দেশজুড়ে

বাঁশনির্ভর বিদ্যুতের লাইন যেন মরণফাঁদ

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (ওয়াপদা) ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগ দিনে দিনে মরণফাঁদে পরিণত হচ্ছে। আইনের তোয়াক্কা না করে সঞ্চালন লাইনের তার বাঁশের খুঁটিতে ভর করে সংযোগ দেওয়ায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

কমপক্ষে ৪০ বছর আগে উপজেলার বাঁশতৈল ইউনিয়নের পেকুয়া এলাকায় ওয়াপদা বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থাপনা চালু হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন যাবত এ ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি নেই। এসব লাইনের তারে জড়িয়ে প্রাণহানিসহ নানা দুর্ঘটনা ঘটছে।

জানা গেছে, বিদ্যুতের এই সঞ্চালন লাইন থেকে একশ ফুট দূরত্বে সংযোগ লাইন টানার কথা। কিন্তু সোমবার (৯ মে) বাঁশতৈল ইউনিয়নের বংশীনগর, কটামারা ও অভিরামপুর গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে অবৈধভাবে ৭শ ফুট থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরত্বে বাঁশের খুঁটিতে এই বিদ্যুৎ সংযোগ লাইন টাঙানো হয়েছে। অনেক স্থানে বাঁশের খুঁটি হেলে তার ঝুলছে। তারের নিচ দিয়ে ঝুঁকি নিয়েই মানুষ চলাচল করছে। আর এতেই বাড়ছে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঝুঁকি।

এলাকাবাসী জানান, উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলের বাঁশতৈল ইউনিয়নের অভিরামপুর, কটামারা, গায়রাবেতিল, বংশীনগর গ্রামে কোনো পাকা রাস্তা ও বিদ্যুৎ লাইন ছিল না। গ্রামগুলোতে কুপি ও হারিকেনের আলোই ছিল একমাত্র ভরসা। ১৯৮৩ সালে পেকুয়া এলাকায় ওয়াপদার সঞ্চালন লাইন টানা হয়। প্রায় ১৫ বছর আগে অভিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা ঠিকাদার মোস্তাফিজুর রহমান ও ইয়ানুরের মাধ্যমে অভিরামপুর গ্রামের ৩৫-৪০ বাড়িতে ওয়াপদার বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়। বংশীনগর, অভিরামপুর ও কটামারা গ্রামে প্রায় দুই শতাধিক বাড়িতে ওয়াপদার লাইন রয়েছে। তাও আবার ১০-১২ ফুটের সিমেন্ট ও বাঁশের খুঁটি স্থাপন করে ওই লাইন টানা হয়।

কিন্তু বাঁশের খুঁটিগুলো ঝড়-বৃষ্টিতে পচে নষ্ট হয়ে বিদ্যুৎ লাইনের তার অনেক স্থানে ঝুলে মাটিতে পড়ে গেছে। লাইনের তারের নিচ দিয়ে হেঁটে গেলে যেন মাথা ছুঁই ছুঁই অবস্থা। এছাড়াও বিদ্যুৎ সংযোগ ঘরের ছাদ কিংবা চালের নিচ দিয়ে নেওয়া হয়েছে। কোথাও আবার গাছের ফাঁকে ফাঁকে তার টেনে বসতঘরের খানিকটা উপর দিয়ে টানা হয়েছে। ফলে ঝড়ো হাওয়া বা বৃষ্টিতে গাছের ডাল ভেঙে বিদ্যুতের সংযোগ তার ছিঁড়ে সড়ক বা বাড়ির পাশের রাস্তা ও খোলা জায়গায় পড়ে থাকে। পরে অসাবধানতাবশত ওইসব তারে জড়িয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে গ্রামের লোকজন।

গত ৩ মে ঈদুল ফিতরের দিন কটামারা গ্রামে ওয়াপদার একটি ট্রান্সফরমার বিকল হয়। স্থানীয় সুবিধাভোগীরা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সখিপুর অফিসে যোগাযোগ করেন। অফিস কর্তৃপক্ষ ওই এলাকার সঞ্চালন লাইন গ্রাহকদের নিজ উদ্যোগে টানিয়ে দেওয়াসহ সব খরচ বহনের কথা বলেন। এজন্য গ্রাহকদের ২৫ হাজার টাকা বহন করতে হয়েছে।

এ বিষয়ে অভিরাম গ্রামের শহর আলী শিকদার, মোক্তার হোসেন, আলমাছ মিয়া, মতিয়ার রহমান, কটামারা গ্রামের দেলোয়ার হোসেন, শহিদুল ইসলাম, এছাক মিয়া বলেন, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এখানকার ওয়াপদার বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার কোনো সংস্কার বা উন্নয়ন হচ্ছে না। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। ওয়াপদার লোকজন স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে ছোট ছোট সিমেন্টের ও মাঝে মাঝে বাঁশের খুঁটি দিয়ে সংযোগ লাইন দিয়ে থাকেন। এসব খুঁটি পচে নষ্ট হয়ে গেছে। লাইন পড়ে থাকলেও ওয়াপদার লোকজন আসে না।

অভিরামপুর গ্রামের ভ্যানচালক খুরশেদ আলম বলেন, ওয়াপদার মতো জালিয়াতি বিল আর কেউ করে না। বিদ্যুৎ ব্যবহারের চেয়েও অনেক বেশি বিল করে তারা। ৫ বছর আগে বেশি বিল পরিশোধ করে লাইন বিচ্ছিন্ন করেছেন বলে জানান তিনি।

পাশের বাড়ির হাছনা বেগম বলেন, ট্রান্সফরমার বিকল হওয়ায় গত ৩ মে থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। শুনেছি রোববার (৮ মে) কয়েকটি বাড়িতে লাইন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ট্রান্সফরমার খরচের জন্য ৫০০ টাকা দিলেও তার বাড়িসহ আরও ৭-৮টি বাড়িতে এখনও সংযোগ দেওয়া হয়নি।

বিগত দিনে ওয়াপদার ট্রান্সফরমার বিকল হলে নানাখাতে ৬০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হতো গ্রাহকদের। সম্প্রতি ট্রান্সফরমার বিকল হলেও এলাকার সমাজসেবক ও বিএনপি নেতা এসএম রুবেল পারভেজের সহযোগিতায় ওই এলাকার গ্রাহকদের বাড়তি কোনো টাকা গুনতে হয়নি বলেও জানান তিনি।

সমাজসেবক ও বিএনপি নেতা এসএম রুবেল পারভেজ বলেন, বিগত দিনে ট্রান্সফরমার বিকল হলে নানাখাতে ৬০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতো। গত ৩ মে কটামারা গ্রামের ট্রান্সফরমারটি বিকল হলে এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ থাকে। তিনি নিজ দায়িত্বে সখিপুর অফিসে যোগাযোগ করে ট্রান্সফরমারটি মেরামতের উদ্যোগ নেন। সখিপুর অফিস কর্তৃপক্ষ ওই এলাকায় পড়ে থাকা সঞ্চালন লাইন টানিয়ে দেওয়া, ট্রান্সফরমার পরিবহন ভাড়া ও শ্রমিকদের মুজুরি গ্রাহকদের বহন করতে বলে। গত ৮ মে নতুন ট্রান্সফরমার সংযোগ দেন। এতে প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাঁশতৈল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন দেওয়ান ও চার নম্বর ওয়ার্ড সদস্য শাজাহান সিরাজ বলেন, অভিরামপুর, কটামারা ও বংশীনগর গ্রামে ওয়াপদার বিদ্যুৎ সংযোগ লাইন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দূরত্ব বেশি হওয়ায় সংযোগ লাইন অনেক স্থানে ঝুলে ও বিপজ্জনক অবস্থায় পড়ে আছে। ওয়াপদা কর্তৃপক্ষকে জানালেও খোঁজখবর নেয় না।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সখিপুর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান ভূইয়া বলেন, আমি ৩-৪ মাস আগে যোগদান করেছি। এক কিলোমিটার দূরত্বে ও বাঁশের খুঁটিতে ঝুলিয়ে সংযোগ লাইন দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই।

এসএম এরশাদ/এফএ/জেআইএম