টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায় নেই সরকারি বা বেসরকারি কোনো বিনোদনকেন্দ্র। নেই কোনো পার্ক, এমনকি কোনো সিনেমা হলও। ফলে ঈদ বা অন্য কোনো উৎসবে এ উপজেলার মানুষ মনের খোরাক মেটাতে ও ঘুরতে বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন স্থানীয় নদীর পাড়, সংলগ্ন সেতু ও রেললাইন।
আনুষ্ঠানিক কোনো বিনোদন কেন্দ্র না থাকায় ঈদে মির্জাপুরের মানুষ বংশাই নদীর ত্রিমোহন, লৌহজং নদীর পাহাড়পুর ও দেউলীপাড়া সেতু, উপজেলার বুধিরপাড়া-কেশবপুর গ্রামের চকের মাঝখান দিয়ে নির্মাণাধীন সড়ক ও খাটিয়ার ঘাট-কালিয়াকৈর সড়কের কবিরকুড়ি ব্লকের স্থানে সময় কাটাতে ভিড় করেছেন।
এছাড়া জয়দেবপুর-বঙ্গবন্ধু রেল সড়কের মির্জাপুরের কলিমাজানি থেকে মহেড়া পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিনোদন প্রেমীদের ভিড় জমে।
ঈদ উপলক্ষে এসব এলাকা বেশ সরগরম হয়ে উঠেছে। এখানে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে আসা মানুষ সেতুপাড়ের বর্ষাস্নাত প্রকৃতি, মনোরম দৃশ্য এবং পাহাড়ি এলাকায় বিশাল চকের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া নবনির্মিত সড়ক দেখে মুগ্ধ হন।
অস্থায়ী বিনোদন কেন্দ্র হয়ে ওঠা এসব এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। তবে ঈদ উৎসবে এবার দর্শনার্থীদের আনাগোনা ছিল চোখে পড়ার মতো। এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে উপজেলা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মোটরসাইকেল, সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এবং পিকআপযোগে বিকেলে বিনোদনপিয়াসী মানুষ আসেন।
ঈদের দিন পুরো এলাকায় মানুষের ঢল নামে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিনোদন পিয়াসী শত শত মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে এসব এলাকা। ফলে এসব স্থান সব বয়সী মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে নির্মিত মির্জাপুরের এ সেতু এ অঞ্চলের মানুষের সিনেমা হল, পার্ক বা অন্যান্য বিনোদন কেন্দ্রের অভাব মেটাচ্ছে। এক সময় মির্জাপুর সদরে দুটি, হাটুভাঙ্গা বাজারে একটি, পাকুল্যা বাজারে দুটি ও জামুর্কী বাজারে একটি সিনেমা হল ছিল। প্রতি বছর ঈদ ও দুর্গা পূজা ও অন্যান্য উৎসবে এসব সিনেমা হলগুলোতে দর্শকদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যেত। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে স্যাটেলাইট চ্যানেল চালু হওয়ার পর থেকে সিনেমা হলের সুদিন ফুরাতে শুরু করে। ফলে একে একে সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে বড় উৎসবে মির্জাপুরে বিনোদনপিয়াসী মানুষ বিনোদন থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েন।
এ এলাকার মানুষের দাবি ও উপযোগিতা থাকলেও মির্জাপুরে সরকারি, পৌরসভা কর্তৃপক্ষ বা বেসরকারি উদ্যোগে কোনো বিনোদন কেন্দ্র বা পার্কের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে ব্রিজ ও সড়ক তৈরি হওয়ার পর মনের খোরাক মেটাতে বিনোদন প্রেমীরা ধীরে ধীরে এখানে আসতে শুরু করেন। এভাবেই পরিচিতি পেতে পেতে বর্তমানে রীতিমতো পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠেছে এসব এলাকা।
ঈদের দিন সেতু এলাকায় দেখা মিললো একদল যুবকের। পিকআপ ও ট্রাকে করে আসা দলগুলো জেনারেটরের সাহায্যে উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে হৈ-হুল্লোড় ও আনন্দ করছেন। জানালেন, কোথাও বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকায় বন্ধুরা পিকআপ ও ট্রাক ভাড়া করে সেতু এলাকায় সময় কাটাতে এসেছেন।
বুধিরপাড়া-কেশবপুর চকের মাঝখান দিয়ে নবনির্মিত সড়কে ঘুরতে আসা মির্জাপুর বাজারের ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন, রকিব মিয়া জানান, সড়কটির নির্মাণ কাজ শেষ না হলেও সাধারণ মানুষের কাছে সড়কটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বর্ষা না হলে মানুষের ভিড় আরও বাড়বে বলে তারা জানান।
বুধিরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা যুবলীগ নেতা শেখ জসিম উদ্দিন জানান, বিশাল চকের মাঝখান দিয়ে নির্মাণাধীন সড়কটি ইতোমধ্যে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্ষায় সড়কটির দু’পাশ ভেঙে যাচ্ছে। সড়কটি রক্ষায় দুই পাশে ব্লক বসিয়ে আরো আকর্ষণীয় করে তোলার দাবি জানান তিনি।
বংশাই সেতুর উত্তরপাশে চেয়ারম্যান বাজার ও দক্ষিণ পাশের ব্যবসায়ীরা এখানে প্রচুর মানুষের আগমনে খুশি। জানালেন, প্রতিদিন অনেক মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটাতে আসেন। ঈদকে কেন্দ্র করে এ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন প্রতিদিন শত শত মানুষের সমাগমে দোকানে বিক্রি বেড়েছে কয়েকগুণ। সেতুর উত্তর দিকে নদীপাড় ভরাট করে দর্শনার্থীদের বসার জায়গা নির্মাণের দাবি জানান ব্যবসায়ীরা।
এসব বিষয় নিয়ে কথা হয় মির্জাপুর পৌরসভার মেয়র সালমা আক্তার শিমুলের সঙ্গে। তিনি জানান বিনোদনের জন্য পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বরাদ্দ পেলেই দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।
মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হাফিজুর রহমান বলেন, বিনোদনের জন্য কোনো ভালো জায়গা নেই। তবে উপজেলার জামুর্কী বাজারের পাশে সরকারের ৬ একর জমি দখলমুক্ত করে ‘অবসর নন্দিনী পার্ক’ নামকরণ করা হয়েছে। এই পার্কটিই উপজেলার একমাত্র বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে বলে তিনি জানান।
এসএম এরশাদ/এফএ/জেআইএম