কোম্পানি মধু রপ্তানি করলেও এতে তাদের কোনো লাভ হচ্ছে না। এসব কোম্পানির সিন্ডিকেটের কারণে উপযুক্ত দামও পাচ্ছেন না তারা।
মধু ও মৌমাছি নিয়ে গবেষণা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংস্থায় (ইউএসএইড) কর্মরত ড. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, বর্তমানে মধু সংগ্রহের জন্য এপিস মেলিফেরা নামের মৌমাছি ব্যবহৃত হয়। মাত্র পাঁচদিনের প্রশিক্ষণ এবং খামারে গিয়ে হাতে-কলমে একটু প্রশিক্ষণ নিলেই তরুণদের আয় বাড়বে ও উন্নতি হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি তরুণদের প্রশিক্ষিত করতে এবং আরও স্বল্প সময় ও মূল্যে কীভাবে মধুর উৎপাদন করা যায় তা নিয়ে কাজ করতে। দু-তিন প্রজাতির মৌমাছির মিশ্রণ ঘটিয়ে নতুন প্রজাতির উদ্ভাবন হওয়ার দিকে আমরা জোর দিচ্ছি।’
ড. আনোয়ার বলেন, মৌমাছির মাধ্যমে পরাগায়নের ফলে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ফলন বাড়ে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ মধু অন্য শিল্পের মতো উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
এমদাদুল হক মিলন/এসজে/এসআর/এএসএম